জগদম্বা তাঁর সামনে একটু শনিপুজোর সিন্নি আর একবাটি মুড়কি এনে দিলেন। খেয়ে একঘটি জল ও একটি পান খেয়ে তিনি বললেন– আজ কুঠিতে কি ব্যাপার হয়েচে জানো?
জগদম্বা বললেন–বেলের শরবত খাবা?
–আঃ, আগে শোনো কি বলচি। বেলের শরবত এখন রাখো।
–কি গা? কি হয়েচে?
–বড়সায়েব ছোটসায়েবকে খুব বকেচে।
-কেন?
–রামকানাই কবিরাজকে আমরা একটু কচা-পড়া পড়িয়েছিলাম। ওর দুষ্টুমি ভাঙ্গতি আর আমারে শেখাতি হবে না। নীলকুঠির মুখ ছোট করে দিয়েছে ওই ব্যাটা সেই রামু সর্দারের খুনের মামলায়। জেলার ম্যাজিস্টার ডঙ্কিনসন সায়েব যাই বড়সায়েবকে খুব মানে, তাই এযাত্রা আমার রক্ষে। নইলে আমার জেল হয়ে যেতো। ও বাঞ্চৎকে এমন কচা-পড়া দিইছিলাম যে আর ওঁকে এ দেশে অন্ন করি খেতি হতো না। তা নাকি বড়সায়েব বলেচে, অমন কোরো না। নীলকুঠির। জোরজুলুমের কথা সরকার বাহাদুরের কানে উঠেছে। কলকাতায় কে আছে হরিশ মুখুয্যে, ওরা বড় লেখালেখি করচে খবরের কাগজে। খুব গোলমালের সৃষ্টি হয়েচে। এখন অমন করলি নীলকর সায়েবদের ক্ষেতি হবে। আমারে ডেকি ছোটসায়েব বললে–গয়ামেম এইসব কানে তুলেছে বড়সায়েবের। বিটি আসল শয়তান!
–কেন, গয়ামেম তোমাকে তো খুব মানে?
–বাদ দ্যাও। যার চরিত্তির নেই, তার কিছুই নেই। ওর আবার মানামানি। কিছু যে বলবার জো নেই, নইলে রাজারাম রায়কে আর শেখাতি হবে না কাকে কি করে জব্দ করতি হয়।
–তোমাকে কি ছোটসায়েব বকেচে নাকি?
–আমারে কি বকবে? আমি না হলি নীলির চাষ বন্ধ। কুঠিতি হওয়া খেলবে–ভোঁ ভাঁ। আমি আর প্রসন্ন চক্কত্তি আমিন না থাকলি এক কাঠা জমিতেও নীলির দাগ মারতি হবে না কারো! নবু গাজিকে কে সোজা করেছিল? রাহাতুনপুরির প্রজাদের কে জব্দ করেছিল? ছোটসায়েব বড়সায়েব কোনো সায়েবেরই কর্ম নয় তা বলে দেলাম তোমারে। আজ যদি এই রাজারাম রায় চোখ বোজে–তবে কালই
জগদম্বা অপ্রসন্ন সুরে বললেন–ও আবার কি কথা? শনিবারের সন্ধেবেলা? দুর্গা দুর্গা–রাম রাম। অমন কথা বলবার নয়।
–তিলুরা এসেছিল কেউ?
–নিলু খোকাকে নিয়ে এসেছিল। খোকা আমাকে গাল টিপে টিপে কত আদর করলে। আহা, ওই চাঁদটুকু হয়েচে, বেঁচে থাক। ওদের সবারি সাধ-আহ্লাদের সামগ্রী। একটু ছানা খেতি দেলাম। বেশ খেলে টুকটুক করে।
–ছানা খেতি দিও না, পেট কামড়াবে।
কথা শেষ হবার আগেই তিলু খোকাকে নিয়ে এসে হাজির। খোকা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। ওর বাবার বুদ্ধি পেয়েচে। রাজারামকে দুহাত নেড়ে বললে–বড়দা–
রাজারাম খোকাকে কোলে নিয়ে বললেন–বড়দা কি মণি, মামা। হই যে?
