ভবানী বাঁড়ুয্যে জানতেন না তিলু এত কথা বলতে পারে বা এভাবে কথা বলতে পারে। স্ত্রীর দিকে চেয়ে বললেন–ভালো।
তিলু হেসে বললে–কি ভালো?
–ভালো বললে। আচ্ছা কবিরাজমশাই, আপনার বয়েস কত?
–১২৩৪ সালের মাঘ মাসে জন্ম। তা হলি হিসেব করুন। সতেরোই মাঘ।
–আপনি আমার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। দাদা বলে ডাকব আপনাকে।
তিলু বললে–আমিও। দাদা, মাঝে মাঝে আপনি এসে এখানে পাতা পাড়বেন। পাড়বেন কি না বলুন?
রামকানাই কবিরাজ ভাবচেন, দিনটা আজ ভালো। এদের মতো লোক এত আদর করবে কেন নইলে?
–পাতা পাড়বো বৈকি! একশো বার পাড়বো! আমার ভগ্নীর বাড়ি। ভাত খাবো না তো কমনে খাবো? আচ্ছা, আজ যাই দিদি। আরো একটা রুগী দেখতি হবে সবাইপুরে। খোকারে যা দেলাম, বিকেলের দিকি জ্বর ছেড়ে যাবে। কাল সকালে আবার দেখে যাবো।
নিলু সুক্তনিতে ফোড়ন দিয়ে নামিয়ে নিলে। খোকনকে ওর কাছে দিয়ে ওর মা গিয়েচে বড়দার বাড়ি। বড়দা বড় বিপদে পড়ে গিয়েচেন, তাঁকে নাকি কোথায় যেতে হবে সাহেবদের সঙ্গে সে কথা শুনতে গিয়েচে বড়দি।
খোকন বলচে-ছো মা–ছো মা
-কি?
–দে।
–কি দেবো? না, আর গুড় খায় না।
খোকন বড় শান্ত। আপন মনে খেলতে খেলতে একটা তেলসুদ্ধ বাটি উপুড় করে ফেললে–তারপর টলতে টলতে আসতে লাগলো। উনুনের দিকে।
–নাঃ, এবার পুড়ে ঝলসে বেগুনসেদ্ধ হয়ে থাকবি। আমি জানি নে বাপু! রাঁধবো আবার ছেলে সামলাবো, তিনি রাজরানী আর ছেলে নিয়ে বাপের বাড়ি যেতি পারলেন না! ও মেজদি–মেজদি–কেউ যদি বাড়িতি থাকবে কাজের সময়! বোস এখানে–এই!..দাঁড়া দেখাচ্চি মজা আবার তেলের বাটি হাতে নিইচিস?
খোকন বললে–বাটি।
–বাটি রাখো ওখানে।
–মা।
–মা আসচে বোসো। ঐ আসচে।
খোকন বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে বললে–নেই।
তারপর হাত দুটি নেড়ে বললে–নেই নেই–যা–আঃ–
–আচ্ছা নেই তো নেই। চুপটি করে বোসো বাবা আমার
–বাবা।
–আসচেন। গিয়েচেন নদীতে নাইতি।
–মা।
–আসচে।
–মা।
–বাবা রে বাবা, আর বতি পারি নে তোর সঙ্গে! বোসো–এই! গরম-গরম-পা পুড়ে যাবে! গরম সুকুনির ওপর গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়চে। ও মেজদি
এইবার খোকন কান্না শুরু করলে। নিলুর গলায় তিরস্কারের আভাসে, কান্নার সুরে বলে–মা-আ-আ
নিলু ছুটে এসে খোকনকে কোলে তুলে নিয়ে বললেও আমার মানিক, কাঁদে না সোনামণিরামমণি-শ্যামমণি–চুপ চুপ। কে কেঁদেছে? আমার সোনার খোকন কেঁদেছে। কেন কেঁদেছে? মেজদি যা মর সব, জমের বাড়ি যা–আমার খোকনের খোয়ার করে পাড়া বেরুনো হয়েচে!
