–আছে কিছু।
–কত?
–তা–ত্রিশ টাকা হবে। ছোবায় পুঁতে রেখে দিয়েচিলাম সময়ে অসময়ের জন্যি। ওতেই হবে খুনু।
–বাবা শোনো–ওতে হবে না–আমি তোমায়
–হবে রে হবে। আর দিতি হবে না তোরে।
জোর করে পনেরোটি টাকা বড় খোকা দিয়েচিল তাঁর উড়নির মুড়োতে বেঁধে। চোখে জল আসে সে কথা ভাবলে। কি সুন্দর তারাভরা আকাশ, কি চমৎকার চওড়া মুক্ত মাঠটা, একসারি ভূতের মতো অন্ধকার গাছগুলো…চোখে জল আসে খোকার সেই মুখ মনে হলে…
মন কেমন করে ওঠে গরিব ছেলেটার জন্যে, একখানা ফরাসডাঙার ধুতি কখনো পরাতে পারেন নি ওকে…সামান্য জমানবিশের কাজে কিই বা উপার্জন। বায়ুভূত নিরালম্ব কোন ভাসমান আত্মার মতো তিনি বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন অন্ধকার জগতের পথে পথে–কোথায় রলি খোকা, কোথায় রলি নাতনি দুটি।
.
জ্যৈষ্ঠ মাসে আবার চন্দ্র চাটুয্যের চণ্ডীমণ্ডপে নালু পালের ব্রাহ্মণভোজন। হচ্চে। যারা তীর্থ থেকে ফিরেচে, সেইসব মহাভাগ্যবান লোকের আজ আবার নালু পাল ফলার করাবে।
জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুর।
নালু পাল গলায় কাপড় দিয়ে হাত জোড় করে দূরে দাঁড়িয়ে সব তদারক করচে। আম কাঁঠাল জড়ো করা হয়েচে ব্রাহ্মণভোজনের জন্যে।
সকলেই এসেচেন, ফণি চক্কত্তি, চন্দ্র চাটুয্যে, ঈশ্বর বোষ্টম, নীলমণি সমাদ্দার–নেই কেবল রূপচাঁদ মুখুয্যে। তিনি কাশীর পথে দেহ রেখেছেন, সে খবর ওঁরা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন কিন্তু যতীন সে চিঠি পায় নি।
নীলমণি সমাদ্দারের কাছে চন্দ্র চাটুয্যে তীর্থভ্রমণের গল্প করছিলেন, গ্যাং ট্যাং রোডের এক জায়গায় কি ভাবে ডাকাতের হাতে পড়েছিলেন, গয়ালি পাণ্ডা কি অদ্ভুত উপায়ে তাদের খাতা থেকে তাঁর পিতামহ বিষ্ণুরাম চাটুয্যের নাম উদ্ধার করে তাঁকে শোনালে।
নীলমণি সমাদ্দার বললেন–রূপচাঁদ কাকার কথা ভাবলি বড় কষ্ট হয়। পুণ্যি ছিল খুব, কাশীর পথে মারা গেলেন। কি হয়েছিল?
চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–আমরা কিছু ধরতে পারি নি ভায়া। বিকারের ঘোরে কেবলই বলতো–খোকা কোথায়? আমার খোকা কোথায়? খোকা, আমি তামাক খাবো–আহা, সেদিন যতীন শুনে কেঁদে উঠলো।
নীলমণি বললেন–যতীন বড় পিতৃভক্ত ছেলে।
–উভয়ে উভয়কে ভাল না বাসলি ভক্তি আপনি আসে না ভায়া। রূপচাঁদ কাকাও ছেলে বলতি অজ্ঞান। চিরডা কাল দেখে এসেছি।
নালু পাল খুব আয়োজন করেছিল, চিড়ে যেমন সরু, জ্যৈষ্ঠ মাসে ভালো আম-কাঁঠালও তেমনি প্রচুর।
ফণি চক্কত্তি ঘন আওটানো দুধের সঙ্গে মুড়কি আর আম-কাঁঠালের রস মাখতে মাখতে বললেন–চন্দরদা, সেই আর এই! ভাবি নি যে আবার ফিরে আসবো। কুমুদিনী জেলের দলের সেই সাতকড়ি আমাদের আগেই বলেছিল, বর্ধমান পার হবেন তো ডাকাতির দল পেছনে লাগবে। ঠিক হোলো কি তাই!
