মেয়েরা পাড়া হিসেবে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বনভোজনের আয়োজন করছে। এখানে আর রান্না হয় না, বাড়ি থেকে যার যার যেমন সঙ্গতি–খাবার জিনিস নিয়ে এসে কলার পাতা পেতে খেতে বসে, মেয়েরা ছড়া কাটে, গান গায়, উলু দেয়, শাঁখ বাজায়। এই বনভোজনের একটি চিরাচরিত প্রথা এই, তুমি সম্পন্ন গৃহস্থঘরের বৌ, তুমি ভালো জিনিস এনেচ খাবার জন্যে–যারা দারিদ্র্যের জন্যে তেমন কিছু আনতে পারে নি, তাদের তুমি ভাগ করে দেবে নিজের আনা ভালো খাবার। এ কেউ বলে দেয় না, কেউ বাধ্যও করে না–এ একটি অলিখিত গ্রাম্য-প্রথা বরাবর চলে আসচে এবং সবাই মেনেও এসেচে।
যেমন আজ হল; তুলসী লাল কস্তাপেড়ে শাড়ি পরে যতীনের বৌ আর বোন নন্দরাণীর কাছে এসে দাঁড়ালো। আজ মেলামেশা ও ছোঁয়াছুঁয়ির খুব কড়াকড়ি না থাকলেও বামুনবাড়ির ঝি-বৌরা নদীর ধার ঘেঁষে খাওয়ার পাত পাতে, অন্যান্য বাড়ির মেয়েরা মাঠের দিকে ঘেঁষে খেতে বসে। যতীনের বৌ এনেচে চালভাজা, দুটি মাত্র পাকা কলা ও একঘটি ঘোল। তাই খাবে ওর ননদ নন্দরাণী আর ও নিজে। তুলসী এসে বললেও স্বর্ণ, কেমন আছ ভাই?
-ভালো দিদি। খোকা আসে নি?
–না, তাকে রেখে এ্যালাম বাড়িতি। বড় দুষ্টুমি করবে এখানে আনলি। কি খাবা ও স্বর্ণ?
–এই যে। ঘোলটুকু আমার বাড়ির। আজ তৈরি করিচি সকালে। তিন দিনের পাতা সর। একটু খাস তো নিয়ে যা দিদি।
তুলসী ঘোল নেওয়ার জন্যে একটা পাথরের খোরা নিয়ে এল, ওর। হাতে দুখানা বড় ফেনিবাতাসা আর চারটি মর্তমান কলা।
–ও আবার কি দিদি?
–নাও ভাই, বাড়ির কলা। বড় কাঁদি পড়েল আষাঢ় মাসে, বর্ষার জল পেয়ে ছড়া নষ্ট হয়ে গিয়েল।
তিলু বিলু খেতে এসেচে বনে, নিলু খোকাকে নিয়ে রেখেচে বাড়িতে। ওদের সবাই এসে জিনিস দিচ্চে, খাতির করচে, মিষ্টি কথা বলছে। দুধ, চিনির মঠ, আখের গুড়ের মুড়কি, খই, কলা, নানা খাবার। ওরা যত বলে নেবো না, ততই দিয়ে যায় এ এসে, ও এসে। ওরাও যা এনেছিল, নীলমণি সমাদ্দারের পুত্রবধূর (ওদের অবস্থা গ্রামের মধ্যে বড় হীন) সঙ্গে সমানে ভাগ করেচে।
–ও দিদি, কি খাবি ভাই?
–দুটো চালভাজা এনেলাম তাই। আর একটা শশা আছে।
–দুধ নেই?
–দুধ কনে পাবো? গাই এখনো বিয়োয় নি।
–এখনো না? কবে বিয়োবে?
