বাৎসল্যরসের এমন গভীর অনুভূতি জীবনে তাহার এই প্রথম …
অনেকদিন পরে উপরের ঘরটাতে শুইল। সেই তাহার ফুলশয্যার খাটটাতে। কাজল পাশেই ঘুমাইতেছে—কিন্তু কত রাত পর্যন্ত তাহার নিজের ঘুম আসিল না। জানালার বাহিরে চাহিয়া চাহিয়া কি ভাবিতে লাগিল। গত পাঁচ ছয় বৎসর বিদেশে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের জীবনযাত্রা ও নবতর অনুভূতিরাজির ফলে পুরাতন দিনের অনেক অনুভূতিই অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে—এখানকার তো আরও, কারণ আট নয় বৎসর এখানকার জীবনের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নাই। তাই আজ এই চিলেকোঠার বহু পরিচিত ঘবটা, এই পালঙ্কটা, ওই সুপারি বনের সারি—এসব যেন স্বপ্ন বলিযা মনে হইতেছে। ঠিক আবার পুরানো দিনের মতো জ্যোৎস্না উঠিয়াছে, ঠিক সেই সব দিনের মতো নাটমন্দির হইতে নৈশ কীর্তনের খোলব আওয়াজ আসিতেছে কিন্তু সে অপু নাই-বদলাইয়া গিয়াছে—বেমালুম বদলাইয়া গিয়াছে।
স্ত্রীর গহনা বেঁচিয়া বই ছাপাইয়া ফেলিল পূজার পরেই।
কেবল হার ছড়াটা বেচিতে পারিল না। অপর্ণার অন্যান্য গহনার অপেক্ষা সে এই হার ছড়াটার সঙ্গে বেশি পরিচিত। তাই হারটা সামনে খুলিয়া খানিকক্ষণ ভাবিল, অপর্ণার সেই হাসি-হাসি মুখখানা যেন ঝাপসামতো মনে পড়ে—প্রথমটাতে হঠাৎ যেন খুব সুস্পষ্ট মনে আসে-আধ সেকেন্ড কি সিকি সেকেন্ড মাত্র সময়ের জন্য—তারপরেই ঝাপসা হইয়া যায়। ওই আধ সেকেন্ডের জন্য মনে হয়, সে-ই সেরকম ঘাড় বাঁকাইয়া মুখে হাসি টিপিয়া সামনে দাঁড়াইয়া আছে।
ছাপানো বই-এর প্রথম কপিখানা দপ্তরির বাড়ি হইতে আনাইয়া দেখিয়া সে দুঃখ ভুলিয়া গেল। কিছু না, সব দুঃখ দূর হইবে। এই বই-এ সে নাম করিবে।
আজ বিশ বৎসরের দুর জীবনের পার হইতে সে নিশ্চিন্দিপুরের পোড় ভিটাকে অভিনন্দন পাঠাইল মনে মনে। যেখানেই থাকি, ভুলি নি! যাহাদের বেদনার রঙে তাহার বইখানা রঙিন, কত স্থানে, কত অবস্থায় তাহাদের সঙ্গে পরিচয়, হয়তো কেউ বাঁচিয়া আছে, কেউ বা নাই। তাহারা আজ কোথায় সে জানে না, এই নিস্তব্ধ রাত্রির অন্ধকার শান্তির মধ্য দিয়া সে মনে মনে সকলকেই আজ তাহার ধন্যবাদ জানাইতেছে।
মাসকয়েকের জন্য একটা ছোট অফিসে একটা চাকরি জুটিয়া গেল তাই রক্ষা। এক জায়গায় আবার ছেলে পড়ায়। এসব না করিলে খরচ চলে বা কিসে, বই-এর বিজ্ঞাপনের টাকাই বা আসে কোথা হইতে। আবার সেই সাড়ে নয়টার সময় আফিসে দৌড়, সেখান হইতে বাহির হইয়া একটা গলির মধ্যে একতলা বাসার ছোট্ট ঘরে দুটি ছেলে পড়ানো। বাড়ির কর্তার কিসের ব্যবসা আছে, এই ঘরে তাহাদের বড়ো বড়ো প্যাকবাক্স ছাদের কড়ি পর্যন্ত সাজানো। তাহারই মাঝখানে ছোট তক্তপোশ মাদুর পাতিয়া ছেলে-দুটি পড়ে-সন্ধ্যার পরে অপু যখনই পড়াইতে গিয়াছে, তখনই দেখিয়াছে কয়লার ধোঁয়ায় ঘরটা ভরা।
শীতকাল কাটিয়া পুনরায় গ্রীষ্ম পড়িল। বই-এর অবস্থা খুব সুবিধা নয়, নিজে না খাইয়া বিজ্ঞাপনের খরচ জোগায়, তবু বই-এর কাটতি নাই! বইওয়ালারা উপদেশ দেয, এডিটারদের কাছে, কি বড়ো বড়ো সাহিত্যিকদের কাছে যান, একটু জোগাড়যন্ত্র করে ভালো সমালোচনা বার করুন, আপনাকে চেনে কে, বই কি হাওয়ায় কাটবে মশাই? অপু সে সব পারিবে না, নিজের লেখা বই বগলে করিয়া দোরে দোরে ঘুরিয়া বেড়ানো তাহার কম নয়। এতে বই কাটে ভালো, না কাটে সে কি করিবে?
