সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন–বলো কি!
–হ্যাঁ। সে রাত্তির কি মুশকিল। কান্নাকাটি পড়ে গেল। সকালে কত খুঁজে তেনার রক্তমাখা কাপড় পাওয়া গেল মাটির মধ্যে। তাঁরে টাতি টানৃতি নিয়ে গিইছিল, তার দাগ পাওয়া গেল।
রূপচাঁদ বললেন–সর্বনাশ!
এমন সময় দেখা গেল নালু পাল এদিকে আসচে। নালু পালকে একটা খেজুর পাতার চাটাই দেওয়া গেল বসতে, কারণ সে আজকাল বড় দোকান করেচে, ব্যবসাতে উন্নতি করেছে, বিয়েথাওয়া করেচে সম্প্রতি। তার দোকান থেকে ধারে তেলনুন এদের মধ্যে অনেককেই আনতে হয়। তাকে খাতির না করে উপায় নেই।
দীনু বললেন–এসো নালু, বোসো, কি মনে করে?
নালু গড় হয়ে সবাইকে একসঙ্গে প্রণাম করে জোড়হাতে বললে– আমার একটা আবদার আছে, আপনাদের রাখতি হবে। আপনারা নাকি তীথি যাচ্ছেন শোনলাম। একদিন আমি ব্রাহ্মণতীন্থিযাত্রী ভোজন করাবো। আমার বড় সাধ। এখন আপনারা অনুমতি দিন, আমি জিনিস পাঠিয়ে দেবো চক্কত্তি মহাশয়ের বাড়ি। কি কি পাঠাবো হুকুম করেন।
চন্দ্র চাটুয্যে আর ফণি চক্কত্তি গাঁয়ের মাতব্বর। তাঁদের নির্দেশের ওপর আর কারো কথা বলার জো নেই এই গ্রামে–এক অবিশ্যি রাজারাম রায় ছাড়া। তাঁকে নীলকুঠির দেওয়ান বলে সবাই ভয় করলেও সামাজিক ব্যাপারে কর্তৃত্ব নেই। তিনিও কাউকে বড় একটা মেনে চলেন না, অনেক সময় যা খুশি করেন। সমাজপতিরা ভয়ে চুপ করে থাকেন।
চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–কি ফলার করাবে?
নালু হাতজোড় করে বললে,–আজ্ঞে, যা হুকুম।
-আধ মন সরু চিড়ে, দই, খাঁড়গুড়, ফেনিবাতাসা, কলা, আখ, মঠ আর–ফণি চক্কত্তি বললেন–মুড়কি।
–মঠ কত?
–আড়াই সের দিও। কেষ্ট ময়রা ভালো মঠ তৈরি করে, ওকে আমাদের নাম করে বোলো। শক্ত দেখে কড়াপাকের মঠ করে দিলে ফলারের সঙ্গে ভালো লাগবে।
চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–দক্ষিণে কত দেবে ঠিক কর।
–আপনারা কি বলেন?
–তুমি বল ফণি ভায়া। সবই তো আমি বললাম, এখন তুমি কিছু বলো।
ফণি চক্কত্তি বললেন–এক সিকি করে দিও আর কি।
নালু বললে–বড় বেশি হচ্চে কর্তা। মরে যাবো। বিশজন ব্রাহ্মণকে বিশ সিকি দিতি হলি–
মরবে না। আমাদের আশীর্বাদে তোমার ভালোই হবে। একটি ছেলেও হয়েচে না?
–আজ্ঞে সে আমার ছেলে নয়, আপনারই ছেলে।
চন্দ্র চাটুয্যে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে হাসলেন। নালু পাল শেষে একটি দুয়ানি দক্ষিণেতে রাজি করিয়ে বাইরে চলে গেল। বোধ হয়। তামাক খেতে।
এইবার চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–হ্যাঁ ভায়া, নালু কি বলে গেল?
–কি?
–তোমার স্বভাব-চরিত্তির এতদিন যাই থাক, আজকাল বুড়ো বয়েসে ভালো হয়েচে বলে ভাবতাম। নালুর বৌয়ের সঙ্গে ভাবসাব কতদিনের?
