রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–তুমি আর চন্দ্র ভায়া তো নিশ্চয় যাচ্ছ?
–একেবারে নিশ্চয়।
–আর কে কে যাবে ঈশ্বর?
ঈশ্বর বোষ্টম বললে–জেলে পাড়ার মধ্যি যাবে ভগীরথ জেলের বড়বৌ, পাগলা জেলের মা, আমাদের পাড়ার নরহরির বৌ, ব্রাহ্মণপাড়ায়। আপনারা দুজন–হ্যাঁমিদপুর থেকে সাতজন–সব আমাদের খদ্দের। পুন্নিমের পরের দিন রওনা হওয়া যাবে। আমাকে আবার বর্ধমানে বীরচাঁদ বৈরিগী আর কুমুদিনী জেলের দলের সঙ্গে মিশতে হবে কার্তিক পুজোর দিন। রানীগঞ্জে এক সরাই আছে, সেখানে দুদিন থেকে জিরিয়ে নিয়ে তবে আবার রওনা। রানীগঞ্জের সরাইতে দুতিন দল আমাদের সঙ্গে মিলবে। সব বলা-কওয়া থাকে।
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–আমি বড় ছেলেডারে বলে দেখি, সে আবার কি বলে। আমার আর সে জুত নেই ভায়া। ভবানীর মুখে শুনে বড় ইচ্ছে করে ছুটে চলে যাই সে সন্নিসি ঠাকুরের আশ্রমে। ওই সব ফুল ফোঁটা, আমলকী গাছে আমলকী ফল, ময়ুর চরচে–বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে। কখনো কিছু দ্যাখলাম না বাবাজি জীবনে।
ঈশ্বর বোষ্টম বললে–যাবেন মুখুয্যে মশায়। আমার জানাশুনা আছে সব জায়গায়, কিছু কম করে নেবে পাণ্ডারা।
চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–তাই চলো ভায়া। আমরা পাঁচজন আছি, এক রকম করে হয়ে যাবে, আটকাবে না।
.
ধার্মিক নালু পালের তীর্থযাত্রীসেবার দিন চন্দ্র চাটুয্যের বাড়িতে খাঁটি তীর্থযাত্রী ছাড়া আরো লোক দেখা গেল যারা তীর্থযাত্রী নয়– যেমন ভবানী বাঁড়ুয্যে, দেওয়ান রাজারাম ও নীলমণি সমাদ্দার। শেষের লোকটি ব্রাহ্মণও নয়। খোকাকে নিয়ে তিলু এসেছিল ভোজে সাহায্য করতে। ভবানী নিজের হাতে পাতা কেটে এনে ধুয়ে ভেতরের বাড়ির রোয়াকে পাতা পেতে দিলেন, তিলু সাত-আট কাঠা সরু বেনামুড়ি ধানের চিড়ে ধুয়ে একটা বড় গামলায় রেখে দিয়ে মুড়কি বাছতে বসলো। পৃথক একটা বারকোশে মঠ ও ফেনিবাতাসা পাকার করা রয়েচে, পাঁচ-ছ পাতলে-হাঁড়িতে দুই বারকোশের পাশে বসানো। রূপচাঁদ মুখুয্যে একগাল হেসে বললেন–নাঃ, নালু পাল যোগাড় করেচে ভালো-মনটা ভালো ছোকরার
তিলু এ গ্রামের মেয়ে। ব্রাহ্মণেরা খেতে বসলে সে চিড়ে মুড়কি মঠ যার যা লাগে পরিবেশন করতে লাগলো।
চন্দ্র চাটুয্যে নিজে খেতে বসেন নি, কারণ তাঁর বাড়িতে খাওয়াদাওয়া হচ্ছে, তিনি গৃহস্বামী, সবার পরে খাবেন। আর খান নি ভবানী বাঁড়ুয্যে। স্বামী-স্ত্রীতে মিলে এমন সুন্দরভাবে ওরা পরিবেশন করলে যে সকলেই সমানভাবে সব জিনিস খেতে পেলে–নয়তো এসব ক্ষেত্রে পাড়াগাঁয়ে সাধারণত যার বাড়ি তার নিভৃত কোণের হাঁড়িকলসির মধ্যে অর্ধেক ভালো জিনিস গিয়ে ঢোকে সকলের অলক্ষিতে।
ফণি চক্কত্তি বললেন–বেশ মঠ করেচে কড়াপাকের। কেষ্ট ময়রা কারিগর ভালো–ওহে ভবানী, আর দুখানা মঠ এ পাতে দিও
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–তবে ওই সঙ্গে আমাকেও একখানা
তিলু হেসে বললে–লজ্জা করচেন কেন কাকা–আপনাকে কখানা দেবো বলুন না? দুখানা না তিনখানা?
