খোকা জনতার দিকে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে বললে—মা
বিলু ছুটে গিয়ে খোকাকে কোলে নিয়ে বললে–কেন, নিলু কোথায়? আপনার ঘাড়ে চাপানো হয়েচে কে বললে? নিলুর কোলে বসিয়ে দিয়ে আমি–
–বৌদিদিরা ডেকে পাঠালেন নিলুকে। বড়দাদার শরীর অসুখ করেচেও চলে গেল আমার ঘাড়ে চাপিয়ে
বৌ-ঝিরা ভবানীকে দেখে কি সব ফিসফিস্ করতে লাগলো জটলা করে, কেউ কথা বলবে না। সে নিয়ম এসব অঞ্চলে নেই। প্রবীণা বিধু এসে বললে–ও বড়-মেজ-ছোট জামাইবাবু, সব বৌ-ঝিরা বলচে, ঠাকুরজামাইকে আজ যখন আমরা পেয়ে গিইচি তখন আজ আর ছাড়চি নে–আমাদের
ভবানী বাঁড়ুয্যে কথা শেষ করতে না দিয়েই তাড়াতাড়ি হাতজোড় করে বললেন–না, মাপ করুন বিধুদিদি, আমি একা পেরে উঠবো না–বয়েস হয়েচে–
এই কথাতে একটা হাসির বন্যা এসে গেল বৌ-ঝিদের মধ্যে। কারো চাপা হাসি, কেউ খিলখিল করে হেসে উঠলো, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ওদিকে, কেউ ঘোমটার আড়ালে খুকখুক করে হাসতে লাগলো– হাসির সেই প্লাবনের মধ্যে ভাদ্র অপরাহে নদীর ধারের কদম ডালে রাঙা রোদ আর ইছামতীর ওপারে কাশফুলের দুলুনি। কোথাও দূরে ঘুঘুর ডাক। নিস্তারিণীর কোলে খোকার অর্থহীন বকুনি। সব মিলিয়ে তেরের পালুনি আজ ভালো লাগলো নিস্তারিণীর। ঠাকুরজামাই কি আমুদে মানুষটি! আর বয়েস হলেও এখনো চেহারা কি চমৎকার!
.
নতুন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নীলকুঠি পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। মিঃ ডঙ্কি বদলি হয়ে যাওয়ার পর অনেক দিন কোনো ম্যাজিস্ট্রেট নীলকুঠিতে পদার্পণ করেন নি। কাজেই অভ্যর্থনার আড়ম্বর একটু ভালো রকমই হল। খুব খানাপিনা, নাচ ইত্যাদি হয়ে গেল। যাবার সময় নতুন ম্যাজিস্ট্রেট কোলম্যান্ সাহেব বড়সাহেবকে নিভৃতে কয়েকটি সদুপদেশ দিয়ে গেলেন।
-Do you read native newspapers? You do? Hard times are ahead. Mr. Shipton. Stuff some wisdom into the brains of your men. You understand? I hope you will not mind my saying so?
-Explain that to me.
-I will, presently.
