রাজারাম বললেন–মেয়ের মতো থাকবি। আর গোয়াল পঙ্কার মষ্কার করবি। তোর মার কাছে চাবি যা যখন খেতি ইচ্ছে হবে। নারকোল খাবি তো কত নারকোল আছে, করে নিয়ে খাস। মুড়কি মাখা আছে ঘরে। খাবার জন্য নাকি আবার কেউ বেরিয়ে যায়? আমার বাড়ির জিনিস খেয়ে গাঁয়ের লোক এলিয়ে যায় আর আমার গাঁয়ের মেয়ে বেরিয়ে যাবে পেট ভরে খেতি পায় না বলে? তোর এ পক্ষের বৌটাকেও বলবি শাম, কাজড়া ভালো করে নি। বলি, ওর মা নেই যখন, তখন কেডা ওরে দেখবে বল।
শাম বিরক্তি দেখিয়ে বললে–বলবেন না সে সুমুন্দির ইস্ত্রীর কথা! মোর হাড় ভাজাভাজা করে ফেললে-মুই মাঠ থেকে ফিরলি মোরে বলে না যে দুটা চালভাজা খা। রোজ পান্তভাত, রোজ পান্তভাত। মুই বলি দুটো গরম ভাত মোরে দে, সেই সূর্যি ঘুরে যাবে তখন দুটো। ঝিঙে ভাতে দিয়ে ভাত দেবে। মরেও না যে, না হয় আবার একটা বিয়ে করি।
কুসুম মুখ টিপে হাসছে। বাবার কথায় তার খুব আমোদ হয়েচে বোধ হয়।
রামকানাই কবিরাজ খেজুরপাতার চট পেতে দিলেন ভবানী বাঁড়ুয্যেকে। বললেন–জামাইবাবু! আসুন, আসুন।
–কি করছিলেন?
–ঈষের মূল সেদ্ধ করবো, তার যোগাড় করছি। এত বর্ষায় কোত্থেকে?
সন্ধ্যা হবার দেরি নেই। অঝোরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে শ্রাবণের মাঝামাঝি। এ বাদলা তিন দিন থেকে সমানে চলচে। তিৎপল্লা গাছের ঝোপ বৃষ্টিতে ভিজে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মাটির পথ বেয়ে জলের স্রোত চলেছে ছোট ছোট নালার মতো। বৃষ্টির শব্দে কান পাতা যায় না।
বাগদিপাড়ার নলে বাগদি, অধর সর্দার, অধর সর্দারের তিন জোয়ান ছেলে, ভেঁপু, মালি–এরা সব ঘুনি আর পোলো নিয়ে বাঁধালে জলের তোড়ে হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে মাছ ধরবার চেষ্টা করছে। বৃষ্টির গুঁড়ো ছাঁটে চারিধারে ধোঁয়া-ধোঁয়া। রামকানাইয়ের ঘরের পেছনে একটা সোঁদালি গাছে এখনো দুএক ঝাড় ফুল দুলচে। মাঠে ঘাসের ওপর জল বেধে ছোট পুকুরের মতো দেখাচ্চে। পথে জনপ্রাণী নেই কোনো দিকে। ঘরের মধ্যে চালের ফাঁক দিয়ে একটা নতুন তেলাকুচোর লতা ঢুকেচে, নতুন পাতা গজিয়েছে তার চারু কমনীয় সবুজ ডগায়।
–তামাক সাজি বসুন। ভিজে গিয়েচেন যে! গামছাখানা দিয়ে মুছে ফেলুন–
–এ বর্ষায় তিন দিন আজ বাড়ি বসে। একটু সৎ চর্চা করি এমন। লোক এ গাঁয়ে নেই–সবাই ঘোর বৈষয়িক। তাই আপনার কাছে এলাম।
–আমার কত বড় ভাগ্যি জামাইবাবু। দুটো চিড়ে খাবেন, দেববা? গুড় আছে কিন্তু।
–আপনি যদি খান তবে খাবো।
–দুজনেই খাবো, ভাববেন না। অতিথি এলেন ঘরে, দেবার কি আছে, কিছুই নেই। যা আছে তাই দেলাম। শিশিনিতি একটু গাওয়া ঘি আছে, মেখে দেবো?
–দেখি, আপনি কিনেছেন না নিজে করেন?