–না মা, দুখানা দাও। বেশ খেতে হয়েচে–এর কাছে আর খাঁড় গুড় লাগে?
–আর একখানা?
–না মা, না মা–আঃ-আচ্ছা দাও না হয় ছাড়বে না যখন তুমি!
রূপচাঁদ মুখুয্যে দেখলেন তিলুর সুগৌর সুপুষ্ট বাউটি ঘুরানো হাতখানি তাঁর পাতে আরো দুখানা কড়াপাকের কাঁচা সোনার রঙের মঠ ফেলে দিলে। অনেক দিন গরিব রূপচাঁদ মুখুয্যে এমন চমৎকার ফলার করেন নি, এমন মঠ দিয়ে মেখে।
.
এই মঠের কথা মনে ছিল রূপচাঁদ মুখুয্যের, গয়া যাবার পথে গ্যাং ট্যাং রোডের ওপর বারকাট্টা নামক অরণ্য-পর্বত-সঙ্কুল জায়গায় বড় বিপদের মধ্যে পড়ে একটা গাছের তলায় ওদের ছোট্ট দলটি আশ্রয় নিয়েছিল অন্ধকার রাত্রে–ডাকাতেরা তাঁদের চারিধার থেকে ঘিরে ফেলে সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিল, ভাগ্যে তাঁদের বড় দলটি আগে চলে গিয়ে এক সরকারি চটিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল তাই রক্ষে, দলের টাকাকড়ি সব ছিল সেই বড় দলের কাছে। কেন যে সে রাত্রে অন্ধকার মাঠের আর বনপাহাড়ের নির্জন, ভীষণ রূপের দিকে চেয়ে নিরীহ রূপচাঁদ মুখুয্যের মনে হঠাৎ তিলুর বাউটি-ঘোরানো হাতে মঠ পরিবেশনের ছবিটা মনে এসেছিল–তা তিনি কি করে বলবেন?
তবুও সেরাত্রে রূপচাঁদ মুখুয্যে একটা নতুন জীবন-রসের সন্ধান। পেয়েছিলেন যেন। এতদিন পরে তাঁর ক্ষুদ্র গ্রাম থেকে বহুদূরে, তাঁর গত পঞ্চাশ বৎসরের জীবন থেকে বহুদূরে এসে জীবনটাকে যেন নতুন করে তিনি চিনতে পারলেন।
স্ত্রী নেই–আজ বিশ বৎসরের ওপর মারা গিয়েচে। সেও যেন স্বপ্ন, এতদূর থেকে সব যেন স্বপ্ন বলে মনে হয়। ইছামতীর ধারের তাঁর সেই ক্ষুদ্র গ্রামটিতে এখনি নিবারণ গয়লার বেগুনের ক্ষেতে হয়তো তাঁর ছাগলটা ঢুকে পড়েছে, ওরা তাড়াহুড়ো করচে লাঠি নিয়ে, তাঁর বড় ছেলে যতীন হয়তো আজ বাড়ি এসেছে, পুবের এড়ো ঘরে বৌমা ও দুই মেয়েকে নিয়ে শুয়ে আছে–বেচারি খোকা! মাত্র পাঁচ টাকা মাইনেতে সাতক্ষীরের নবাবুদের তরফে কাজ করে, দুতিন মাস অন্তর একবার বাড়ি আসতে পারে, ছেলেমেয়েগুলোর জন্যে মনটা কেমন করলেও চোখের দেখা দেখতে পায় না। গরিবের অদৃষ্টে এ রকমই হয়।
বড় ভালো ছেলে তাঁর।
যখন কথাবার্তা সব ঠিকঠাক হল গয়া-কাশী আসবার, তখন বড় খোকা এসে দাঁড়িয়ে বললে–বাবা, তোমার কাছে টাকাকড়ি আছে?
