–তোমার শ্বশুরবাড়ির দেশে গিয়েছিলুম-জব্বলপুরের কাছে।-বলিয়া ফেলিয়া অপু ভাবিল-কথাটা বলা ভালো হয় নাই, হয়তো লীলার মনে কষ্ট হইবে—ছিঃ–
কথাটা ঘুরাইয়া ফেলিয়া বলিল—আচ্ছা ওই দ্বীপ-মতন ব্যাপারগুলো–ওতে যাবার পথ নেই…।
–সাঁতার দিয়ে যাওয়া যায়। তুমি তো ভালো সাঁতার জানোনা? ওসব কথা যাক— এতদিন কোথায় ছিলে, কি করছিলে বলল। তোমাকে দেখে আজ এত খুশি হয়েছি!…আমার বাসায় এসো আলিপুরে—চা খাবে। একটু তামাটে রঙ হয়েছে কেন?…রোদে ঘুরে-ঘুরে বুঝি-আচ্ছা, আমার কথা তোমার মনে ছিল?
অপু একটু হাসিল। কোন নাটুকে ধরনের কথা সে মুখে বলিতে পারে না। আর এই সময়েই যত মুখচোরা রোগ আসিয়া জোটে! কতকাল পরে তো লীলাকে একা কাছে পাইয়াছে-কিন্তু মুখে কথা জোগায় কই?…কত কথা লীলাকে বলিবে ভাবিয়াছিল—এখন লীলাকে কাছে পাইয়া সে-সব কথা মুখ দিয়া তত বাহির হয়ই না–বরং নিতান্ত হাস্যকর বলিয়া মনে হয়।
হঠাৎ লীলা বলিল—হ্যাঁ ভালো কথা, তুমি নাকি বই লিখেছ? একদিন আমাকে দেখাবে না, কি লিখলে? আমি জানি তুমি একদিন বড় লেখক হবে, তোমার সেই ছেলেবেলার গল্প লেখাব কথা মনে আছে? তখন থেকেই জানি।
পরে সে একটা প্রস্তাব করিল। বিমলেন্দুর মুখে সে সব শুনিয়াছে, বইওয়ালারা বই লইতে চায় —ছাপাইতে কত খরচ পড়ে? এ বই ছাপাইয়া বাহির করিবার সমুদয় খবচ দিতে সে রাজি।
অপ্রত্যাশিত আনন্দে অপুর সারা শরীরে যেন একটা বিদ্যুতের ঢেউ খেলিয়া গেল। সব খরচ। যত লাগে! তবুও আজ সে মুখে কিছু বলিল না।
অপুর মনে লীলার জন্য একটা করুণা ও অনুকম্পা জাগিয়া উঠিল, ঠিক পুরাতন দিনেব মতো। লীলাবও কত আশা ছিল আর্টিস্ট হইবে, ছবি আঁকিবে, অনভিজ্ঞ তরুণ বয়সে তাহারই মতো কি স্বপ্নের জাল বুনিত! এখন শুধু নতুন নতুন মোট গাড়ি কিনিতেছে, সাহেবি দোকানে লেস কিনিয়া বেড়াইতেছে—পুরাতন দিনের যজ্ঞবেদীতে আগুন কই, নিভিয়া গিয়াছে। যজ্ঞ কিন্তু অসমাপ্ত। কৃপার পাত্র লীলা। অভাগিনী লীলা!
