রাজারাম সসম্ভ্রমে বললেন–ওই যে বললাম সায়েব (হুজুর বলার প্রথা আদৌ প্রচলিত ছিল না)–সাতশো বিঘে হবে।
এই সময় বিবি শিপটন বড় বাংলার সামনে এসে নামলেন টমটম থেকে। ভজা মুচি সহিস পেছন থেকে এসে মেমসাহেবের হাত থেকে
লাগাম নিলে এবং তাঁকে টমটম থেকে নামতে সাহায্য করলে। ঘোর অন্ধকার রাত–মেমসাহেব এত রাতে কোথায় গিয়েছিল? রাজারাম ভাবলেন কিন্তু জিজ্ঞেস করবার সাহস পেলেন না।
মেমসাহেব ওদের দিকে চেয়ে হেসে কি ইংরেজিতে বললে। ও হরি! এটা কি? ভজা মুচি একটা মরা খরগোশ নামাচ্চে টমটমের পাদানি থেকে। মেমসাহেবের হাতের ভঙ্গিতে সেটা ভজা সসম্ভ্রমে এনে সাহেবদের সামনে নামালে। মেমসাহেবের হাতে বন্দুক। অন্ধকার মাঠে নদীর ধারে খরগোশ শিকার করতে গিয়েছিল মেমসাহেব তাহলে।
মেমসাহেব ওপরে উঠতেই এই দুই সাহেব উঠে দাঁড়ালো। (যত্তো সব।) ওদের মধ্যে খানিকক্ষণ কি বলাবলি ও হাসাহাসি হল। মেমসাহেব রাজারামের দিকে তাকিয়ে বললে–কেমন হইল শিকার?
বিনয়ে বিগলিত রাজারাম বললেন–আজ্ঞে, চমৎকার!
–ভালো হইয়াছে?
–খুব ভালো! কোথায় মারলেন মেমসায়েব?
–বাঁওড়ের ধারে–এই ডিকে–খড় আছে।
–খড়?
ভজা মুচি মেমসাহেবের কথার টীকা রচনা করে বলে–সবাইপুরির বিশ্বেসদের খড়ের মাঠে।
-ওঃ, অনেকদ্দূর গিয়েছিলেন এই রাত্তিরি।
–আমার কাছে বন্দুক আছে। ভয় কি আছে? ভুটে খাইবে না।
–আজ্ঞে না, ভূত কোথা থেকি আসবে?
–নো, নো, ভজা বলিটেছিল মাটে ভুট আছে। আলো জ্বলে। যায়। আসে, যায় আসে–কি নাম আছে ভজা? আলো ভুট?
ভজা উত্তর দেবার আগে রাজারাম বললেন–আজ্ঞে আমি জানি। এলে ভূত। আমি নিজে কতবার মাঠের মধ্যি এলে ভূতের সামনে পড়িচি। ওরা মানুষেরে কিছু বলে না।
বড়সাহেব এই সময় হেসে বললেন–টোমার মাথা আছে। ভুট আছে! উহা গ্যাস আছে। গ্যাস জ্বলিয়া উঠিল টো টুমি ভুট দেখিল।..(এর পরের কথাটা হল মেমসাহেবের দিকে চেয়ে ইংরিজিতে। রাজারাম বুঝলেন না)…খরগোশ কেমন?
–আজ্ঞে খুব ভালো।
–টুমি খাও?
–না সাহেব, খাই নে। অনেকে খায় আমাদের মধ্যি, আমি খাই
এই সময় প্রসন্ন চক্রবর্তী আমিন ও গিরিশ সরকার মুহুরী অনেক খাতাপত্র নিয়ে এসে হাজির হল। রাজারাম ঘুঘু লোক। তিনি বুঝলেন আজ সারারাত কুটির দপ্তরখানায় বসে কাজ করতে হবে। আমিন দাগ-মার্কার খতিয়ান এনে হাজির করচে কেন? দাগের হিসেব এত রাত্রে কি দরকার?