আসল কথা ক্রমশ দিন খারাপ হচ্ছে। দেশী কাগজওয়ালারা খুব হৈচৈ আরম্ভ করেচে, হিন্দু পেট্রিয়ট কাগজে হরিশ মুখুয্যে গরম গরম। প্রবন্ধ লিখচে, রামগোপাল ঘোষ নীলকরদের বিরুদ্ধে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা করচে, নেটিভরা মানুষ হয়ে উঠলো, সে দিন আর নেই, একটু সাবধানে সব কাজ করে যাও। আমাদের ওপর গবর্নমেন্টের গোপন সার্কুলার আছে নীলসংক্রান্ত বিবাদে আমরা যেন, যতদূর সম্ভব, প্রজাদের পক্ষে টানি।
কোলম্যান সাহেবের মোট বক্তব্য হল এই।
পরদিন বড়সাহেব ডেভিড সাহেবকে ডেকে বললে সব কথা। ডেভিড বোধ হয় একটু অসন্তুষ্ট হল। বললে–You see, I can work and I can do with very little sleep and I have never wasted time on liking people. Perhaps I am not clever enough
-No David, we have a stake down here, in this god-forsaken land. You see? What I want to drive at is this
এমন সময়ে শ্রীরাম মুচি এসে বললে–সায়েব, বাইরে দপ্তরখানায় প্রজারা বসে আছে। খুব হাঙ্গামা বেধেচে। হিংনাড়া, রসুলপুরের বাগদিরা খেপেছে। তারা নাকি নীলির মাঠে গোরু ছেড়ে দিয়ে নীলির চারা খেইয়ে ফেলেচে
ডেভিড লাফিয়ে উঠে বললে–কনেকার প্রজা? হিংনাড়া? সাদেক মোড়ল আর ছিহরি সর্দার ওই দুটো বদমাইশের দিকি আমার অনেকদিন থেকে নজর আছে; শাসন কি করে করতি হয় তা আমি জানি।
শিপটন সাহেব ভয়ানক রেগে বলে উঠলেন–The devil that is! I will come in with you this time. Will you like to come on a mouse-hunt to-morrow morning?
-Sure I will.
– I wonder whether I ever told you these thieving people drove off some of our horses from the village?
-My stomach! You never did.
-Well, be ready to-morrow morning. May be we would kill off the mice right away.
-Sure.
পরদিন সকালে এক অভিনব দৃশ্য দেখা গেল।
দুই ঘোড়ায় দুই সাহেব, পিছনে আর এক সাদা বড় ঘোড়ায় দেওয়ান রাজারাম রায়, আর বাদামি রঙের ঘোড়ায় প্রসন্ন চক্কত্তি আমিন এক লম্বা সারিতে চলেচে-ওদের পিছনে কুঠির লাঠিয়ালদের সর্দার রসিক মল্লিক। লোকে বুঝলে আজ একটা ভয়ঙ্কর দাঙ্গা-হাঙ্গামার ব্যাপার না হয়ে আর যায় না। হঠাৎ একস্থানে প্রসন্ন আমিন টুক করে নেমে পড়লো। হেঁকে রাজারামকে বললে–দেওয়ানজি, একটু এগিয়ে যান, ঘোড়ার জিন্টা ঢল হয়ে গেল, কষে নি–
তারপর মুখ উঁচু করে দেখলে, ওরা বেশ দুকদম দূরে চলে গিয়েচে। প্রসন্ন চক্কত্তি ঘোড়াটা কাদের একটা সোঁদালি গাছে বেঁধে রাস্তা থেকে সামান্য কিছু দূরে অবস্থিত একখানা চালাঘরের বাইরে গিয়ে ডাকলে–গয়া, ও গয়া–
ভিতর থেকে গয়ার মা বরদা বাগদিনীর গলা শোনা গেল–কেডা গা বাইরে?
প্রসন্ন চক্কত্তি প্রমাদ গুনলো। এ সময়ে বুড়ি থাকে না বাড়িতে, কুঠিতে মেমসাহেবদের কাজ করতে যায়–ছেলে ধরা, ছেলেদের স্নান করানো এইসব। ও আপদ আজ এখন আবার–আঃ যতো হাঙ্গাম কি–প্রসন্ন চক্কত্তি গলা ছেড়ে বললে–এই যে আমি, ও দিদি
–কেডা গা? আমিনবাবু? কি–এমন অসময়ে?
বলতে বলতে বরদা বাগদিনী এসে বাইরে দাঁড়ালো, বোধ হয়। ধানসেদ্ধ করছিল–ধানের হাঁড়ির কালি হাতে মাখানো। মাথায় ঝাঁটার মতো চুলগুলো চুড়োর আকারে বাঁধা। মুখ অপ্রসন্ন।
