কাজলদেব পাড়ার ব্রহ্মঠাকরুন এই সময় কি রোগে পড়িলেন। ব্রহ্মঠাকরুনের বয়স কত তা নির্ণয় করা কঠিন-মুড়ি ভাজিয়া বিক্রয় করিতেন, পতি-পুত্র কেহই ছিল না—কাজল অনেকবার মুড়ি কিনিতে গিয়াছে তাহার বাড়ি। অত্যন্ত খিটখিটে মেজাজের লোক, বিশেষ করিয়া ছেলেপিলেদের দু-চক্ষু পড়িয়া দেখিতে পারিতেন না—দূর দূর করিতেন, উঠানে পা দিলে পাছে গাছটা ভাঙে, উঠানটা খুঁড়িয়া ফেলে—এই ছিল তাহার ভয়। কাজলকে বাড়ির কাছাকাছি ঐেখিলে বলিতেন—একটা যেন মগ-মগ একটা–বাড়ি যা বাপু-কঞ্চি-টঞ্চির খোঁচা মেরে বসৰি-মা বাপু এখান থেকে। ঝালের চারাগুলো মাড়াস নে
সেদিন দুপুরের পর তাহার মামাতো-বোন অরু বলিল—বেহ্ম-ঠাকুমা মরমর হয়েছে, সবাই দেখতে যাচ্ছে—যাবি কাজল?
ছোট্ট একতলা বাড়ির ঘর, পাড়ার অনেকে দেখিতে আসিয়াছে-মেজেতে বিছানা পাতা, কাজল ও অরু দোরের কাছে দাঁড়াইয়া উকি মারিয়া দেখিল। ব্রহ্মঠাকরুনকে আর চেনা যায় না, মুখের চেহারা যেমন শীর্ণ তেমনি ভয়ঙ্কর, চক্ষু কোটরগত, তাহার ছোটমামা কাছে বসিয়া আছে, হাবু কবিরাজ দাওয়ায় বসিয়া লোকজনের সঙ্গে কি কথা বলিতেছে।
বৈকালে দু-তিনবার শোনা গেল ব্ৰহ্মঠাকরুনের রাত্রি কাটে কিনা সন্দেহ।
কাজল কিছু বিস্মিত হইল। এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্ৰহ্মঠাকরুন, যাঁহাকে গামছা পরিয়া উঠানে গগাবরজল ছিটাইতে দেখিয়া সে তখনই ভাবিত—তাহার দাদামশায়ের মতো লোক পর্যন্ত যাঁহাকে মানিয়া চলে—তাহার এ কি দশা হইয়াছে আজ!…এত অসহায়, এত দুর্বল তাহাকে কিসে করিয়া ফেলিল?…
ব্ৰহ্মঠাকরুন সন্ধ্যার আগে মারা গেলেন। কাজলের মনে হইল পাড়াময় একটা নিস্তব্ধতা কেমন একটা অবোধ্য বিভীষিকার ছায়া যেন সারা পাড়াকে অন্ধকারের মতো গ্রাস করিতে আসিতেছে…সকলেরই মুখে যেন একটা ভয়ের ভাব।
শীতের সন্ধ্যা ঘনাইয়াছে। পাড়ার সকলে ব্ৰহ্মঠাকরুনের সৎকারের ব্যবস্থা করিতে তাহার বাড়ির উঠানে সমবেত হইয়াছে। কাজলের দাদামশায়ও গিয়াছেন। কাজল ভয়ে ভয়ে খানিকটা দূরে অগ্রসর হইয়া দেখিতে গেল—কিন্তু ব্রহ্মঠাকরুনের বাড়ি পর্যন্ত যাইতে পারিল না—কিছু দূরে একটা বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়াইয়া রহিল। সেখান হইতে উঠানটা বা বাড়িটা দেখা যায় না—কথাবার্তার শব্দও কানে আসে না। বাতাস লাগিয়া বাঁশঝাড়ের কঞ্চিতে কঞ্চিতে শব্দ হইতেছে–চারি ধার নির্জন…কাজলের বুক দুরুদুরু করিতেছিল…একটা অদ্ভুত ধরনের ভাবে তাহার মন পূর্ণ হইল—ভয় নয়, একটা বিস্ময়-মাখানো রহস্যের ভাব…অন্ধকারে গা লুকাইয়া দু-একটা বাদুড় আকাশ দিয়া উড়িয়া চলিয়াছে, অন্যদিন এমন সময়ে বাদুড় দেখিলেই কাজল বলিয়া উঠে—বাদুড় বাদুড় মেথর, যা খাবি তা তেঁতর।
