–ছাই! ও গাঁথা যায় না। বিয়ের জিনিস, ফঙ্গবেনে জিনিস। আমায় বাউটি গড়িয়ে দ্যাও।
–দেবো আর দুটো বছর যাক।
–দুবছর পরে আমি মরে যাবো।
–অমন কথা বলতে নেই, ছিঃ
–এক কড়ার মুরোদ নেই, তাই বলো। এমন লোকের হাতে বাবা আমায় দিয়ে দিল তুলে! দোজবরে বিয়ে আবার বিয়ে? তাও যদি পুষতো তাও তো বুঝ দিতে পারি মনকে। অদৃষ্টের মাথায় মারি ঝাঁটা সাত ঘা।…
এই বলে কাঁদতে বসলো পা ছড়িয়ে সেই সতেরো বছরের ধাড়ী মেয়ে। এতে মনে ব্যথা লাগে কি না লাগে? তার পরের বছর আশ্বিন মাসে বাপের বাড়ি চলে গেল, আর আসেনি। সে আজ সাত-আট বছরের কথা।
এর পরে ও রাজনগরে গিয়েচে দুতিনবার বৌকে ফিরিয়ে আনতে। অন্নপূর্ণার মা গুচ্ছির কথা শুনিয়ে দিয়েছে জামাইকে। মেয়ে পাঠায় নি। বলেচে মুরোদ থাকে তো আবার বিয়ে কর গিয়ে। তোমাদের বাড়ি ধানসেদ্ধ করবার জন্যি আর চাল কুটবার জন্যি আমার মেয়ে যাবে না। খ্যামতা কোনোদিন হয়, পালকি নিয়ে এসে মেয়েকে নিয়ে যেও।
আর সেখানে যায় না প্রসন্ন চক্কত্তি।
.
বিলের ধারে সেদিন বসেছিল প্রসন্ন আমিন।
গয়ামেম আর তার মা বরদা বাগদিনী আসে এই সময়। শুধু একটি বার দেখা। আর কিছু চায় না প্রসন্ন চক্কত্তি।
আজ দূরে গয়ামেমকে আসতে দেখে ওর মন আনন্দে নেচে উঠলো। বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগলো।
গয়া একা আসচে। সঙ্গে ওর মা বরদা নেই।
কাছে এসে গয়া প্রসন্নকে দেখে বললে–খুড়োমশায়, একা বসে আছেন!
-হ্যাঁ।
–এখানে একা বসে?
–তুমি যাবে তাই।
–তাতে আপনার কি?
–কিছু না। এই গিয়ে–তোমার মা কোথায়?
–মা ধান ভানচে। পরের ধান সেদ্ধ শুকনো করে রেখেচে, যে বর্ষা নেমেচে, চাল দিতি হবে না পরকে? যার চাল সে শোনবে? বসুন, চললাম।
–ও গয়া–
–কি?
একটু দাঁড়াবা না?
দাঁড়িয়ে কি করবো? বিষ্টি এলি ভিজে মরবো যে!
প্রসন্ন চক্কত্তি মুগ্ধ দৃষ্টিতে গয়ার দিকে চেয়ে ছিল।
গয়া বললে–দ্যাখচেন কি?
প্রসন্ন লজ্জিত সুরে বললে–কিছু না। দেখবো আবার কি? তুমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকলি, আবার কি দেখবো?
–কেন, আমি থাকলি কি হয়?
–ভাবচি, এমন বেশ দিনটা
গয়া রাগের সুরে বললে–ওসব আবোল-তাবোল এখন শোনবার আমার সময় নেই। চললাম।
–একটু দাঁড়াও না গয়া? মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে দাঁড়ালি?
–না, আমি সঙের মতো দাঁড়িয়ে থাকতি পারবো না এখানে। ঐ দেখুন, দেয়া কেমন ঘনিয়ে আসচে।
ঘাট বাঁওড়ের বিলের ওপারে ঘন সবুজ আউশ ধানের আর নীলের চারার ক্ষেতের ওপর ঘন, কালো শ্রাবণের মেঘ জমা হয়েচে। সাদা বকের দল উড়চে দূর চক্ৰবালের কোলে, মেঘপদবীর নিচে নিচে, হু-হু ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝলক বয়ে এল শ্যামল প্রান্তরের দিক থেকে, সোঁ সোঁ শব্দ উঠলো দূরে, বিলের অপর প্রান্ত যেন ঝাঁপসা হয়ে এসেছে বৃষ্টির ধারায়। রথচক্রের নাভির মতো দেখাচ্চে স্বচ্ছজল বিল বৃষ্টিমুখর তীরবেষ্টনীর মাঝখানে।
প্রসন্ন চক্কত্তি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলো–গয়া ভিজবে যে, বৃষ্টি তো এল। চলো, আমার বাসায়।
-না, আমি কুঠিতে চললাম—
–ও গয়া, শোনো আমার কথা। ভিজবা।
–ভিজি ভিজবো।
–আচ্ছা গয়া আমি ভালোর জন্যি বলচি নে? কেউ নেই আমার বাসায়। চলো।
–না, আমি যাবো না। আপনাকে না খুড়োমশায় বলে ডাকি?
