–বেশ চমৎকার দ্রব্যটি।
–অসুখ সারবে তো কবিরাজমশাই?
–না সারলি মাধবনিদান শান্তরডা মিথ্যে। তবে কি জানো, অনুপান আর সহপান ঠিকমতো চাই। ওষুধ রোগ সারাবে না, সারাবে ঠিকমত অনুপান আর সহপান। কলমিশাকের রস খেতি হবে–সেটি হোলো অনুপান। বোঝলে না?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
জলযোগ ব্যবস্থা হলো শসাকাটা, ফুলবাতাসা, নারকোল কোরা ও নারকোল নাড়। আচমনী জিনিস অর্থাৎ কোনো কিছু শস্যভাজা খাবেন না রামকানাই শূদ্রের গৃহে। এককাঠা চাল, মটরডালের বড়ি ও একটা
আধুলি দর্শনী মিললো।
পথে ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–কবিরাজমশাই-নমস্কার হই।
–ভালো আছেন জামাইবাবু?
–আপনার আশীর্বাদে। একটু আমার বাড়ীতে আসতি হবে। ছেলেটার জ্বর আর কাশি হয়েচে দুতিন দিন, একটু দেখে যান।
–হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন।
খোকা ওর মামিমার বুনুনি নক্সা-কাটা কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমুচ্ছিল। রামকানাই হাত দেখে বললেন–নবজ্বর। নাড়িতে রস রয়েছে। বড়ি দেবো, মধু আর শিউলিপাতার রস দিয়ে খাওয়াতি হবে।
ওর মা তিলু এবং ওর দুই ছোট মা উৎসুক ও শঙ্কিত মনে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা এ গ্রামের বধ নয়, কন্যা। সুতরাং গ্রাম্য। প্রথানুযায়ী ওরা যার তার সামনে বেরুতে পারে, যেখানে সেখানে যেতে পারে। কিন্তু যদি এ গ্রামের বধূ হতো, অন্য জায়গার মেয়ে–তা হলে অপরিচিত পরপুরুষ তো দুরের কথা, স্বামীর সঙ্গে পর্যন্ত যখন তখন দিনমানে সাক্ষাৎ করা বা বাক্যালাপ করা দাঁড়াতো বেহায়ার লক্ষণ।
তিলু কাঁদো-কাঁদো সুরে বললে-খোকার জ্বর কেমন দেখলেন, কবিরাজমশাই?
–কিছু না মা, নবজ্বর। এই বর্ষাকালে চারিদিকি হচ্চে। ভয় কি!
–সারবে তো?
–সারবে না তো আমরা রইচি কেন? নিলু বললে–আপনার পায়ে পড়ি কবিরাজমশাই। একটু ভালো করে দেখুন খোকারে।
–মা, আমি বলচি তিনদিন বড়ি খেলি খোকা সেরে ওঠবে। আপনারা ভয় পাবেন না।
–ওর গলার মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ হয় কেন?
–কফ কুপিত হয়েচে, রসস্থ নাড়ি। ও রকম হয়ে থাকে। কিছু ভেবো না। আমার সামনে এই বড়িটা মেড়ে খাইয়ে দাও মা। খল আছে?
–খল আনচি সিধু কাকাদের বাড়ি থেকে।
তিলু বললে–কবিরাজমশাই, বেলা হয়েচে, এখানে দুটি খেয়ে তবে যাবেন। দুপুরবেলা বাড়িতি লোক এলি না খাইয়ে যেতি দিতি আছে? আপনাকে দুটো ভাত গালে দিতিই হবে এখানে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে হাতজোড় করে বললেন–শাক আর ভাত। গরিবের আয়োজন।
রামকানাই বড় অভিভূত ও মুগ্ধ হয়ে পড়লেন এদের অমায়িক ব্যবহারে ও দীনতা প্রকাশের সম্পদে। কেউ কখনো তাঁকে এত আদর করে নি, এত সম্মান দেয় নি। তাতে এরা আবার দেওয়ানজির ভগ্নীপতি, ওদের বাড়ির জামাই।
তিল দুখানা বড় পিঁড়ি পেতে দুজনকে খেতে দিলে।–এটা নিন, ওটা নিন, বলে কাছে বসে কখনো কি রামকানাই কবিরাজকে কেউ খাইয়েচে? মনে করতে পারেন না রামকানাই। মুগের ডাল, পটল ভাজা, মাছের ঝোল, আমড়ার টক আর ঘরেপাতা দই, কাঁঠাল, মর্তমান কলা। নাঃ, কার মুখ দেখে আজ যে ওঠা! অবাক হয়ে যান রামকানাই।
খাওয়ার পরে রামকানাই একটি গুরুতর প্রশ্ন করে বসলেন ভবানী বাঁড়ুয্যেকে।
–আচ্ছা জামাইবাবু, আপনি জ্ঞানী, সাধু লোক। সবাই আপনার সুখ্যেত করে। আমরা এমন কিছু লেখাপড়া শিখি নি। সামান্য সংস্কৃত শিখে আয়ুর্বেদ পড়েছিলাম তেঘরা সেনহাটির পতিতপাবন (হাতজোড় করে প্রণাম করলেন রামকানাই) কবিরাজের কাছে। আমরা কি বুঝি সুজি বলুন! আচ্ছা আদি সংবাদটা কি। আপনার মুখি শুনি।
–কি বললেন? কি সংবাদ?