অতএব জীবন পুরাতন পরিচিত পথ ধরিয়াই বহিয়া চলিল—আপিস আর ছেলে পড়ানো। রাত্রে আর একটা নতুন বই লেখে। ও যেন একটা নেশা, বই বিক্রি হয়-না-হয়, কেউ পড়ে-না-পড়ে, তাহাকে যেন লিখিয়া যাইতেই হইবে।
মেসে লেখার অত্যন্ত অসুবিধা হইতেছে দেখিয়া সে একটা ছোট একতলা বাড়ির নিচেকার একটা ঘর আট টাকায় ভাড়া লইয়া সেখানে উঠিয়া গেল। মেসের বাবুরা লোক বেশ ভালোই কিন্তু তাহাদের মানসিক ধাৱা যে পথ অবলম্বনে চলে অপুর পথ তা নয়—তাহাদের মূখতা, সংস্কার, সীমাবদ্ধতা ও সবরকমের মানসিক দৈন্য অপুকে পীড়া দেয়। খানিকক্ষণ মিষ্টালাপ হয়তো এঁদের সঙ্গে চলিতে পারে কিন্তু বেশিক্ষণ আড্ডা দেওয়া অসম্ভব—বরং কারখানার ননী মিস্ত্রি, কি চাপদানির বিশু স্যাকরার আড্ডার লোকজনকে ভালোই লাগিত–কারণ,তাহারা যে জগৎটাতে বাস করিতঅপুর ছে সেটা একেবারেই অপরিচিত—তাহাদের মোহ ছিল, সেই অজানা ও অপরিচয়ের মোহ, কাশীর কথক ঠাকুর কি অমরকন্টকের আজবলাল ঝা-কে যে কারণে ভালো লাগিয়াছিল। কিন্তু এঁরা সে ধরনের অনন্যসাধারণ নন, নিতান্তই সাধারণ ও নিতান্ত ক্ষুদ্র। কাজেই বেশিক্ষণ থাকিলেই হাঁপ ধরে-অপুর নতুন ঘরটাতে দরজা জানালা কম, দক্ষিণ দিকের ছোট জানালাটা খুলিলে পাশের বাড়ির ইট-বারকরা দেওয়ালটা দেখা যায় মাত্র। ভাবিল—তবুও তো একা থাকতে পারব—লেখাটা হবে।
বাড়ি বদল করার দিনটা জিনিসপত্র সরাইতে ও ঘর গুছাইতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। হাত-পা ধুইয়া ঠাণ্ডা হইয়া বসিল।
আজ রবিবার ছেলে-পড়ানো নাই। বাপ! নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল। সেই অতটুকু ঘর, কয়লার ধোঁয়া আর রাজ্যের প্যাকবাক্সের টার্পিন তেলের মত গন্ধ। আজ কয়েক দিন হইল কাজলের চিঠি পাইয়াছে, এই প্রথম চিঠি, কাটাকুটি বানান ভুলে ভর্তি। আর একবার পত্ৰখানা বাহির করিয়া পড়িল-বার-পনেরো হইল এইবার লইয়া। বাবার জন্য তাহার মন কেমন করে, একবার যাইতে লিখিয়াছে, একখানা আরব্য উপন্যাস ও একটা লণ্ঠন লইয়া যাইতে লিখিয়াছে, যেন বেশি দেরি না হয়। অপু ভাবে, ছেলেটা পাগল, লণ্ঠন কি হবে? লণ্ঠন?…দ্যাখো তো কাণ্ড। উঠিয়া ঘরে আলো জুলিয়া ছেলের পত্রের জবাব লিখিল। সে আগামী শনিবার তাহাকে দেখিতে যাইতেছে।
