এ যেন এমন একটা শক্তি যা বিপুল, বিশাল, বিরাট। অসীম ধৈর্যের ও গাম্ভীর্যের সহিত সে সংহত শক্তিতে চুপ করিয়া অপেক্ষা করিতেছে, কারণ সে জানে তাহার নিজ শক্তির বিপুলতা। অপু একবার ছিলওয়ারার জঙ্গলে একটা খনির সাইডিং লাইন তৈরি হওয়ার সময়ে অরণ্যভূমির তপস্যাস্তব্ধ, দূরদর্শী, রুদ্রদেবের মতো এই মৌন গম্ভীর ভাব লক্ষ করিয়াছিল। ওই শক্তিটা ধীরভাবে শুধু সুযোগ প্রতীক্ষা করিতেছে মাত্র।
অপুর কিন্তু চাকরি হইল না। এবার একা মিঃ রায়চৌধুরীর হাত নয়। জয়েন্ট স্টক কোম্পানির অন্যান্য ডাইরেক্টররা নাকি রাজি হইল না। হয়তো বা তাহারা ভাবিল, এ লোকটার সেখানে ফিরিবার এত আগ্রহ কেন? পুরানোলোক, চুরির সুলুকসন্ধান জানে, সেই লোভেই যাইতেছে। তা ছাড়া ডাইরেক্টররাও মানুষ, তাহাদেরও প্রত্যেকেরই বেকার ভাগনে, ভাইপো, শালীর ছেলে আছে।
সে ভাবিল চাকরি না হয় বইখানা বাহির করিয়া দেখিবে চলে কিনা। মাসিক পত্রিকায় দুএকটা গল্পও দিল, একটা গল্পের বেশ নাম হইল, কিন্তু টাকা কেহ দিল না। হঠাৎ তাহার মনে হইল—অপর্ণার গহনাগুলি শ্বশুরবাড়িতে আছে, সেগুলি সেখান হইতে এই সাত-আট বৎসর সে আনে নাই। সেগুলি বেঁচিয়া তো বই বাহির করার খরচ জোগাড় হইতে পারে। এই সহজ উপায়টা কেন এতদিন মাথায় আসে নাই?
সে লীলার কাছে আরও কয়েকবার গেল, কিন্তু কথাটা প্রকাশ করিল না। উপন্যাসের খাতাখানা লইয়া গিয়া পড়িয়া শোনাইল। লীলা খুব উৎসাহ দেয়। একদিন লীলা হিসাব করিতে বসিল বই ছাপাইতে কত লাগিবে। অপু ভাবিল-—অন্য কেউ যদি দিত হয়তো নিতুম, কিন্তু লীলা। বেচারির ঢাকা নেব না।
একদিন সে হঠাৎ খবরের কাগজে তাহার সেই কবিরাজ বন্ধুটির ঔষধের দোকানের বিজ্ঞাপন দেখিতে পাইল। সেইদিনই সন্ধ্যার পর সে ঠিকানা খুঁজিয়া সেখানে গেল, সুকিয়া স্ট্রীটের একটা গলিতে দোকান। বন্ধুটি বাহিরেই বসিয়া ছিল, দেখিয়া বলিয়া উঠিল-বাঃ–তুমি! তুমি বেঁচে আছ দাদা?
অপু হাসিয়া বলিল—উঃ, কম খুঁজি নি তোমায়! ভাগ্যিস আজ তোমার শিল্পাশ্রমের বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ল, তাই তো এলুম। তারপর কি খবর বলো? দোকানের আসবাবপত্র দেখে মনে হচ্ছে, অবস্থা ফিরিয়ে ফেলেছ!
বন্ধু খানিকটা চুপ করিয়া রহিল। খানিকটা এ-গল্প ও-গল্প করিল। পরে বলিল—এসো, বাসায় এসো।
ছোট সাদা রঙের দোতলা বাড়ি, নিচের উঠানে একটা টিনের শেডের তলায় আট-দশটি লোক কি সব জিনিস প্যাক করিতেছে, লেবেল আঁটিতেছে, অন্যদিকে একটা কল ও চৌবাচ্চা, আর একটা টিনের শেডে গুদাম। উপরে উঠিয়াই একটা মাঝাবি হলঘব, দু-পাশে দুটো ছোট ছোট ঘর, বেশ সাজানো। একটা সেঠ্ টমাসের বড়ো ক্লক ঘড়ি দালানে টকটক করিতেছে। বন্ধু ডাকিয়া বলিল–ওরে বিন্দু, শোন, তোর মাকে বল, এক্ষুনি দু-পেয়ালা চা দিতে।
অপু উৎসুকভাবে বলিল—তার আগে একবার বৌঠাকরুনের সঙ্গে দেখাটা করি–বিন্দুকে বলো তাকে এদিকে একবার আসতে বলতে? না কি, এখন অবস্থা ফিবেছে বলে তিনি আব আমার সঙ্গে দেখা করবেন না?