রামকানাই একটা ছোট্ট শিশি কাঠের জলচৌকি থেকে নিয়ে ভবানীর হাতে দিলেন। বললেন–নিজে তৈরি করি। গয়ামেম একটু করে দুধ দেয়, আমারে বাবা বলে। মেয়ে ভালো। সেই মেয়ে এই শিশিনি এনে দিয়েচে সায়েবদের কুঠি থেকে। যে সরটুকু পড়ে, তাই জমিয়ে ঘি করি। ঘি আমাদের ওষুধে লাগে কিনা। অনেকে গব্য ঘৃত মিশিয়ে বাজারের ভয়সা ঘি মেশায়–সেটা হোলো মিথ্যে আচরণ। জীবন নিয়ে যেখানে কারবার, সেখানে শঠতা, প্রবঞ্চনা যারা করে, তারা তেনার কাছে জবাবদিহি দেবে একদিন কি করে?
–আর কবিরাজমশাই! দুনিয়াটা চলচে শঠতা আর প্রবঞ্চনার ওপরে। চারিধারে চেয়ে দেখুন না। আমাদের এ গাঁয়েই দেখুন। সব কটি ঘুণ বিষয়ী! শুধু গরিবের ওপর চোখরাঙানি, পরের জমি কি করে ফাঁকি দিয়ে নেবো, পরনিন্দা, পরচর্চা, মামলা এই নিয়ে আছে।
কুয়োর ব্যাঙ হয়ে পড়ে আছে এই মোহগর্তে।
রামকানাই ততক্ষণে গাওয়া ঘি মাখালেন চিঁড়েতে। গুড় পাড়লেন শিকেতে ঝুলোনো মাটির ভাঁড় থেকে। পাথরের খোরাতে ঘি-মাখা কাঁচা চিড়ে রেখে ভবানী বাঁড়ুয্যেকে খেতে দিলেন।
ভবানীকে বললেন–কাঁচা লঙ্কা একটা দেবো?
–দিন একটা
–আচ্ছা, একটু আদি সংবাদ শোনাবেন? ভগবান কি রকম? তাঁকে দেখা যায়? আপনারে বলি, এই ঘরে একলা রাত্তিরি অন্ধকারে বসে বসে ভাবি, ভগবানডা কেডা? উত্তর কেডা দেবে বলুন। আপনি একটু বলুন।
ভবানী বাঁড়ুয্যে নিজেকে বিপন্ন বিবেচনা করলেন। রামকানাই কবিরাজ সৎ লোক, সত্যসন্ধ লোক। তাঁকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। এত বড় গম্ভীর প্রশ্নের উত্তর তিনি দেবেন? এই বৃদ্ধের পিপাসু মনের খোরাক যোগাবার যোগ্যতা তাঁর কি আছে? বিশেষ করে বিশ্বের কর্তা ভগবানের কথা। যেখানে সেখানে যা তা ভাবে তিনি তাঁর কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। বড় শ্রদ্ধা করেন ভবানী বাঁড়ুয্যে যাঁকে, তাঁর কথা এভাবে বলে বেড়াতে তাঁর বাধে। উপনিষদের সেই বাণী মনে পড়লো ভবানীর–
অবিদ্যায়াং বহুধা বর্তমান
বয়ং কৃতার্থা ইত্যভিমন্যন্তি বালাঃ।
নানাপ্রকার অজ্ঞানতায় ও মূঢ়তায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেও অজ্ঞানী ব্যক্তি ভাবে, আমি বেশ আছি, আমি কৃতার্থ!
তিনিও কি সেই দলের একজন নন?
এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁর চেয়ে উপযুক্ত লোক নয়? এ কি সে দলের একজন নয়, যাঁরা—
তপঃশ্রদ্ধে য হ্যপবস্যারণ্যে
শান্তা বিদ্বাংশে ভৈক্ষাচর্যাং চরন্ত
সূর্যদ্বারেণ তে বিরজাঃ প্রয়ান্তি
যথামৃতঃ স পুরুষো হ্যব্যয়াত্মা।
ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে যে সকল শান্ত জ্ঞানী ব্যক্তি অরণ্যে বাস করেন, শ্রদ্ধার সঙ্গে তপস্যায় নিযুক্ত থাকেন, সেই সব নিরাসক্ত নির্লোভ ব্যক্তি সূর্যদ্বারপথে সেইখানে যান, যেখানে সেই অব্যয়াত্মা অমৃতময় পুরুষ বিদ্যমান।
