তাড়াতাড়ি কম্পিত ও আনাড়ি হাতে ডাল মাখিতে গিয়া থালার কানা ছাড়াইয়া কিছু ডালমাখা ভাত মাটিতে পড়িয়া গেল। দাদামশায় ধমক দিয়া উঠিলেন—পড়ে গেল, পড়ে গেল—আঃ, ছোঁড়া ভাতটা পর্যন্ত যদি গুছিয়ে খেতে জানে!–তো তো-খুঁটে খুঁটে তোল–
কাজল ভয়ে ভয়ে মাটি-মাখা ভাতগুলি থালার পাশ হইতে আবার থালায় তুলিয়া লইল।
–বেগুন পটোল ফেলেছিস কেন?-ও খাবার জিনিস না?—সব একসঙ্গে মেখে নে–
খানিকটা পরে তাহার দৃষ্টি পড়িল, কাজল উচ্ছেভাজা খায় নাই–তখন অম্বল দিয়া খাওয়া হইয়া গিয়াছে—তিনি বলিলেন—উচ্ছেভাজা খানি?–খাও-ও অম্বলমাখা ভাত ঠেলে রাখো। উচ্ছেভাজা তেতো বলিয়া কাজলের মুখে ভালো লাগে না—সে তাতে হাতও দেয় নাই। দাদামশায়ের ভয়ে অম্বলমাখা ভাত ঠেলিয়া রাখিয়া তিক্ত উচ্ছেভাজা একটি একটি কবিয়া খাইতে হইল—একখানি ফেলিবার জো নাই—দাদামশাযের সতর্ক দৃষ্টি। ভাত খাইবে কি কান্নায় কাজলের গলায় ভাতের দলা আটকাইয়া যায়। খাওয়া হইয়া গেলে মেজ মামিমার কাছে গিয়া বলিয়া কহিয়া একটা পান লয়-পান খুলিয়া দেখে কি কি মশলা আছে, পরে মিনতিব সুরে একবার মেজ মামিমার কাছে একবার ছোট মামিমার কাছে বলিয়া বেড়ায় ইতি একটু কাং, ও মামিমা তোমার পায়ে পড়ি। একটু কাৎ দাও না। কাঠ অর্থাৎ দাবৃচিনি। মামিমারা ঝংকাব দিয়া বলেন—রোজ রোজ ডালচিনি চাই—ছেলে আবার শৌখিন কত!…উঃ, তা আবার জিব দেখা চাই—মুখ রাঙা হল কিনা
তবে পড়াশুনার আগ্রহ তাহার বেশি ছাড়া কম নয়। বিশ্বেশ্বর মুহুরির হাতবাক্সে কেশবঞ্জনেব উপহারের দরুন গল্পের বই আছে অনেকগুলি। খুনী আসামী কেমন করিয়া ধবা পড়িল, সেই সব গল্প। আর পড়িতে ইচ্ছা করে আরব্য উপন্যাস, কি ছবি! কি গল্প! দাদামশায়ের বিছানার উপর একদিন পড়িয়া ছিল—সে উলটাইয়া দেখিতেছে, টের পাইয়া বিশ্বেশ্বর মুহুরি কাড়িয়া লইযা বলিল, এ, আট বছরের ছেলের আবার নভেল পড়া? এইবার একদিন তোমার দাদামশায় শুনতে পেলে দেখো কি করবে!