আজ উড়নশীল বাদুড়ের দৃশ্য তাহার মনে কৌতুক না জাগাইয়া সেই অজানা রহস্যের ভাবই যেন ঘনীভূত করিয়া তুলিল।
ব্ৰহ্মঠাকরুন মারা গেলেন বটে কিন্তু মৃত্যুকে কাজল এই প্রথম চিনিল। দিদিমা মারা গিয়াছিলেন কাজলের পাঁচবছর বয়সে তাহাও গভীর রাত্রে, কাজল তখন ঘুমাইয়া ছিল—কিছু দেখে নাই—বোঝেও নাই, এবার মৃত্যুর বিভীষিকা, এই অপূর্ব রহস্য তাহর শিশু-মনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। একা একা বেড়ায়, তেমন সঙ্গী-সেজুড় নাই—আর ওই সব কথা ভাবে। একদিন তাহার মনে হইল যদি সেও ব্রহ্মঠাকরুনের মতো মরিয়া যায়!…হাত-পায়ে যেন সে বল হারাইয়া ফেলিল,—সত্য, সে-ও হয়তো মারা যাইবে!…।
দিনের পর দিন ভয়টা বাড়িতে লাগিল। একলা শুইয়া শুইয়া কথাটা ভাবে-নদীর বাঁধা ঘাটের পৈঠায় সন্ধ্যার সময় বসিয়া ওই কথাই মনে ওঠে।…এই বড়দলের তীরে দিদিমার মতো, ব্রহ্মঠাকরুনের মতো তার দেহও একদিন পুড়াইতে
কথাটা ভাবিতেই ভয়ে সর্বশরীর যেন অবশ হইয়া আসে…
কাজল তাহার জন্মের সালটা জানিত; কিছুদিন আগে তাহার দাদামশায় সীতানাথ পণ্ডিতের কাছে কাজলের ঠিকুজি করাইয়াছিলেন—সে সে-সময় সেখানে ছিল। কিন্তু তাবিখটা জানে না তবে মাঘ মাসের শেষের দিকে, তা জানে।
একদিন সে দুপুরে চুপি চুপি কাছারি ঘরে ঢুকিল। তাকের উপরে রাশীকৃত পুরানো পাঁজি সাজানো থাকে। চুপি চুপি সবগুলি নামাইয়া ১৩৩০ সালের পাঁজিখানা বাছিয়া লইয়া মাঘ মাসের শেষের দিকের তারিখগুলা দেখিতে লাগিল–কি সে বুঝিল সেই জানে—তাহার মনে হইল ২৫শে মাঘ বড়ো খারাপ দিন। ওই দিন জমিলে আয়ু কম হয়, খুব কম। তাহার প্রাণ উড়িয়া গেল—ওই দিমটাতেই হয়তো সে জন্মিয়াছে।…ঠিক।
বড়ো মামিকে বৈকালে জিজ্ঞাসা করিল–আমি জন্মেছি কত তারিখে মামিমা?…বড়ো মামিমার তো তাহা ভাবিয়া ঘুম নাই! তিনি জানেন না। বড়ো মামাতো ভাই পটলকে জিজ্ঞাসা করিল–আমি কবে জমেছি জানিস পটলদা?…পটলের বয়স বছর দশেক, সে কি করিয়া জানিবে? দাদামশায়ের কাছে ঠিকুজি আছে, কিন্তু জিজ্ঞাসা করিতে ভরসা হয় না। একদিন সীতানাথ পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করিল। তিনি বলিলেন-কেন, সে খোঁজে তোমার কি দরকার?
সে থাকিতে না পারিয়া সোজাসুজি বলিয়াই ফেলিল–আ-আমি ক-কতদিন বাঁচব পণ্ডিতমশায়?
সীতানাথ পণ্ডিত অবাক হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন—এমন কথা কোন ছেলের মুখে কখনও তিনি শুনেন নাই। শশীনারায়ণ বাঁড়ুজ্যেকে ডাকিয়া কহিলেন-শুনেছেন ও বাঁড়ুজ্যেমশায়, আপনার নাতি কি বলছে?
শশীনারায়ণ শুনিয়া বলিলেন–এদিকে তো বেশ ইচড়-পাকা? দু-মাসের মধ্যে আজও তো দ্বিতীয় নামতা রপ্ত হল না-বলল বাবো পোনেরং কত?