ছোটসাহেব কি একটা বললে ইংরিজিতে। বড়সাহেব তার একটা লম্বা জবাব দিলে হাত-পা নেড়ে-খাতার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে। ছোটসাহেব ঘাড় নাড়লে।
তারপর কাজ আরম্ভ হল সারারাতব্যাপী। ছোটসাহেব, প্রসন্ন আমিন, তিনি, গিরিশ মুহুরী ও গদাধর চক্রবর্তী মুহুরীতে মিলে। কাজ আর কিছুই নয়, মার্কা-খতিয়ান বদলানো, যত বেশি জমিতে নীলের দাগ দেওয়া হয়েচে বিভিন্ন গ্রামে, তার চেয়ে অনেক কম দেখানো। জরিপের আসল খতিয়ান দৃষ্টে নকল খতিয়ান তৈরী করার নির্দেশ দিলে ডেভিড সাহেব।
রাজারাম বললেন–সায়েব, একটা দরকারী জিনিসের কি হবে?
ডেভিড–কি জিনিস?
–প্রজাদের বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ? তার কি হবে? দাগ খতিয়ানে আমাদের সুবিধের জন্যে আঙ্গুলের ছাপ নিতি হয়েছিল। এখন তারা নকল খাতায় দেবে কেন? যে সব বদমাইশ প্রজা! নবু গাজির মামলায় রাহাতুনপুরসুদ্ধ আমাদের বিপক্ষে। রামু সর্দারের খুনের মামলায় বাঁধালের প্রজা সব চটা। কি করতি হবে বলুন।
–বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ জাল করতি হবে।
–সে বড় গোলমেলে ব্যাপার হবে সায়েব। ভেবে কাজ করা ভালো।
–তুমি ভয় পেলি চলবে কেন দেওয়ান? ডঙ্কিনসনের কথা মনে– নেই? এক খানা আর দুপেগ হুইস্কি।
–এক খানা নয় সায়েব, অনেক খানা। আপনি ভেবে দেখুন। ফাঁসিতলার মাঠের সে ব্যাপার আপনার মনে আছে তো? আমরাই গিরিধারী জেলেকে ফাঁসি দিয়েচিলাম। তখনকার দিনে আর এখনকার দিনে তফাৎ অনেক। শ্রীরাম বেয়ারাকে এখন সড়কি নিয়ে রাত্রে পথ চলতি হয় সায়েব। আজই শোনলাম ওর মুখি।
ভোর পর্যন্ত কুঠির দপ্তরখানায় মোমবাতি জ্বেলে কাজ চললো। সবাই অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েচে ভোরবেলার দিকে। ডেভিড সাহেবও বিশ্রাম নেয় নি বা কাজে ফাঁকি দেয় নি। সূর্য উঠবার আগেই বড়সাহেব এসে হাজির হল। দুই সাহেবে কি কথাবার্তা হল, বড়সাহেব রাজারামকে বললেন–মার্কা। খতিয়ান বদল হইল?
–আজ্ঞে হাঁ।
–সব ঠিক আছে?
–এখনো তিন দিনির কাজ বাকি সায়েব। টিপসইয়ের কি করা যাবে সায়েব? অত টিপসই কোথায় পাওয়া যাবে দাগ খতিয়ানে আপনিই বলুন।
–করিটে হইবে।
–কি করে করা যাবে আমার বুদ্ধিতে কুলুচ্চে না। শেষ কালডা কি জেল খেটি মরবো? টিপসই জাল করবো কি করে?
–সব জাল হইল টো উহা জাল হইবে না কেন? মাথা খাটাইতে হইবে। পয়সা খরচ করিলে সব হইয়া যাইবে। মন দিয়া কাজ করো। টোমার ও প্রসন্ন আমিনের দুটাকা করিয়া মাহিনা বাড়িল এ মাস হইটে।
মাথা নিচু করে দুই হাত জুড়ে নমস্কার করে বললেন রাজারাম আপনার খেয়েই তো মানুষ, সাহেব। রাখতিও আপনি, মারতিও আপনি।
কি একটা ইংরিজি কথা বলে বড়সাহেব চলে গেল ঘর থেকে বেরিয়ে।
দুপুর বেলা।
প্রসন্ন আমিন কাজ অনেকখানি এগিয়ে এনেচে। গিরিশ মুহুরী, গদাধর মুহুরীকে নিচু সুরে বললে–খাওয়াদাওয়ার কি ব্যবস্থা, ও গদাধর?