–আমার কেবল মনে হচ্ছে সেই পাহাড়ের তলাডা-ঝরনা বয়ে যাচ্চে, বড় বড় কি গাছের ছায়া রূপচাঁদ কাকা যেখানে দেহ রাখলেন। অমনি জায়গা বুড়ো ভালবাসতো। আমাকে কেবল বলে–এ যেন সেই বাল্মীকি মুনির আশ্রম
নালু পাল হাত জোড় করে বললে–আমার বড় ভাগ্যি, আপনারা সেবা করলেন গরিবের দুটো ক্ষুদ। আশীৰ্বাদ করবেন, ছেলেডা হয়েচে যেন বেঁচে থাকে, বংশডা বজায় থাকে।
.
ভবানী বাঁড়ুয্যে ফিরে এলে বিলু বললে আপনার সোহাগের ইস্ত্রী। কোথায়? এখনো ফিরলেন না যে? খোকা কেঁদে কেঁদে এইমাত্তর। ঘুমিয়ে পড়লো।
–তার এখনো খাওয়া হয় নি। এই তো সবে ব্রাহ্মণভোজন শেষ হোলো!
নিলু শুয়ে ছিল বোধ হয় ঘরের মধ্যে, অপরাহুবেলা, স্বামীর গলার স্বর শুনে ধড়মড় করে ঘুমের থেকে উঠে ছুটে বাইরে এসে বললে– এসো এসো নাগর, কতক্ষণ দেখি নি যে! বলি কি দিয়ে ফলার। করলে? কি দিয়ে ফলার করলে?
ভবানী মুখ গম্ভীর করে বললেন–বয়েসে যত বুড়ো হচ্চো, ততই অশ্লীল বাক্যগুলো যেন মুখের আগায় খই ফুটচে। কই, তোমার দিদি তো কখনো
বিলু বললেন না, দিদির যে সাতখুন মাপ! দিদি কখনো খারাপ কিছু করতে পারে? দিদি যে স্বগের অপ্সরী। বলি সে আমাদের দেখার দরকার নেই, আমদের খাবার কই? চিড়ে-মুড়কি? আমরা হচ্চি ডোম-ডোকলা; ছেচলায় বসে চিড়ে-মুড়কি খাবো, হাত তুলি বলতি বলতি বাড়ি যাবো। সত্যি না কি?
নিল মুখ টিপে টিপে হাসছিল। এবার সামনে এসে বললে থাক গো, নাগরের মুখ শুকিয়ে গিয়েচে, আর বলো না দিদি। আমারই যেন কষ্ট হচ্চে। উনি আবার যা তা কথা শুনতি পারেন না। বলেন–কি একটা সংস্কৃতো কথা, আমার মুখ দিয়ে কি আর বেরোয় দিদি?
ভবানী বাঁড়ুয্যের বাড়িতে একখানা মাত্র চারচালা ঘর, আর উত্তরের পোতায় একখানা ছোট দুচালা ঘর। ছোট ঘরটাতে ভবানী বাঁড়ুয্যে নিজে থাকেন এবং অবসর সময়ে শাস্ত্রপাঠ করেন বসে। তিলু এই ঘরেই থাকে তাঁর সঙ্গে, বিলু আর নিলু থাকে বড় চারচালা ঘরটাতে। খোকা ছোট ঘরে তার মার সঙ্গে থাকে অবিশ্যি। নিলু হঠাৎ ভবানী বড়য্যের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বড় ঘরটাতে। খোকা সেখানে। শুয়ে ঘুমুচ্চে। ভবানী দেখলেন খোকা চিৎ হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে, টানা টানা চোখ দুটি নিদ্রিত নারায়ণের মতো নিমীলিত। ভবানী। বাঁড়ুয্যে শিশুকে ওঠাতে গেলে নিলু বলে উঠলো–ফুন্টকে উঠিও না বলে দিচ্চি। এমন কাঁদবে তখন, সামলাবে কেডা?
ভবানী তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় উঠিয়ে বসালেন, খোকা চোখ বুজিয়েই চুপ করে বসে রইল, নড়লেও না চড়লেও না–কি সুন্দর দেখাচ্ছিল। ওকে! কি নিষ্পাপ মুখখানা! সমগ্র জগৎ রহস্য যেন এই শিশুর পেছনে। অসীম প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে। মহলোক থেকে নিম্নতম ভূমি পর্যন্ত ওর পাদস্পর্শের ও খেয়ালী লীলার জন্যে উৎসুক হয়ে আছে, তারায়। তারায় সে আশা-নিরাশার বাণী জ্যোতির অক্ষরে লেখা হয়ে গেল।