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। রাগে ফণি চক্কত্তি জোরে জোরে তামাক টানতে টানতে বললেন–ওই তো চন্দরদা, এখনো মনের সন্দ গেল না–
চন্দ্র চাটুয্যে কিছুক্ষণ পরে ভবানীকে বললেন–বাবা, নালু পালের ফলার কবে হবে তুমি দিন ঠিক করে দাও।
ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–নালু পালের ফলারের কথায় মনে পড়লো মামা একটা কথা। ঝাঁসির কাছে ভরসুৎ বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে অম্বিকা দেবীর মন্দিরে কার্তিক মাসে মেলা হয় খুব বড়। সেখানে আছি, ভিক্ষে করে খাই। কাছে এক রাজার ছেলে থাকেন, সাধুসন্নিসির বড় ভক্ত। আমাকে বললেন–কি করে খান? আমি বললাম, ভিক্ষে করি। তিনি সেদিন থেকে দুজনের উপযুক্ত ভাত, রুটি, তরকারি, দই, পায়েস, লাডডু পাঠিয়ে দিতেন। যখন খুব ভাব হয়ে গেল তখন একদিন তিনি তাঁর জীবনের কাহিনী বললেন আমার কাছে। জয়পুরের কাছে উরিয়ানা বলে রাজ্য আছে, তিনি তার বড় রাজকুমার। তাঁর বাপের আরো অনেক বিয়ে, অনেক ছেলেপিলে। মিতাক্ষরা মতে বড় ছেলেই রাজ্যের রাজা হবে বুড়ো রাজার পরে। তাই জেনে ছোটরানী সৎ ছেলেকে বিষ দেয় খাবারের সঙ্গে
দীনু ভটচাজ বলে উঠলেন–এ যে রামায়ণ বাবাজি!
-তাই। অর্থ আর যশ-মান বড় খারাপ জিনিস মামা। সেই জন্যেই ওসব ছেড়ে দিয়েচিলাম। তারপর শুনুন, এমন চক্রান্ত আরম্ভ হোল রাজবাড়িতে যে সেখানে থাকা আর চললো না। তিনি তাঁর স্ত্রীপুত্র নিয়ে। ভরসুৎ গ্রামে একটা ছোট বাড়িতে থাকেন, নিজের পরিচয় দিতেন না কাউকে। আমার কাছে বলতেন, রাজা হতে তিনি আর চান না। রাজরাজড়ার কাণ্ড দেখে তাঁর ঘেন্না হয়ে গিয়েচে রাজপদের ওপর।
ফণি চক্কত্তি বললেন–তখনো তিনি রাজা হন নি কেন?
-বুড়ো তখনো বেঁচে। তাঁর বয়েস প্রায় আশি। এই ছেলেই আমার সমবয়সী। আহা, অনেক দিন পরে আবার সেকথা মনে পড়লো। অম্বিকা দেবীর মন্দিরে পূর্বদিকের পাথর-বাঁধানো চাতালে বসে জ্যোৎস্নারাত্রে দুজনে বসে গল্প করতাম, সে-সব কি দিনই গিয়েচে! সামনে মস্ত বড় পুকুর, পুকুরের ওপারে রামজীর মন্দির। কি সুন্দর জায়গাটি ছিল। তাঁর ছোট সৎমা বিষ দিয়েচিল খাবারের সঙ্গে, কেবল এক বিশ্বস্ত চাকর জানতে পেরে তাঁকে খেতে বারণ করে। তিনি খাওয়ার ভান। করে বলেন যে তাঁর শরীর কেমন করছে, মাথা ঝিমঝিম করচে, এই বলে নিজের ঘরে শুয়ে পড়েন গিয়ে। ছোট সম্মা শুনে হেসেছিল, তাও তিনি শুনেছিলেন সেই বিশ্বস্ত চাকরের মুখে। সেই রাত্রেই তিনি রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে আসেন, কারণ শুনলেন ভীষণ ষড়যন্ত্র চলেচে ভেতরে ভেতরে। ছোটরানীর দল তাকে মারবেই। বুড়ো রাজা। অকর্মণ্য, ছোটরানীর হাতে খেলার পুতুল।
