.
আধঘণ্টা পরে দেওয়ান রাজারামের চণ্ডীমণ্ডপে অনেক লোক জড়ো হয়েচে। তার মধ্যে ভবানী বাঁড়ুয্যেও আছেন।
ফণি চক্কত্তি বললেন–তারপর ভায়া, কোনো চোট-টোট লাগে নি
রাজারাম রায় বললেন–না দাদা, তা লাগেনি, আপনাদের আশীৰ্বাদে যুদ্ধই হয় নি। এর আগে ওরা অনেক লোক নাকি মেরেছিল, সে হোলো নিরীহ গাঁয়ের লোক।
–তিতুমীর কেডা?
–মুসলমানদের মোড়লপানা, যা বোঝলাম ওদের কথাবার্তার ভাবে। সেদিন বসে আছি হঠাৎ বড়সায়েবের কাছে চিঠি এল, তিতুমীর বলে একটা ফকির মহারানীর সঙ্গে লড়াই বাধিয়েচে। নীলকুঠির লোকদের ওপর তার ভয়ানক রাগ। লুঠপাঠ করচে, খুন-খারাবি হচ্চে।
–চিঠি দিলে কে বড়সায়েবের কাছে?
–ডঙ্কিনসন সায়েবের জায়গায় যে নতুন ম্যাজিস্টর এসেচেন, তিনি লিখেছেন, তোমরা লোকজন নিয়ে এসো–যেখানে যত নীলকুঠির সায়েব ছিল, গিয়ে দেখি যমুনার ধারে আমবাগানে তাঁবু সব সারি সারি। লোকজন, ঘোড়া, আসবাব, বন্দুক। ওদিকে সরকারি সৈন্য এসেছে, তাদের তাঁবু। সে এক এলাহি কাণ্ড, দাদা। আমার তো গিয়ে ভারি মজা লাগতি লাগলো। প্রসন্ন চক্কত্তি আমিন গিয়েছিল, সে বড় দুদে। বললে, আমি দেখে আসি তিতুমীর কোথায় কিভাবে আছে। আমাদের কারো ভয় হয় নি। যুদ্ধই তো হোলো না, একটা বাঁশের কেল্লা বাঁধিয়েচে যমুনার ধারে।
–অনেক সায়েব জড়ো হয়েছিল?
–বোয়ালমারি, পানচিতে, রঘুনাথগঞ্জ, পালপাড়া, দীঘড়ে-বিষ্ণুপুর। সব কুঠির সায়েব লোকজন নিয়ে এসেচে। বন্দুক, গুলি, বারুদ। মুরগি, হাঁস, খাসি যোগাচ্চে গাঁয়ের লোকে। একটা মেয়েছেলেকে এমন মার মেরেচে তিতুমীরের লোক যে, তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত ঝোঁঝালি দিয়ে পড়ছিল। তিতুমীরের কেল্লা ছিল এককোশ তিনপোয়া পথ দূরি। আমরা ছিলাম একটা আমবাগানে।
–যুদ্ধ কেমন হোলো?
–তিতুমীর বলেছিল তার লোকজনদের, সায়েবদের গোলাগুলিতি তার কিছুই হবে না। সরকারের সেপাইরা প্রথমবার ফাঁকা আওয়াজ করে। তিতুমীর তার লোকজনদের বললে–গোলাগুলি সে সব খেয়ে ফেলেচে। তখন আবার গুলি পুরে বন্দুক ছোঁড়া হোলো। বাইশজন লোক ফৌৎ। তখন বাকি সবাই টেনে দৌড় মারলে। তিতুমীরকে বেঁধে চালান দিলে কলকেতা। মিটে গেল লড়াই। তারপর আমরা সব চলে এলাম। নীলমণি সমাদ্দার তামাক খেতে খেতে বললেন–আমরা সব ভেবে। খুন। না জানি কি মস্ত লড়াইয়ের মধ্যি গেল রাজারাম দাদা। আরে তুমি হলে গিয়ে গাঁয়ের মাথা। তুমি গাঁয়ে না থাকলি মনডা ভালো লাগে? শাম বাগদির বড় মেয়ে কুসুম বেরিয়ে গেল ওর ভগ্নীপতির সঙ্গে। মামুদপুর থেকে ওর বাবা ওরে ধরে নিয়ে এল। তার বিচের ছিল পরশু। তুমি না থাকাতি হোলো না। আজ আবার হবে শুনচি।
৪. শাম বাগদির মেয়ে কুসুম
সন্ধ্যাবেলা এল শাম বাগদি ও তার মেয়ে কুসুম।
রাজারাম বললেন–কি গা শাম?