কিন্তু বইখানা কোথায় আছে সে জানে-দোতলার শোবার ঘবেব সেই কাঁটাল কাঠের সিন্দুকটার মধ্যে একবার যদি চাবিটা পাওয়া যাইত! সারারাত জাগিয়া পড়িয়া ভোরের আগেই তাহা হইলে তুলিয়া রাখে।
এ কয়েকদিন বৈকালে দাদামশায় বসিয়া বসিয়া তামাক খান, আর সে পণ্ডিতমশায়ের কাছে বসিয়া বসিয়া পড়ে। সেই সময় পণ্ডিতমশায়ের পেছনকার অর্থাৎ চণ্ডীমণ্ডপের উত্তর-ধারের সমস্ত ফাঁকা জায়গাটা অদ্ভুত ঘটনার রঙ্গভূমিতে পরিণত হয়, ঘটনাটাও হয়তো খুব স্পষ্ট নয়, সে ঠিক বুঝাইয়া বলিতে তো পারে না। কিন্তু দিদিমার মুখে শোনা নানা গল্পের রাজপুত্র ও পাত্রের পুত্রেরা নাম-না-জানা নদীর ধারে ঠিক এই সন্ধ্যাবেলাটাতেই পৌঁছায়–কোন রাজপুরীকে কাঁপাই রাজকন্যাদের সোনার রথ বৈকালের আকাশপানে উঠিয়া অদৃশ্য হইয়া যায়—সে অন্যমনস্ক হইয়া দেওয়ালের পাশে ঝুঁকিয়া আকাশটার দিকে চাহিয়া থাকে, কেমন যেন দুঃখ হয় ঠিক সেই সময় সীতানাথ পণ্ডিত বলেন-দেখুন, দেখুন, বাঁড়ুয্যেমশায়, আপনার নাতির কাণ্ডটা দেখুন, স্লেটে বুড়কে লিখতে দিলাম, তা গেল চুলোয়-হাঁ করে তাকিয়ে কি দেখছে দেখুন—এমন অমনোযোগী ছেলে যদি–
দাদামশায় বলেন—দিন না ধাঁ করে এক থাপ্পড় বসিয়ে গালে হতভাগা ছেলে কোথাকার হাড় জ্বালিয়েছে, বাবা করবে না খোজ, আমার ঘাড়ে এ বয়সে যত ঝুঁকি।
তবে কাজল যে দুষ্ট হইয়া উঠিয়াছে, এ কথা সবাই বলে। একদণ্ড সুস্থির নয়, সর্বদা চঞ্চল, একদণ্ড চুপ কবিয়া থাকে না, সর্বদা বকিতেছে। পণ্ডিতমশায় বলেন-দেখ তো দলু কেমন অঙ্ক কষে? ওর মধ্যে অনেক জিনিস আছে—আর তুই অঙ্কে একেবারে গাধা।
পণ্ডিত পিছন ফিরিতেই কাজল মামাতোভাই দলুকে আঙুল দিয়া ঠেলিয়া চুপি চুপি বলে, তো-তোর মধ্যে অনেক জিনিস আছে, কি জিনিস আছে রে, ভাত ডাল খি-খিচুড়ি, খিচুড়ি? হি হি ইল্লি! খিচুড়ি খাবি, দলু?
দাদামশায়ের কাছে আবার নালিশ হয়।
তখন দাদামশায় ডাকি শাস্তি স্বরূপ বানান জিজ্ঞাসা করিতে আরম্ভ করেন—বানান কর সূর্য। কাজল বানানটা জানে, কিন্তু ভয়জনিত উত্তেজনার দরুন হঠাৎ তাহার তোতলামিটা বেশি করিয়া দেখা দেয়দু-একবার চেষ্টা করিয়াও দন্ত স্য কথাটা কিছুতেই উচ্চারণ করিতে পারিবে না বুঝিয়া অবশেষে বিপন্নমুখে বলে—তা-তালব্য শয়ে দীঘ্য-উকার
ঠাস্ করিয়া এক চড় গালে। ফরসা গাল, তখনই দালিমের মতো রাঙা হইয়া ওঠে, কান পর্যন্ত রাঙা হইয়া যায়। কাজলের ভয় হয় না, একটা নিল অভিমান হয়-বাঃ রে, বানানটা তো সে জানে, কিন্তু মুখে যে আটকাইয়া যায় তা তার দোষ কিসের? কিন্তু মুখে অত কথা বলি বুঝাইয়া প্রতিবাদ বা আত্মপক্ষ সমর্থন কবিবার মতো এতটা জ্ঞান তাহার হয় নাই—সবটা মিলিয়া অভিমানের মাত্রাটাই বাড়াইয়া তোলে। কিন্তু অভিমানটা কাহাব উপব সে নিজেও ভালো বোঝ না।
এই সময়ে কাজলের জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটিল।
সীতানাথ পণ্ডিতমহাশয় একটু-আধটু জ্যোতিষের চর্চা কবিতেন। কাজলের পড়িবার সময় তাহার দাদামশায়ের সঙ্গে সীতানাথ পণ্ডিত সে সম্বন্ধে আলোচনা করিতেন—পাঁজি দেখিযা ঠিকুজি তৈয়ারি, জন্মের লগ্ন ও যোগ গণনা, আয়ুষ্কাল নির্ণয় ইত্যাদি। আজ বছরখানেক ধরিয়া কাজল প্রায়ই এসব শুনিয়া আসিতেছে—যদিও সেখানে সে কোন কথা বলে না।
কার্তিক মাসের শেষ, শত তখনও ভালো পড়ে নাই। বাড়ির চারিপাশে অনেক খেজুরবাগান, শিউলিরা কার্তিকের শেষে গাছ কাটিয়াছে। শীতের ঠাণ্ডা সান্ধ্য বাতাসে টাটকা খেজুর রসের গন্ধ মাখানো থাকে।