খোকন ফুলে ফুলে কাঁদতে কাঁদতে বললে–মা–
–কেঁদো না। আমি তোমায় বকি নি। আমি বলি বাবা আমার আর সহ্যি করতি পারেন না। আমি বকি নি। কি দিই হাতে? ওমা ওটা কি রে? পাখি?..
এমন সময় তিলু দ্রুতপদে ঘরের মধ্যে ঢুকে বললে–এই যে সোনামণি–কাঁদছে কেন রে?
–তোমার আদুরে গোপাল একটা উঁচু সুর শুনলি অমনি ঠোঁট ওটান। চড়া কথা বলবার জো নেই।
নিলু বললে–দাদা কোথায় গিয়েচেন দেখে এলে?
–দাদা গিয়েচেন সায়েবদের কাজে। কোথায় তিতুমীর বলে একটা লোক, মহারানীর সঙ্গে যুদ্ধ করচে সেই লড়াইতে নীলকুঠির সায়েবরা লোকজন নিয়ে গিয়েচে, দাদাকেও নিয়ে গিয়েচে।
তাই তো শুনে এলাম। বৌদিদি কেঁদে-কেটে অন করচে। লড়াই হেন ব্যাপার, কে বাঁচে কে মরে তার ঠিকানা কি আছে?
নিলু হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো পা ছড়িয়ে। তিলু যত বলে, যত সান্ত্বনা দেয়–নিলু ততই বাড়ায়–খোকা অবাক হয়ে ক্রন্দনরতা ছোট মার মুখের দিকে খানিকটা চেয়ে থেকে নিজেও চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হল বিলু। সে নিলুর ও খোকার কান্নার রব শুনে ভাবলে বাড়িতে নিশ্চয় একটা কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। সে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললে–কি হোলো দিদি? নিলুর কি হোলো?…
তিলু বললে–দাদা তিতুমীরের লড়াইয়ে গিয়েচে শুনে কাঁদছে। তুই একটু বোঝা। ছেলেমানুষের মতো এখনো। দাদা ওকে ভালবাসে বড়, এখনো ছেলেমানুষের মতো আবদার করে দাদার কাছে।
বিলু নিলুর পাশে বসে ওকে বোঝাতে লাগলো–যাঃ, ও কি? চুপ কর। ওতে অমঙ্গল হয়। কুঠিসুদ্ধ কত লোক গিয়েচে, ভয় কি সেখানে? ছিঃ, কাঁদে না। তুই না থামলি খোকনও থামবে না। চুপ কর।
তিলু বললে–হ্যাঁ রে, আমাদের দাদা নয়? আমরা কি কাঁদচি? অমন করতি নেই। ওতে অমঙ্গল ডেকে আনা হয়, চুপ কর। দাদা হয়তো আজই এসে পড়বে দেখিস এখন। থাম বাপু
তিলুর মুখের কথা শেষ হতে না হতে ভবানী এসে ঘরের মধ্যে ঢুকলেন। প্রথম কথাই বললেন–দাদা এসেছেন তিতুমীরের লড়াই ফেরতা। দেখা করে এলাম। এ কি? কাঁদচে কেন ও? কি হয়েচে?
–ও কাঁদচে দাদার জন্যি। বাঁচা গেল। কখন এলেন?
–এই তো ঘোড়া থেকে নামচেন।
নিলু কান্না ভুলে আগেই উঠে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। কথা শেষ হতেই বললে–চললা মেজদি, আমরা যাই বড়দাদাকে দেখে আসি।
ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–যেও না।
–যাবো না? বড় দেখতে ইচ্ছে করচে।
–আমি নিজে গিয়ে তত্ত্ব নিয়ে আসছি। তুমি গেলে তোমার গুণধর দিদি যেতে চাইবে। খোকাকে রাখবে কে?
তিলুও বললে–না যাস নে, উনি গিয়ে দেখে আসুন, সেই ভালো।
ওদের একটা গুণ আছে, ভবানী বারণ করলে আর কেউ সে কাজ করবে না। নিলু বললে–আপনার মনটা বড় জিলিপির পাক, জানলেন? আমার দাদার জন্যি আমার কি যে হচ্ছে, আমিই জানি। দেখে আসুন, যান—