খোকা আবার বললে–বড়দা।
তার মা বললে–ঐ যে তোমাকে আমি বড়দা বলি কিনা? ও শুনে শুনে ঠিক করেচে এই লোকটাকে বড়দা বলে।
খোকা বলে–বড়দা।
রাজারাম খোকার মুখে চুমু খেয়ে বললেন–তোমার মারও বড়দা। হলাম, আবার তোমারও বড়দা বাবা? ভবানী কি করচে?
তিলু বললে–উনি আর চন্দর মামা বসে গল্প করচেন, আমি কাঁটাল ভেঙ্গে দিয়ে এলাম খাবার জন্য। নিতে এসেছিলাম একটা ঝুনো নারকোল। ওঁরা মুড়ি খেতে চাইলেন ঝুনো নারকোল দিয়ে
নিয়ে যা তোর বৌদিদির কাছ থেকি। একটা ছাড়া দুটো নিয়ে যা–
এই সময়ে জগদম্বা জানালার কাছে গিয়ে বললেন–ওগো, তোমারে কে বাইরে ডাকচে–
–কেডা?
–তা কি জানি। গোপাল মাইন্দার বলচে।
রাজারাম খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন বাইরে যে এসেছিল তাকে দেখে। সে হল বড়সায়েবের আরদালি শ্রীরাম মুচি। এমন কি গুরুতর দরকার পড়েচে যে এতরাত্রে সায়েব আরদালি পাঠিয়েছে!
–কি রে রেমো?
–কর্তামশায়, দুসায়েব একজায়গায় বসে আছে বড় বাংলায়। মদ খাচ্চে। কি একটা জরুরি খবর আছে। আমারে বললে–ঘোড়ায় চড়ে। আসতি বলিস। এখুনি যেন আসে।
–কেন জানিস?
–তা মুই বলতি পারবো না কর্তামশায়। কোনো গোলমেলে ব্যাপার হবে। নইলে এত রাত্তিরি ডাকবে কেন? মোর সঙ্গে চলুন। মুই সড়কি এনিচি সঙ্গে করে। মোদের শত্রুর চারিদিকে। রাত-বেরাত একা আঁধারে বেরোবেন না।
রাজারাম হাসলেন। শ্রীরাম মুচি তাকে আজ কর্তব্য শেখাচ্চে। ঘোড়ায় চড়ে তিনি একটা হাঁক মারলে দুখানা গাঁয়ের লোক থরহরি কাঁপে। তাঁকে কে না জানে এই দশ-বিশখানা মৌজার মধ্যে।
আধঘণ্টার মধ্যে রাজারাম এসে সেলাম ঠকে সাহেবদের সামনে। দাঁড়ালেন। সাহেবদের সামনে ছোট টেবিলে মদের বোতল ও গ্লাস। বড়সাহেব রুপোর আলবোলাতে তামাক টানচে–তামাকের মিঠেকড়া মৃদু সুবাস ঘরময়। ছোটসাহেব তামাক খায় না, তবে পান দোক্তা খায় মাঝে মাঝে, তাও বড়সাহেব বা তার মেমকে লুকিয়ে। বড়সাহেব ছোটসাহেবের দিকে তাকিয়ে কি বললে ইংরেজিতে। ছোটসাহেব রাজারামের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে–দেওয়ান ভারি বিপদের মধ্যি পড়ে গেলাম যে! (সেটা রাজারাম অনেক পূর্বেই অনুমান করেছেন)।
–কি সায়েব?
-কলকাতা থেকে এখন খবর এল, নীল চাষের জন্যি লোক নারাজ হচ্চে। গবর্নমেন্ট তাদের সাহায্য করচে। কলকাতায় বড় বড় লোকে খবরের কাগজে হৈচৈ বাধিয়েছে। এখন কি করা যায় বলো। শুলকো, শুভরত্নপুর, উলুসি, সাতবেড়ে, নহাটা এই গাঁয়ে কত জমি নীলির দাগ মারা বলতি পারবা?
রাজারাম মনে মনে হিসাব করে বললেন–আন্দাজ সাতশো সাড়ে সাতশো বিঘে।
এই সময় বড়সাহেব বললে–কট জমিটে ড্রাগ আছে?
