ভবানী বাঁড়ুয্যে কি কামারের দোকানে চুঁচ বিক্রি করতে আসেন নি!
তিনি বিনীতভাবে বললেন–আমার মুখে কি শুনবেন? তিনিই বিরাট, তিনিই এই সমুদয় বিশ্বের স্রষ্টা। তিনি অক্ষর ব্রহ্ম, তিনিই প্রাণ, তিনিই বাক্য, তিনিই মন।
তদেতদক্ষরং ব্রহ্ম স প্রাণস্তদুবাঙ মনঃ
তদেতৎ সত্যং তদমৃতং তদ্বেদ্ধব্যং সোম্যবিদ্ধি
রামকানাই কবিরাজ সংস্কৃতে নিতান্ত অনভিজ্ঞ নন, কথা শুনতে শুনতে চোখ বুজে ভাবের আবেগে বলতে লাগলেন–আহা! আহা! আহা!
তিনি ভবানীর হাত দুটি ধরে বললেন–কি কথাই শোনালেন, জামাইবাবু। এ সব কথা কেউ এখানে বলে না। মনডা আমার জুড়িয়ে গেল। বড় ভালো লাগে এসব কথা। বলুন, বলুন।
ভবানী বাঁড়ুয্যে নম্রভাবে সশ্রদ্ধ সুরে বলতে লাগলেন–
অনোরনীয়ান্মহতো মহীয়ান
আস্যজন্তোর্নিহিতং গুহায়াং।
তিনি ক্ষুদ্র থেকেও ক্ষুদ্রতর, মহৎ থেকেও মহৎ। ইনি সমস্ত প্রাণীর হৃদয়ের মধ্যেই বাস করেন। আসীননা দূরং ব্রজতি, উপবিষ্ট হয়েও তিনি দূরে যান, শয়ানো যাতি সর্বতঃ–শুয়ে থেকেও তিনি সর্বত্র যান।
যদর্ফিমদ যদণুভ্যোহণু চ
যস্মিন্ লোকা নিহিতা লোকিনশ্চ।
যিনি দীপ্তিমান, যিনি অণুর চেয়েও সূক্ষ্ম। যাঁর মধ্যে সমস্ত লোক রয়েছে, সেইসব লোকের অধিবাসীরা রয়েছে–
রামকানাই চিঁড়ে খেতে খেতে চিঁড়ের বাটিটা ঠেলে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন। তাঁর ডান হাতে তখনো একটা আধ-খাওয়া কাঁচা লঙ্কা, মুখে বোকার মতো দৃষ্টি, চোখ দিয়ে জল পড়ছে। ছবির মতো দেখাচ্চে সমস্তটা মিলে।…ভবানী বাঁড়ুয্যে বিস্মিত হলেন ওঁর জলে-ভরা টসটসে চোখের দিকে তাকিয়ে।
খালের ওপারে বাবলা গাছের মাথায় সপ্তমীর চাঁদ উঠেছে পরিষ্কার আকাশে। হুতুমপ্যাঁচা ডাকচে নলবনের আড়ালে।
.
ভবানী অনেক রাত্রে বাড়ি রওনা হলেন। শরতের আকাশে অগণিত নক্ষত্র, দূরে বনান্তরে কাঠঠোকরার তন্দ্ৰাস্তব্ধ রব, ক্বচিৎ বা দুএকটা শিয়ালের ডাক–সবাই যেন তাঁর কাছে অতি রহস্যময় বলে মনে হচ্ছিল। আজ ভগবানের নিভৃত, নিস্তব্ধ রসে তাঁর অন্তর অমৃতময় হয়েচে বলে তাঁর বারবার মনে হতে লাগলো। রহস্যময় বটে, মধুরও বটে। মধুর ও রহস্যময় ও বিরাট ও সুন্দর ও বড় আপন সে দেবতা। একমাত্র দেবতা, আর কেউ নেই। যিনি অশব্দ, অস্পর্শ, অরূপ, অব্যয়, অরস ও অগন্ধ, অনাদি ও অনন্ত, তাঁর অপুর্ব আবির্ভাবে নৈশ আকাশ যেন থমথম করচে। এসব পাড়াগাঁয়ে সেই দেবতার কথা কেউ বলে না। বধির বনতলে ওদের পাশ-কাটিয়ে চলে যায়। নক্ষত্র ওঠে না, জ্যোৎস্নাও ফোটে না। সবাই আছে বিষয়সম্পত্তির তালে, দুহাত এগিয়ে ভেরেণ্ডার কচা পুঁতে পরের জমি ফাঁকি দিয়ে নেবার তালে।
হে শান্ত, পরম ব্যক্ত ও অব্যক্ত মহাদেবতা, সমস্ত আকাশ যেমন অন্ধকারে ওতপ্রোত, তেমনি আপনাতেও। তুমি দয়া করো, সবাইকে দয়া কোরো। খোকাকে দয়া কোরো, তাকে দরিদ্র করো ক্ষতি নেই, তোমাকে যেন সে জানে। ওর তিন মাকে দয়া কোরো।
তিলু স্বামীর জন্যে জেগে বসে ছিল; রাত অনেক হয়েচে, এত রাত্রে তো কোথাও থাকেন না উনি? বিলু ও নিলু বারবার ওদের ঘর থেকে এসে জিজ্ঞেস করচে। এমন সময় নিলু বাইরের দিকে উঁকি মেরে বললে–ঐ যে মূর্তিমান আসচেন।
তিলু বললে–শরীর ভালো আছে দেখচিস তো রে?
