ঈশ্বর গড় হয়ে প্রণাম করে বললে–আজ্ঞে তা যদিস্যাৎ জিজ্ঞেস। করলেন, তবে বলি, বর্ধমান ইস্তক বেশ যাবো। তারপর রাস্তা ধরে সোজা এজ্ঞে গয়া।
–বেশ। কি রাস্তা?
–এজ্ঞে ইংরেজি কথায় বলে গ্যাং ট্যাং রাস্তা। আমরা বলি অহিল্যেবাইয়ের রাস্তা।
-কতদিন ধরে সেথোগিরি করচো?
–তা বিশ বছর। একা তো যাই নে, সেথোর দল আছে, বর্ধমান থেকে যায়, চাকদহ থেকে, উলো থেকে যায়। এক আছে ধীরচাঁদ বৈরিগী, বাড়ি হুগলী। এক আছে কুমুদিনী জেলে, বাড়ি হাজরা পাড়া, ঐ হুগলী জেলা।
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–কুমদিনী জেলে, মেয়েমানুষ?
_এজ্ঞে হ্যাঁ। তিনি মেয়েমানুষ হলি কি হবে, কত পুরুষকে যে জব্দ রেচেন তা আর কি বলবো। রূপও তেমনি, জগদ্ধাত্রী পিরতিমে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–ও ঠিকই বলচে। বর্ধমান দিয়ে গিয়ে ওখানে শের শার বড় রাস্তা পাওয়া যায়। অহল্যাবাই-টাই বাজে, ওটা নবাব শের শার রাস্তা।
–কোথাকার নবাব?
–মুরশিদাবাদের নবাব। সিরাজদৌলার বাবা।
দীনু ভটচাজ বললেন–হাঁ বাবাজি, এখনো নাকি সায়েব কোম্পানি মুরশিদাবাদের নবাবকে খাজনা দেয়?
ভবানী বললেন–তা হবে। ওসব আমি তত খোঁজ রাখি নে। আজ দুজন সন্নিসির কথা বলবো আপনাদের, শুনে বড় খুশি হবেন।
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–তাই বলো বাবাজি। ওসব নবাব-টবাবের কথায় দরকার নেই। আমি তো কুয়োর মধ্যি যেমন ব্যাঙ আছে, তেমনি আছি পড়ে। পয়সা নেই যে বিদেশে যাবো। বাবাজি ভয়ও পাই। কোথাও চিনি নে, গাঁ থেকে বেরুলি সব বিদেশ-বিভুই। চাকদা পজ্জন্ত পিইচি গঙ্গাস্নানের মেলায়–আর ওদিকি গিইচি নদে-শান্তিপুর। ইছামতী দিয়ে নৌকা বেয়ে রাসের মেলায় নারকোল বিক্রি করতে গিইছিলাম বাবাজি। বেশ দুপয়সা লাভ করেছিলাম সেবার।
সবাই ভবানীকে ঘিরে বসলেন। দীনু ভটচাজ এগিয়ে এসে একেবারে সামনে বসলেন।
ভবানী বললেন–আপনারা জানেন কিছুদিন আগে আমার একজন গুরুভাই এসেছিলেন। ওঁর আশ্রম হোলো মীর্জাপুর।
দীনু ভটচাজ বলেন–সে কোথায় বাবাজি?
–পশ্চিমে, অনেকদ্দূর। সে আপনারা বুঝতে পারবেন না। চমৎকার পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে সেখানে এক সাধু থাকেন, আমাদের বাঙালি সাধু, তাঁর নাম হৃষিকেশ পরমহংস। ছোট একখানা ঝুপড়িতে দিনরাত কাটান। নির্জন বনে শিরীষ ফুল আর কাঞ্চন ফুল ফোটে, ময়ূর বেড়ায়। পাহাড়ি ঝরনার ধারে, আমলকী গাছে আমলকী পাকে–
রূপচাঁদ মুখুয্যে আবেগভরে বললেন–বাঃ বাঃ–আমরা কখনো দেখি নি এমন জায়গা
দীনু ভটচাজ বললেন–পাহাড় কাকে বলে তাই দ্যাখলাম না জীবনে বাবাজি, তায় আবার ঝরনা!
চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–পড়ে আছি গু-গোবরের গর্তে, আর দেখিচি কিছু, তুমিও যেমন! বয়েস পঁয়ষট্টির কাছে গিয়ে পৌঁছুলো। তুমি সেখানে গিয়েচ বাবাজি?
ভবানী বললেন–আমি পরমহংস মহারাজের কাছে ছমাস ছিলাম। তিনিই আমার গুরু। তবে মন্ত্র-দীক্ষা আমি নিই নি, তিনি মন্ত্র দ্যান না কাউকে।
–মহারাজ কোথাকার?
–তা নয়। এঁদের মহারাজ বলে ডাকা বিধি।
–ও। সেখানে জঙ্গলে খেতে কি?
–আমলকী, বেল, বুনো আম। আর এত আতার জঙ্গল পাহাড়ে। দুঝুড়ি দশঝুড়ি পাকা আতা জঙ্গলের মধ্যে গাছের তলায় রোজ শেয়ালে খেতো। সুমিষ্ট আতা। তেমন এখানে চক্ষেও দেখেন নি আপনারা।
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–তাই বলো বাবাজি, ঈশ্বর বোষ্টমকে সেই হদিসটা দ্যাও দিকি। খুব করে আতা খেয়ে আসি।
চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–আরে দূর কর আতা! ওই সব সাধু-সন্নিসির দর্শন পেলে তো ইহজন্ম সার্থক হয়ে গেল। বয়েস হয়েচে আর আতা খেলি কি হবে ভায়া? তারপর বাবাজি?
–তারপর সেখানে কাটালুম ছমাস। সেখান থেকে গেলাম বিষ্ঠুর। বাল্মীকি আশ্রমে।
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–বাল্মীকি মুনি? যিনি মহাভারত লিখেছিলেন?
দীনু ভটচাজ বললেন–তবে তুমি সব জানো! বাল্মীকি মুনি মহাভারত লিখতি যাবেন কেন? লিখেছিলেন রামায়ণ।
–ঠিক। তারপর সে আশ্রমেও এক সাধুর সঙ্গে কিছুদিন কাটালাম।
রূপচাঁদ বললেন–সেখানে যাবার হদিসটা দ্যাও বাবাজি।
–সে গৃহীলোকের দ্বারা হবে না। বিশেষ করে ঈশ্বর বোষ্টমের সঙ্গে গেলে হবে না। ও আর কতদূর আপনাদের নিয়ে যাবে? বর্ধমান গিয়ে বড় রাস্তা ধরে আপনারা চলে যান গয়া, সেখান থেকে কাশী। কাশী থেকে যাবেন প্রয়াগ।
মুনি ভরদ্বাজ বসহি প্রয়াগা
যিনহি রামপদ অতি অনুরাগ
প্রয়াগে সাবেক কালে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম ছিল। কুম্ভমেলার সময় সেখানে অনেক সাধু-সন্নিসি আসেন। আমি গত কুম্ভমেলার সময় ছিলাম। কিন্তু যাওয়া বড় কষ্ট। হেঁটে যেতে হবে আমাদের এতটা পথ। শের শা নবাবের রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে সরাইখানা আছে, সেখানে যাত্রীরা থাকে, বেঁধে বেড়ে খায়।
রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন–চালডাল?
–সব পাবেন সরাইতে। দোকান আছে। তবে দল বেঁধে যাওয়াই ভালো। পথে বিপদ আছে।
–কিসের বিপদ?
–সব রকম বিপদ। চোর ডাকাত আছে, ঠগী আছে। বর্ধমান ছাড়িয়ে গয়া পর্যন্ত সারা পথে দারুণ বন পাহাড়। বড় বড় বাঘ, ভালুক এ সব আছে।
–ও বাবা!
ঈশ্বর বোষ্টম বললে উনি ঠিকই বলেছেন। সেবার খাবরাপোতা। থেকে একজন যাত্রী গিয়েছিল গয়ায় যাবে বলে। ওদিকের এক জায়গায় সন্দেবেলা তিনি বললেন, হাতমুখ ধুতি যাবো। আমার কথা শোনলেন না। আমরা এক গাছতলায় চব্বিশজন আছি। তিনি মাঠের দিকে পলাশ গাছের ঝোপের আড়ালে ঘটি নিয়ে চললেন। বাস! আর ফিরলেন না। বাঘে নিয়ে গেল।