ঠিক সেই পুরাতন দিনের মতো মনটি আছে কিন্তু তাহাকে সাহায্য করিতে মায়ের পেটের মমতামযী-বোনেব মতোই হাত বাড়াইয়া দিয়াছে অমনি। আশৈশব তাহার বন্ধু…তাহার সম্বন্ধে অন্তত ওর মনের তারটি খাঁটি সুরেই বাজিল চিবদিন। এখানেও হয়তো করুণা, মমতা, অনুকম্পা—ওদেরই বাড়িতে না তাহার মা ছিল রাঁধুনী, কে জানে হয়তো কোন্ শুভ মুহূর্তে তাহার হীনতা, দৈন্য, অসহায় বাল্যজীবন বড়োলোকের মেয়ে লীলার কোমল বাল্যমনে ঘা দিয়াছিল, সহানুভূতি, করুণা, মমতা জাগাইয়াছিল। সকল সত্যকার ভালোবাসার মশলা এরাই—এরা যেখানে নাই, ভালোবাসা সেখানে মাদকতা আনিতে পারে, মোহ আনিতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়িত্বের স্নিগ্ধতা আনে না।
সে ভাবিল, লীলার মনটা ভালো বলে সেই সুযোগে সবাই ওর টাকা নিচ্ছে। ও বেচারি এখনও মনে সেই ছেলেমানুষটি আছে—আমি ওকে exploit করতে পারব না। দরকার নেই,আমার বই ছাপানোয়।
এদিকে মুশকিল। হাতের টাকা ফুরাইল। চাকুরিও জোটে না।
মিঃ রায়চৌধুরী অনবরত ঘুরাইতে ও হাঁটাইতে লাগিলেন। অপু যেখানে ছিল সেখানে আবার এঁরা ম্যাঙ্গানিজের কাজ আরম্ভ করিয়াছেন, অপু ধরিয়া পড়িল তাহাকে আবার সেখানে পাঠানো হউক। অনেকদিন ঘোরানোর পর মিঃ রায়চৌধুরী একদিন প্রস্তাব করিলেন, সে আরও কম টাকার বেতনে সেখানে যাইতে রাজি আছে কি না? অপমানে অপুর চোখে জল আসিল, মুখ রাখা হইয়া উঠিল। একথা বলিতে উহারা আজ সাহস করিল শুধু এইজন্য যে, উহারা জানে যতই কম হউক না কেন সে সেখানে ফিরিয়া যাইতে রাজি হইবে, অর্থের জন্য নয়—অর্থের জন্য এ অপমান সে সহ্য করিবে না নিশ্চয়।
কিন্তু…
শরতের প্রথম নিচের অধিত্যকায় প্রথম আবলুস ফল পাকিতে শুরু করিয়াছে বটে, কিন্তু মাথার উপরে পর্বতসানুর উচ্চস্থানে এখনও বর্ষা শেষ হয় নাই। টেপারি বনে এখন ফল পাকিয়া হলদে হইয়া আছে, ভালুকদল এখনও সন্ধ্যার পরে টেপারি খাইতে নামে, টিয়াপাখির ঝাক সারাদিন কলরব করে, আরও উপরে যেখান হইতে বাদাম ও সেগুন বনের শুরু, সেখানে অজস্র সাদা মাজু ফল, আরও উপরে রিঠাগাছে থোলোথোলো ফল ধরিয়াছে, এমন কি ভালো করিয়া খুঁজিয়া দেখিলে, দু-একটা রিঠাগাছে এখনও দু-এক ঝাড় দেরিতে ফোটা রিঠা ফুলও পাওয়া যাইতে পারে।
সেখানকার সেই বিরাট বুক্ষ আরণ্যভূমি, নক্ষত্রালোকিত আলো-আঁধার, উদার জনহীন বিশাল তৃণভূমি, সেই টানা একঘেয়ে পশ্চিমে হাওয়া, সেই অবাধ জ্যোৎস্না, স্বাধীনতা, প্রসারতা, সেই বিরাট নির্জনতা তাহাকে আবার ডাকিতেছে।
এক এক সময় তাহার মনে হয় কানাডায়, অস্ট্রেলিয়ায়, নিউজিল্যান্ডে, আফ্রিকায় মানুষ প্রকৃতির এই মুক্ত সৌন্দর্যকে ধ্বংস করিতেছে সত্য, গাছপালাকে দূর করিয়া দিতেছে বটে, কিন্তু প্রকৃতি একদিন প্রতিশোধ লইবে। ট্রপিস্-এর অরণ্য আবার জাগিবে, মানুষকে তাহারা তাড়াইবে, আদিম অরণ্যানী আবার ফিরিবে। ধরাবিদ্রাবণকারী সভ্যতাদর্পী মানুষ যে স্থানে সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছে, পর্বতমালার নাম দিয়াছে নিজের দেশের রাজার নামে, হ্রদের নাম দিয়াছে রাজমন্ত্রীর নামে; ওর শুশুক, পাখি, শিল, বগা হরিণ, ভালুককে খুন করিয়াছে—তেল ব্যবসা, চামড়ার লোভে, ওর মহিমময় পাইন অরণ্য ধূলিসাৎ করিয়া কাঠের কারখানা খুলিয়াছে, এ সবের প্রতিশোধ একদিন আসিবে।