–বলে তো মনে হচ্চে। বলি ও নাগর, আবার কোন্ বিন্দেবলীর কুঞ্জে যাওয়া হয়েছিল শুনি? বড়দিকে কি আর মনে ধরছে না? আমাদের না হয় না-ই ধরলো–
ভবানী এগিয়ে এসে বললেন–তোমরা সবাই মিলে এমন করে তুলেচ যেন আমি সুন্দরবনের বাঘের পেটে গিয়েচি। রাত্রে বেড়াতে বেরোবার জো নেই। রামকানাই কবিরাজের বাড়ি ছিলাম।
বিলু বললে–সেখানে কি আজকাল গাঁজার আড্ডা বসে নাকি? নিলু বললে–নইলি এত রাত অবধি সেখানে কি হচ্ছিল? তিলু বোনেদের আক্রমণ থেকে স্বামীকে বাঁচিয়ে চলে।–কোনোরকমে ওদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে স্বামীর হাত-পা ধোবার জল এনে দিলে। বললে-পা ধুয়ে দেবো? পায়ে যে কাদা!
–ওই মাসি কাঁটাতলার কাছে ভীষণ কাদা।–কি খাবেন? –কিছু না। চিড়ে খেয়ে এসেচি কবিরাজের বাসা থেকে।
–না খেলি হবে না। ওবেলার চালকুমড়োর সুতুনি রাখতি বলেছিলেন–রয়েচে। সে কে খাবে? এক সরা সুকুনি রেখে দিইছিল নিলু। ও বড় ভালবাসে আপনাকে–
–আচ্ছা, দাও। খোকনকে কি খাইয়েছিলে?
–দুধ।
–কাশি আর হয় নি?
–শুঁট গুঁড়ো গরমজলে ভিজিয়ে খেতি দিইচি।
ভবানী বাঁড়ুয্যে খেতে বসে তিলুকে সব কথা বললেন। তিলু শুনে। বললে–উনি অন্যরকম লোক, সেদিনও ঐ কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন মনে আছে? আপনি সেদিন পড়িয়েছিলেন–পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ তাঁর চেয়ে বড় আর কিছু নেই, এই তো মানে?
–ঠিক।
–আমিও ভাবি–ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকি, সবসময় পেরে উঠি নে! আপনি আমাকে আরো পড়াবেন। ভালো কথা, আমাদের দুআনা করে পয়সা দেবেন।
–কেন?
–কাল তেরের পালুনি। বনভোজনে যেতি হবে।
–আমিও যাবো।
–তা কি যায়? কত বৌ-ঝি থাকবে। আচ্ছা, তেরের পালুনির দিন বিষ্টি হবেই, আপনি জানেন?
–বাজে কথা।
-বাজে কথা নয় গো। আমি বলচি ঠিক হবে।
–তোমারও ঐ সব কুসংস্কার কেন? বৃষ্টির সঙ্গে কি কার্যকারণ। সম্পর্ক থাকতে পারে বনে বসে খাওয়ার?
–আচ্ছা, দেখা যাক। আপনার পণ্ডিতি কতদূর টেকে!
.
ভাদ্র মাসের তেরোই আজ। ইছামতীর ধারে তেরের পালুনি করবার জন্যে পাঁচপোতা গ্রামের বৌ-ঝিরা সব জড়ো হয়েচে। নালু পালের স্ত্রী তুলসীকে সবাই খুব খাতির করছে, কারণ তার স্বামী অবস্থাপন্ন। তেরের পালুনি হয় ধারের এক বহু পুরোনো জিউলি গাছের আর কদম গাছের তলায়। এই জিউলি আর কদম গাছ দুটো একসঙ্গে এখানে দাঁড়িয়ে আছে যে কতদিন ধরে, তা গ্রামের বর্তমান অধিবাসীদের মধ্যে কেউ বলতে পারে না। অতি প্রাচীন লোকদের মধ্যে নীলমণি সমাদ্দারের মা বলতেন, তিনি যখন নববধূরূপে এ গ্রামে প্রবেশ করেছিলেন আজ থেকে ছিয়াত্তর বছর আগে, তখনো তিনি তাঁর শাশুড়ি ও দিদিশাশুড়ির সঙ্গে এই গাছতলায় তেরের পালুনির বনভোজন করেছিলেন। গত বৎসর পঁচাশি বছর বয়সে নীলমণির মা। দেহত্যাগ করেছেন।
