গদাধর চোখের চশমার দড়ি খুলে ফেলে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে বললে–রাজারাম ঠাকুরকে বলে না।
–আমি পারবো না। আমার লজ্জা করে।
–লজ্জার কি আছে? পেট জ্বলচে না?
–তা তো জ্বলচে।
–তবে বলো। আমি পারবো না।
এমন সময় নরহরি পেশকার বারান্দার বাহির থেকে সকলকে ডেকে বললে–দেওয়ানজি। আমিনবাবু। সব চান হয়েচে? ভাত তৈরি। আপনারা নেয়ে আসুন।
দেওয়ান রাজারাম বললেন–আমার এখনো অনেক দেরি। তোমরা খেয়ে নেও গিয়ে।
শেষ পর্যন্ত সকলেই একসাথে খেতে বসলেন–দেওয়ানজি ছাড়া। তিনি নীলকুঠিতে অনুগ্রহণ করেন না। স্নানাক্কি না করেও খান না। এখানে সে সবের সুবিধে নেই তত।
নরহরি পেশকার ভালো ব্রাহ্মণ, সে-ই রান্না করেচে, যোগাড় দিয়েচে গোলাপ পাঁড়ে। তা ভালোই বেঁধেচে। না, সাহেবদের নজর উঁচু, খাঁটিয়ে নিয়ে খাওয়াতে জানে। মস্ত বড় রুই মাছের ঝোল, পাঁচ ছখানা করে দাগার মাছ ভাজা, অম্বল, মুড়িঘণ্ট ও দই।
গদাধর মুহুরী পেটুক ব্যক্তি, শেষকালে বলে ফেললেও পেশকারমশায়, বলি সব করলেন, একটু মিষ্টির ব্যবস্থা করলেন না?
সে সময় রসগোল্লার রেওয়াজ ছিল না। এ সময়ে, মিষ্টি বলতে বুঝতো চিনির মঠ, বাতাসা বা মণ্ডা। নরহরি পেশকার বললে–কথাটা মনে ছিল না। নইলি ছোটসায়েব দিতি নারাজ ছিল না।
গদাধর মুহুরী ভাতের দলা কোঁৎ করে গিলে বললে–না, সায়েবরা খাওয়াতে জানে, কি বলো প্রসন্নদাদা?
প্রসন্ন চক্রবর্তী আমিন কদিন থেকে আজ অন্যমনস্ক। তার মন কোনো সময়েই ভালো থাকে না। কি একটা কথা সে সব সময়েই ভাবচে…ভাবচে। গদাধরের কথার উত্তর দেবার মতো মনের সুখ নেই। এই যে কাজের চাপ, এই যে বড় মাছ দিয়ে ভাতের ভোজ অন্য সময় হলে, অন্য দিন হলে তার খুব ভালো লাগতো–কিন্তু আজ আর সে মন নেই। কিছুই ভালো লাগে না, খেতে হয় তাই খেয়ে যাচ্চে, কাজ করতে হয় তাই কাজ করে যাচ্চে, কলের পুতুলের মতো। আর সব সময়ে সেই এক চিন্তা, এক ধ্যান, এক জ্ঞান।
সে কি ব্যাপার? কি ধ্যান, কি জ্ঞান?
প্রসন্ন আমিন গয়ামেমের প্রেমে পড়েছে।
সে যে কি টান, তা বলার কথা নয়। কাকে কি বলবে? গয়ামেম বড় উঁচু ডালের পাখি। হাত বাড়াবার সাধ্য কি প্রসন্ন চক্কত্তির মতো সামান্য লোকের? গয়ামেম সুদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়েচে এই একটা মস্ত সান্ত্বনা। সুদৃষ্টিতে চাওয়া মানে গয়ামেম জানতে পেরেচে প্রসন্ন আমিন তাকে ভালবাসে আর এই ভালবাসার ব্যাপারে গয়া অসন্তুষ্ট নয় বরং প্রশ্রয় দিচ্ছে মাঝে মাঝে।
এই যে বসে খাচ্চে প্রসন্ন চক্কত্তি–সে সময় মানসনেত্রে কার সুঠাম তনুভঙ্গি, কার আয়ত চক্ষুর বিলোল দৃষ্টি, কার সুন্দর মুখোনি ওর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠেচে? ভাতের দলা গলার মধ্যে ঢুকচে না চোখের জলে গলা আড়ষ্ট হওয়ার জন্যে। সে কার কথা মনে হয়ে…ছোটসাহেবের মদগর্বিত পদধ্বনিও সে তুচ্ছ করেচে কার জন্যে? প্রসন্ন আমিন এতদিন পরে সুখের মুখ দেখতে পেয়েছে। মেয়েমানুষ কখনো তার দিকে সুনজরে চেয়ে দেখে নি। কত বড় অভাব ছিল তার জীবনে। প্রথমবার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, গোঙা, গেঙিয়ে গেঙিয়ে কথা বলতো, নাম যদিও ছিল সরস্বতী। গোঙা হোক, সরস্বতী কিন্তু বড় যত্ন করতো স্বামীকে। তখন সবে বয়েস উনিশ কুড়ি। প্রসন্নর বাবা রতন চক্কত্তি ছেলেকে বড় কড়া শাসনে রাখতেন। বাবা দেখেশুনে বিয়ে দিয়েচিলেন, বলবার জো ছিল না ছেলের। সাধ্য কি?