–আশ্বিন মাসের শেষাগোসা।
তিলুর ইঙ্গিতে বিলু ওদের দুজনকে চিড়ে, মুড়কি, বাতাসা, চিনির মঠ এনে দিলে। ষষ্ঠী চৌধুরীর স্ত্রী ওদের পাকাকলা দিয়ে গেলেন ছসাতটা।
ফণি চক্কত্তির পুত্রবধূ বললে–আমার অনেকখানি খেজুরের গুড় আছে, নিয়ে আসছি তাই।
তিলু বললে–আমি নেবো না ভাই, ওই ছোট কাকিমাকে দাও। অনেক মঠ আর বাতাসা জমেচে। বিধুদিদি, এবার ছড়া কাটলে না যে? ছড়া কাটো শুনি।
বিধু ফণি চক্কত্তির বিধবা বোন, পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস– একসময়ে সুন্দরী বলে খ্যাতি ছিল এ গ্রামে। বিধু হাত নেড়ে বলতে আরম্ভ করলে–
আজ বলেচে যেতে
পান সুপুরি খেতে
পানের ভেতর মৌরি-বাটা
ইস্কে বিস্কে ছবি আঁটা
কলকেতার মাথা ঘষা
মেদিনীপুরের চিরুনি
এমন খোঁপা বেঁধে দেবো চাঁপাফুলের গাঁথুনি
আমার নাম সরোবালা
গলায় দেবো ফুলের মালা…
বিলু চোখ পাকিয়ে হেসে বললে–কি বিধুদিদি, আমার নামে বুঝি ছড়া বানানো হয়েচে? তোমায় দেখাচ্চি মজা–বলে,
চালতে গাছে ভোমরার বাসা
সব কোণ নেই তার এক কোণ ঠাসা
তোমারে আমি–-আচ্ছা, একটা গান কর না বিধুদিদি? মাইরি নিধুবাবুর টপ্পা একখান গাও শুনি
বিধু হাত-পা নেড়ে ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগলো–
ভালবাসা কি কথার কথা সই, মন যার সমে গাঁথা
শুকাইলে তরুবর বাঁচে কি জড়িতা লতা
মন যার সনে গাঁথা।
ও পাড়ার একটি অল্পবয়সী লাজুক বৌকে সবাই বললে–একটা শ্যামাবিষয়ক গান গাইতে। বৌটি ভজগোবিন্দ বাঁড়ুয্যের পুত্রবধূ, কামদেবপুরের রত্নেশ্বর গাঙ্গুলীর তৃতীয়া কন্যা, নাম নিস্তারিণী। রত্নেশ্বর গাঙ্গুলী এদিকের মধ্যে একজন ভালো ডুগি-তবলা বাজিয়ে। অনেক আসরে বৃদ্ধ রত্নেশ্বরের বড় আদর। নিস্তারিণী শ্যামবর্ণা, একহারা, বড় সুন্দর ওর চোখ দুটি, গলার সুর মিষ্টি। সে গাইলে বড় সুস্বরে–
নীলবরণী নবীন বরুণী নাগিনী-জড়িত-জটা বিভূষিণী
নীলনয়নী জিনি ত্রিনয়নী কিবা শোভে নিশানাথ নিভাননী।
গান শেষ হলে তিলু পেছন থেকে গিয়ে ওর মুখে একখানা আস্ত চিনির মঠ গুঁজে দিলো। বৌটির লাজুক চোখের দৃষ্টি নেমে পড়লো, বোধ হয় একটু অপ্রতিভ হল অতগুলি আমোদপ্রিয় বড় বড় মেয়ে সামনে।
বললে–দিদি, ঠাকুরজামাইকে দিয়ে যান গে—
–তোর ঠাকুরজামাইকে তুই দেখেচিস নাকি?
বিলু এগিয়ে এসে বললে–কেন রে ছোটবৌ, ঠাকুরজামাইয়ের নাম হঠাৎ কেন? তোর লোভ হয়েচে নাকি? খুব সাবধান! ওদিকি তাকাবি নে! আমরা তিন সতীনে ঝাঁটা নিয়ে দোরগোড়ায় বসে পাহারা দেবো, বুঝলি তো? ঢুকবার বাগ পাবি ক্যামন করে?
কাছাকাছি সবাই হি-হি করে হেসে উঠলো।
এমন সময়ে একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখা গেল–ঠিক কি সেই সময়েই দেখা গেল স্বয়ং ভবানী বাঁড়ুয্যে রাঙা গামছা কাঁধে এবং কোলে খোকাকে নিয়ে আবির্ভূত।
নালু পালের স্ত্রী তুলসী বললে–ঐ রে! ঠাকুরজামাই বলতে বলতেই ওই যে এসে হাজির
ভবানী বাঁড়ুয্যে কাছে এসে বললেন–বেশ! আমাদের ঘাড়ে ওকে চাপিয়ে দিয়ে–বেশ! ও বুঝি থাকে? ঘুম ভেঙ্গেই মা-মা চিৎকার ধরলো। অতিকষ্টে বোঝাই–তাই কি বোঝে?
