দীনু ভটচাজ বললেন–না পালালি, মঘা এড়াবি কঘা–অমন সম্মা সব করতি পারে। বাবাঃ, শুনেও গা কেমন করে!
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–তারপর?
–তারপর আর কি। আমি সেখানে দুমাস ছিলাম। এই দুমাসের প্রত্যেক দিন দুটি বেলা অম্বিকা-মন্দিরের ধর্মশালায় আমার জন্যে খাবার পাঠাতেন। কত জ্ঞানের কথা বলতেন, দুঃখু করতেন যে রাজার ছেলে না হয়ে গরিবের ঘরে জন্মালে শান্তি পেতেন। আমার সঙ্গে বেদান্ত আলোচনা করতেন। তাঁর স্ত্রীকেও আমি দেখেচি, অম্বিকামন্দিরে পুজো দিতে আসতেন, রাজপুত মেয়ে, খুব লম্বা আর জোয়ান চেহারা, নাকে মস্ত বড় ফাঁদি নথ। একদিন দেখি ফর্সি টেনে তামাক খাচ্ছেন–
রূপচাঁদ মুখুয্যে অবাক হয়ে বললেন–মেয়েমানুষে?
–ওদেশে খায়, রেওয়াজ আছে। বড় সুন্দর চেহারা, যেন জোরালো দুর্গাপ্রতিমা, অসুর মারলেই হয়। আমি ভাবতাম, না-জানি এর সেই সৎশাশুড়িটি কেমন, যিনি এঁকেও জব্দ করে রেখেছেন। মাস দুই পরে আমি ওখান থেকে বিচুর চলে এলাম, কানপুরের কাছে। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈকে একদিন দেখেছিলাম অম্বিকা পুজো করতে। তারপর শুনেছিলাম ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ঝাঁসির রানী মারা পড়েচেন-পরমা সুন্দরী ছিলেন–তবে ও দেশের মেয়ে, জোয়ান চেহারা–
–বল কি বাবাজি, এ যে সব অদ্ভুত কথা শোনালে? মেয়েমানুষে যুদ্ধ করলে কোম্পানির সঙ্গে, ওসব কথা কখনো শুনি নি–কোন্ দেশের কথা এ সব?
–শুনবেন কি মামা, গাঁ ছেড়ে কখনো কোথাও বেরুলেন না তো। কিছু দেখলেনও না। এবার যদি যান।
এই সময় নালু পাল আবার ব্যস্ত হয়ে এসে ঢুকল। সে বাড়ি চলে যাবে, হাটবার, তার অনেক কাজ বাকি। দিনটা ধার্য করে দিলে সে চলে যেতে পারে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–সামনের পূর্ণিমার রাত্রে দিন ধার্য রইল। কি বলেন মামা? সেদিন কারো অসুবিধে হবে?
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–আমার বাতের ব্যামো। পুন্নিমেতে আমি লক্ষ্মীর দিব্যি খাবো না, তাতে কোনো ক্ষতি নেই, ফল, দুধ, মঠ, এসব খাবো। ওই দিনই রইল ধার্য।
ঈশ্বর বোষ্টম এতক্ষণ চুপ করে ভবানীর গল্প শুনছিল, কোনো কথা বলে নি। এইবার সে বলে উঠলো–আপনারা যে কোথাকার রানীর কথা বললেন, লড়াই করলেন কাদের সঙ্গে। ও কথা শুনে আমার কেবলই মনে পড়ছে কুমুদিনী জেলের কথা
দীনু ভটচাজ বললেন–বোসো! কিসি আর কিসি! কোথায় সেই কোথাকার রানী লক্ষ্মীবাঈ, আর কোথায় কুমুদিনী জেলে! কেডা সে?