সরস্বতী রাত্রে পান্তাভাত খেতে দিয়ে লেবু কেটে দিত, তেঁতুলগোলা, লঙ্কা আর তেল দিত মেখে খাবার জন্যে। চড়কের দিন একখানা কাপড় পেয়ে গোঙা স্ত্রীর মুখে কি সরল আনন্দ ফুটে উঠতো। বলতো, আমার বাপের বাড়ি চলো, উচ্ছে দিয়ে কাঁটালবীচি চচ্চড়ি খাওয়াবো। আমাদের গাছে কত কাটাল! এত বড় বড় এক একটা! এত বড় বড় কোয়া!
হাত ফাঁক করে দেখাতো।
আবার রসকলির গান গাইতো আপন মনে গোঙানো সুরে। হাসি পায় নি কিন্তু সে গান শুনে কোনো দিন। মনে বরং কষ্ট হত। না, দেখতে শুনতে ভালো না। বরং কালো, দাঁত উঁচু। তবুও পুষলে। বেড়াল-কুকুরের ওপরও তো মমতা হয়।
সরস্বতী পটল তুললো প্রথমবার ছেলেপিলে হতে গিয়ে। আবার বিয়ে হল রাজনগরের সনাতন চৌধুরীর ছোট মেয়ে অন্নপূর্ণার সঙ্গে। অন্নপূর্ণা দেখতে শুনতে ভালো এবং গৌরবর্ণের মেয়ে বলেই বোধ হয় একটু বেশ গুমুরে। সে এখনো বেঁচে আছে তার বাপের বাড়িতে। ছেলেমেয়ে হয় নি। কোনোদিন মনে-প্রাণে স্বামীর ঘর করে নি। না করার কারণ বোধ হয় ওর বাপের বাড়ির সচ্ছলতা। অমন কেলে ধানের সরু চিড়ে আর শুকো দই কারো ঘরে হবে না। সাতটা গোলা। বাপের বাড়ির উঠোনে।
অন্নপূর্ণা বড় দাগা দিয়ে গিয়েছিল জীবনে। পয়সার জন্য এতো? ধানের মরাইয়ের অহঙ্কার এতো? সনাতন চৌধুরীরই বা কটা ধানের গোলা। যদি পুরুষমানুষ হয় প্রসন্ন চক্কত্তি, যদি সে রতন চক্কত্তির ছেলে হয়–তবে ধানের মরাই কাকে বলে দেখিয়ে দেবে–ওই অন্নপূর্ণাকে দেখাবে একদিন।
একদিন অন্নপূর্ণা তাকে বললে, বেশ মনে আছে প্রসন্ন চক্কত্তির, চৈত্র মাস, গুমোট গরমের দিন, ঘেঁটুফুল ফুটেছে বাড়ির সামনের বাঁশনি বাঁশের ঝাড়ের তলায়, বললে–আমার নারকোল ফুল ভেঙ্গে বাউটি গড়িয়ে দেবা?
প্রসন্ন চক্কত্তির তখন অবস্থা ভালো নয়, বাবা মারা গিয়েচেন, ও সামান্য টাকা রোজগার করে গাঁড়াপোতার হরিপ্রসন্ন মুখুয্যের জমিদারি কাছারিতে। ও বললে–কেন, বেশ তো নারকোল ফুল, পর না, হাতে বেশ মানায়।