–ডাকো তাই কি হয়েচে? অন্যায় কথাডা কি বললাম তোমারে? বিষ্টিতে ভিজবা, তাই বলচি আমার ঘরটা নিকটে আছে–সেখানে আশ্রয় নেবা। খারাপ কথা এড়া?
–না, বাজে কথা শোনবার সময় নেই। আপনি ছুট দিন, ওই দেখুন তাকিয়ে বিলির ওপারে।
–আমার ওপর রাগ করলে না তো, ও গয়া, শোনো ও গয়া, মাথা খাও, ও গয়া–
গয়া ছুটতে ছুটতে হেঁকে বললেন, না। কি পাগল! এমন মানুষও থাকে?
মিনতির সুরে প্রসন্ন চক্কত্তি হেঁকে বললে–কাউকে বলে দিও না। যেন, ও গয়া! মাইরি!…
দূর থেকে গয়ামেমের স্বর ভেসে এল–ভেজবেন না বাড়ি যান। খুড়োেমশাই–ভেজবেন না–বাড়ি যান–
বিলের শামুক আবার কতটুকু সুধা আশা করে চাঁদের কাছে?
ও-ই যথেষ্ট না?
.
রামকানাই কবিরাজ আশ্চর্য না হয়ে পারেন নি যে আজকাল নীলকুঠির লোকেরা তাকে কিছু বলে না।
আজ আবার গয়ামেম এসে তাঁকে দুধ দিয়ে গিয়েচে, এটা ওটা সেটা প্রায়ই নিয়ে আসে। রামকানাই দাম দিতে পারবেন না বলে আগে আগে নিতেন না, এখন গয়া মেয়ে-সম্পর্ক পাতিয়ে দেওয়ায় পথটা সহজ ও সুগম করেছে। আবার লোকজন ডাকে কবিরাজকে। ঝিঙে, নাউ, দুআনিটা সিকিটা (কুচিৎ)–এই হল দর্শনী ও পারিশ্রমিক।
নাল পালের স্ত্রী তুলসীর ছেলেপিলে হবে, পেটের মধ্যে বেদনা, কি কি অসুখ। হরিশ ডাক্তার দিনকতক দেখেছিল, রোগ সারে নি। লোকে বললে–তোমার পয়সা আছে নালু, ভালো কবিরাজ দেখাও
রামকানাই কবিরাজ ভালোর দলে পড়েন না, কেননা সে গরিব। অর্থেরই লোকে মান দেয়, সততা বা উৎকর্ষের নয়। রামকানাই যদি আজ হরিশ ডাক্তারের মতো পালকিতে চেপে রোগী দেখতে বেরুততা, তবে হরিশ ডাক্তারের মতো আট আনা ভিজিট সে অনায়াসেই নিতে পারতো।
নালু পাল কি মনে ভেবে রামকানাই কবিরাজকে ডাক দিলে। রামকানাই রোগী দেখে বললে, ওষুধ দেবো কিন্তু অনুপান যোগাড় করতি হবে–কলমিশাকের রস, সৈন্ধব লবণ দিয়ে সিদ্দ। ভাঁড়ে করে সে রস রেখে দিতে হবে সাতদিন।
নালু পাল আর সে নালু পাল নেই, অবস্থা ফিরিয়ে ফেলেচে ব্যবসা করে। আটচালা ঘর বেঁধেচে গত বৎসর। আটচালা ঘর তৈরী করা এ সব পাড়াগাঁয়ে বড়মানুষির লক্ষণ, আর চরম বড়মানুষি অবিশ্যি দুর্গোৎসব করা। তাও গত বৎসর নালু পাল করেচে। অনেক লোকজনও খাইয়েচে। নাম বেরিয়ে গিয়েচে বড়মানুষ বলে। ওর ঘরের মধ্যে নতুন কড়ি-বাঁধানো আলমারি, নক্সাকরা হাঁড়ির তাক রঙিন দড়ির শিকেতে ঝুলোনো, খেরোমোড়া শীতলপাটি, কাঁসার পানের ডাবর, ঝকঝকে করে মাজা পিতলের দীপগাছা–সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ীর সমস্ত উপকরণ আসবাব বর্তমান। রামকানাইয়ের প্রশংসমান দৃষ্টি রোগিণীর ঘরের সাজসজ্জার ওপর অনেকক্ষণ নিবদ্ধ আছে দেখে নালু পাল বললে–এইবার ঘূর্ণীর কুমোরদের তৈরি মাটির ফল কিছু আনাবো ঠিক করিচি। ওই কড়ির আলনাটা দ্যাখচেন, আড়াই টাকা দিয়ে কিনেচি বিনোদপুরের এক ব্রাহ্মণের মেয়ের কাছে। তাঁর নিজের হাতে গাঁথা।