ঈশ্বর বোষ্টম একেবারে উত্তেজনার মুখে উঠে দাঁড়িয়েছে। দুহাত নেড়ে বললে–আজ্ঞে ও কথা বলবেন না, খুড়ো ঠাকুর। আপনি সেথো কুমুদিনী জেলেকে জানেন না, দ্যাখেন নি, তাই বলছেন। তারে যদি দ্যাখতেন, তবে আপনারে বলতি হতো, হ্যাঁ, এ একখানা মেয়েছেলে বটে! এই দশাসই চেহারা, দেখতিও দশভুজো পিরতিমের মতো। তেমনি সাহস আর বুদ্ধি। একবার আমাদের মধ্যি দুজনের ভেদবমির ব্যারাম হোলো গয়া যাবার পথে, নিজের হাতে তাদের কি সেবাটা করতি দ্যাখলাম! মায়ের মতো। একবার গয়ালি পাণ্ডার সঙ্গে কোমর বেঁধে ঝগড়া করলেন, যাত্রীদের ট্যাকা মোচড় দিয়ে আদায় করা নিয়ে। সে কি চেহারা? বললে, তুমি জানো আমার নাম কুমুদিনী, আমি ফি বচ্ছর দুশো যাত্রী গয়ায় নিয়ে আসি। গোলমাল করবা তো এইসব যাত্রী আমি অন্য গয়ালি পাণ্ডার কাছে নিয়ে যাবো। পাণ্ডা ভয়ে চুপ। আর কথাটি নেই। সেখোদের মান না রাখলি যাত্রী হাতছাড়া হয়– বোঝলেন না? অমন মেয়েমানুষ আমি দেখি নি। কেউ কাছে ঘেঁষে একটা ফষ্টিনষ্টি করুক দেখি? বাব্বাঃ, কারু সাধ্যি আছে? নিজের মান রাখতি কি করে হয় তা সে জানে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–একবার নিয়ে এসো না এখানে। দেখি।
ভবানীর কথায় সবাই সায় দিয়ে বললেন–হ্যাঁ হ্যাঁ, আনো না। তোমার তো জানাশুনো। আমরা দেখি একবার
ঈশ্বর বোষ্টম চুপ করে রইল। দীনু ভটচাজ বললেন–কি? পারবে?
–মাপ করবেন মামা। ওখানে আপনাদের মান আমি রাখতে পারবো। ভগবানের নাম করলে সব সমান, বুনো আর ব্রাহ্মণ কি মামা?
ঈশ্বর বোষ্টম–আজ্ঞে, তাঁর মান বেশি। সেথোদের তিনি মোড়ল। আমার কথায় তিনি এখানে আসবেন না। বাড়িও অনেক দূর, সেই হুগলী জেলায়। গাঁ জানি নে, আমরা সব একেস্তার হই ফি কার্তিক মাসে বর্ধমান শহরে কেবল চক্কত্তির সরাইয়ে। আপনারা যদি তীথি যান, তবে তো তেনার সঙ্গে দেখা হবেই। চললাম এখন তাহলি।
ভবানী বাড়ুঁয্যে বললেন—এখাণে জঙ্গলের মধ্যে এক যে সেই সন্নিসিনী আছে, খেপী বলে ডাকে, আপনারা কেউ গিয়েচেন? গিয়ে দেখবেন, ভালো লাগবে আপনাদের।
ফণি চক্কত্তি বললেন–ও সব জায়গায় ব্রাহ্মণের গেলে মান থাকে। শুনিচি সে মাগী নাকি জাতে বুনো। তুমিও বাবাজি সেখানে আর যেও না।
–মাপ করবেন মামা। ওখানে আপনাদের মান আমি রাখতে পারবো। ভগবানের নাম করলে সব সমান, বুনো আর ব্রাহ্মণ কি মামা?
ফণি চক্কত্তি আশ্চর্য হয়ে বললেন–বুনো আর ব্রাহ্মণ সমান!
সবাই অবাক চোখে ভবানীর দিকে চেয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–ওই দুঃখেই তো রাজা না হয়ে ফকির হয়ে রইলাম বাবা।
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো তাঁর কথায়।
ফণি চক্কত্তি বললেন–দাদার আমার কেবল রগড় আর রগড়। তারপর আসল কথার ঠিকঠাক হোক। কে কে যাচ্চ, কবে যাচ। নালু পাল কবে খাওয়াবে ঠিক কর।