কবিরাজ বন্ধু ম্লানমুখে চুপ করিয়া রহিলফের নিম্নসুরে অনেকটা যেন আপন মনেই বলিল—সে আব তোমার সঙ্গে দেখা করবে না ভাই। তাকে আর কোথায় পাবে? রমলা আব সে দুজনেই ফাঁকি দিয়েছে।
অপু অবাক মুখে তাহার দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল।
–এক মাঘে রমলা গেল, পবেব শ্রাবণ সে গেল। ওঃ, সে কি সোজা কষ্ট গিয়েছে ভাই? তখন ওদিকে কাবুলীর দেনা, এদিকে মহাজনের দেনা-যমে-মানুষে টানাটানি চলছে। তোমার কথা কত বলত। এই শ্রাবণে পাঁচ বচ্ছর হয়ে গিয়েছে। তারপরে বিয়ে করব না, করব না,–আজ বছর তিনেক হল বদ্যিবাটীতে–
তারপর বন্ধুর কথায় নতুন-বৌ চা ও খাবার লইয়া অপুর সামনেই আসিল। শ্যামবর্ণ, স্বাস্থ্যবতী, কিশোরী মেয়েটি, চোখ মুখ দেখিয়া মনে হয় খুব চটপটে, চতুর। খাবার খাইতে গিয়া খাবারের দলা যেন অপুর গলায় আটকাইয়া যায়। বন্ধুটি নিজের কোন কালির বড়ি ও পাতা চায়ের প্যাকেটের খুব বিক্রি ও ব্যবসায়ের দিক হইতে এ-দুটি দ্রব্যের সাফল্যের গল্প কবিতেছিল।
উঠিবার সময় বাহিরে আসিয়া অপু জিজ্ঞাসা করিল–নতুন বৌটি দেখতে তো বেশ, এ দিকেও বেশ গুণবতী, ন.?
–মন্দ না। কিন্তু বড়ো মুখ ভাই। আগের তাকে তো জানতে? সে ছিল ভালো মানুষ। এর পান থেকে চুন খসলেই কি কবি ভাই, আমার ইচ্ছে ছিল না যে আবার–
ফুটপাথে একা পড়িয়াই অপুর মনে পড়িল, পটুয়াটোলার সেই খোলার বাড়ির দরজার প্রদীপহাতে হাস্যমুখী, নিরাভরণা, দরিদ্র গৃহলক্ষ্মীকে—আজ ছবছর কাটিয়া গেলেও মনে হয় যেন কালকার কথা!
২১. কাজল বড়ো হইয়া উঠিয়াছে
একবিংশ পরিচ্ছেদ
কাজল বড়ো হইয়া উঠিয়াছে, আজকাল গ্রামের সীতানাথ পণ্ডিত সকালে একবেলা করিয়া পড়াইয়া যান, কিন্তু একটু ঘুমকাতুরে বলিয়া সন্ধ্যার পর বদমাশের অনেক বকুনি সত্ত্বেও সে পড়িতে পারে না, চোখের পাতা যেন জুড়াইয়া আসে, অনেক সময় যেখানে-সেখানে ঘুমাইয়া পড়ে-রাত্রে কেহ যদি ডাকিয়া খাওয়ায়, তবেই খাওয়া হয়। তা ছাড়া, বেশি রাত্রে খাইতে হইলে দাদামশায়ের সঙ্গে বসিয়া খাইতে হয়—সে এক বিপদ।
দাদামশায়ের সহিত পারতপক্ষে কাজল খাইতে বসিতে চাহে না। বড়ো ভাত ফেলে, ছড়ায় গুছাইয়া খাইতে জানে না বলিয়া দাদামশায় তাকে খাইতে বসিয়া সহবৎ শিক্ষা দেন।
কাজল আলুভাতে দিয়া শুকনা ভাত খাইতেছে—দাদামশায় হাঁকিয়া বলিলেন—ডাল দিয়ে মাখো–শুধু ভাত খাচ্ছ কেন?-মাখো-মেখে খাও–