–আদি সংবাদ?
–আজ্ঞে–ভালো বুঝতে পারলাম না কি বলচেন।
–ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর তিনি মিলি তো জগৎটা সৃষ্টি করলেন।.. এখন এর ভেতরের কথাটা কি একটু খুলে বলুন না। অনেক সময় একা শুয়ে শুয়ে ঘরের মধ্যে এসব কথা ভাবি। কি করে কি হোলো।
ভবানী বাঁড়ুয্যে বিপদে পড়ে গেলেন। ব্রহ্মা বিষ্ণু তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে জগৎটা সৃষ্টি করেন নি, ভেতরের কথা তিনি কি করে বলবেন? কথা বলবার কি আছে। পতঞ্জলি দর্শন মনে পড়লো, সাংখ্য মনে। পড়লো, বেদান্ত মনে পড়লো–কিন্তু এই গ্রাম্য কবিরাজের কাছে–না! অচল! সে সব অচল। তাঁর হাসিও পেল বিলক্ষণ। আদি সংবাদ!
হঠাৎ রামকানাই বললেন–আমার কিন্তু একটা মনে হয়–অনেকদিন বসে বসে ভেবেচি, বোঝলেন? ও ব্রহ্মা বলুন, বিষ্ণু বলুন, মহেশ্বর বলুন–সবই এক। একে তিন, তিনি এক। তা ছাড়া এ সবই তিনি। কি বলেন?
ভবানী বাঁড়ুয্যের চোখের সামনে যদি এই মুহূর্তে রামকানাই কবিরাজ চতুর্ভুজ বিষ্ণুতে রূপান্তরিত হয়ে ওপরের দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা রচনা করে বলতেন–বৎস, বরং বৃনু–ইহা গতোস্মি–তা হলেও তিনি এতখানি বিস্মিত হতেন না। এই সামান্য গ্রাম্য কবিরাজের মুখে। অতি সরল সহজ ভাষায় অদ্বৈত ব্রহ্মবাদের কল্যাণময়ী বাণী উচ্চারিত হল। এই সংস্কারাবদ্ধ, অশিক্ষিত, মোহান্ধ, ঈর্ষাদ্বেষসঙ্কুল, অন্ধকার পাড়াগেঁয়ে এঁদো খড়ের ঘরে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তিনি মানুষ চেনেন। অনেক দেখেছেন, অনেক বেড়িয়েচেন। মুখ তুলে বললেন– কবিরাজমশাই, ঠিক বলেছেন। আপনাকে আমি কি বোঝাবো? আপনি জ্ঞানী পুরুষ।
–হঃ, এইবার ধরেচেন ঠিক জামাইবাবু! জ্ঞানী লোক একডা খুঁজে বার করেচেন—
তিলুও খুব অবাক হয়েছিল। সেও স্বামীর কাছে অনেক কিছু পড়েছে, অনেক কিছু শিখেচে, বেদান্তের মোট কথা জানে। এভাবে সেকথা রামকানাই কবিরাজ বলবে, তা সে ভাবে নি। সে এগিয়ে এসে বললে–আমি অনেক কথা শুনেছি আপনার ব্যাপারে। যথেষ্ট অত্যাচার আপনার ওপর বড়দা করেছেন, নীলকুঠির লোকেরা–আপনি মিথ্যে সাক্ষী দিতে চান নি বলে টাকা খেয়ে সায়েবদের পক্ষে। অনেক কষ্ট পেয়েচেন তবু কেউ আপনাকে দিয়ে মিথ্যে বলাতি পারে নি। রামু সর্দারের খুনের মামলায়। আমি সব জানি। কতদিন ভাবতাম আপনাকে দেখবো। আপনি আজ আমাদের ঘরে আসবেন, আপনারে খাওয়াবো–তা ভাবি নি। আপনার মুখির কথা শুনে বুঝলাম, আপনি সত্যি আশ্রয় করে আছেন বলে সত্যি জিনিস আপনার মনে আপনিই উদয় হয়েচে।