মেয়েডারে নিয়ে এ্যালাম কর্তাবাবুর কাছে। যা হয় বিচের করুন।
রাজারাম বিজ্ঞ বিষয়ী লোক, হঠাৎ কোনো কথা না বলে বললেন– তোর মেয়ে কোথায়?
-ওই যে আড়ালে দাঁড়িয়ে। শোন, ও কুসী–
কুসুম সামনে এসে দাঁড়ালো, আঠারো থেকে কুড়ির মধ্যে বয়েস, পূর্ণযৌবনা নিটোল, সুঠাম দেহ–একটাল কালো চুল মাথায়, কালো। পাথরে কুঁদে তৈরি করা চেহারা, আশ্চর্য সুন্দর চোখ দুটি। মুখোনি বেশ, রাজারাম কেবল গয়ামেমকেই এত সুঠাম দেখেছেন। মেয়েটার চোখে ভারি শান্ত সরল দৃষ্টি।
রাজারাম ভাবলেন, বেশ দেখচি যে! ধুকড়ির মধ্যে খাসা চাল! বড়সায়েব যদি একবার দেখতে পায় তাহলে লুফে নেয়।
–নাম কি তোর?
–কুসুম।
–কেন চলে গিইছিলি রে?
কুসুম নিরুত্তর।
–বাবার বাড়ি ভালো লাগে না কেন?
কুসুম ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে রাজারামের দিকে চেয়ে বললে–মোরে পেট ভরে খেতি দেয় না সৎমা। মোরে বকে, মারে। মোর ভগিনপোত বললে–মোরে বাড়ি কিনে দেবে, মোরে ভালোমন্দ খেতি দেবে
–দিইছিল?
–মোরে গিয়ে ধরে আনলে বাবা। কখন মোরে দেবে?
–আচ্ছা ভালোমন্দ খাবি তুই, থাক আমার বাড়ি। থাকবি?
–না।
–কেন রে?
–মোর মন কেমন করবে।
–কার জন্যি? বাবাকে ছেড়ে তো গিইছিল। সৎমা বাড়িতি। কার জন্যি মন কেমন করবে রে?
কুসুম নিরুত্তর।
ওর বাবা শাম বাগদি এতক্ষণ দেওয়ান রাজারামের সামনে সমীহ করে চুপ করে ছিল, এইবার এগিয়ে এসে বললে–মুই বলি শুনুন কর্তাবাবু। আমার এ পক্ষের ছোট ছেলেটা ওর বড় ন্যাটো। তারি জন্যি ওর মন কেমন করে বলচে।
–তাই যদি হবে, তবে তারে ছেড়ে পালিয়েছিলি তো? সে কেমন কথা হোলো? তোদের বুদ্ধি-সুদ্ধিই আলাদা। কি বলে কি করে আবোল তাবোল, না আছে মাথা না আছে মুণ্ডু। থাকবি আমার বাড়ি। ভালোমন্দ খাবি। বেশি খাটতি হবে না, গোয়ালগোবর করবি সকালবেলা।
শাম বাগদি বললে–থাক কর্তাবাবুর বাড়ি, সব দিক থেকেই তোর সুবিধে হবে।
রাজারাম জগদম্বাকে ডেকে বললে–ওগো শোনো, এই মেয়েটি আমাদের এখানে থাকবে আজ থেকে। ও একটু ভালোমন্দ খেতে ভালবাসে। মুড়কি আছে ঘরে?
জগদম্বা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে ওদের কি চেয়ে ছিলেন। বললেন–ও তো বাগদিপাড়ার কুসী না? ও ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িতে কত এসেচে ওর দিদিমার সঙ্গে-মনে পড়ে না, হাঁরে?
কুসুম ঘাড় নেড়ে বললে-মুই তখন ছেলেমানুষ ছিলাম। মোর মনে। নেই।
–থাকবি আমাদের বাড়ি?
–হাঁ।
–বেশ থাক। চিড়ে মুড়কি খাবি? আয় চল রান্নাঘরের দিকি।
