দেওয়ানকে দেখে ছোটসাহেব বলে উঠলো–আরে দেওয়ান, এসো এসো। তুমি বলো তো তিনশো তেষট্টি নম্বর আকাইপুরির নীলের বাণ্ডিলের সঙ্গে দেউলে, ঘোঘা, সরাবপুরির নীল মিশবে?
আসল কথা এরা নীল ভালোমন্দতে মেশাচ্চে। সব মাঠের নীল ভালো হয় না। যারা এদের মধ্যে বিশেষজ্ঞ তারা নীল দেখে বলে। দেবে তার শ্ৰেণী। বলে দেবে, এ নীলের সঙ্গে ও নীল মিশিও না, আমুটি কোম্পানির দালাল ধরে ফেলে দেবে।
দেওয়ান বললে–খুব মিশবে। এ বছর আর কালীবর দালাল আসবে না, রবার্ট সাহেব কিছু বোঝে না–ঘোঘা আর আমাদের মোল্লাহাটি, পাঁচপোতার নীল মিশিয়ে দিলি কেউ ধরতে পারবে না। এই এনিচি হুজুর, আমাদের সেই কবিরাজ।
ছোটসাহেব রামকানাইয়ের দিকে চেয়ে বললে–চুনের গুদাম কি রকম লাগলো?
রামকানাই হাতজোড় করে বললে–সায়েবমশায়, নমস্কার আজ্ঞে।
–চুনের গুদাম কেমন জায়গা?
দেওয়ান রাজারাম জিভে একটা শব্দ করে হাত দুখানা তুলে বললে–হুজুর, আপনি বললেন কি রকম জায়গা! কবিরাজ তার কি জানে? সেখানে ঢুকে ঘুমুতি লেগেছে।
–অ্যাঁ! ঘুমুচ্ছিলে? তা হলে খুব আরামের জায়গা বলে মনে হয়েচে। দেখচি। আর কদিন থাকতি চাও?
–আজ্ঞে? সায়েবমশায় কি বলছেন, আমি বুঝতি পিরচি নে।
–খুব বুঝেচ। তুমি ঘুঘু লোক, ন্যাকা সাজুলি জন ডেভিড তোমায় ছাড়বে না। মকদ্দমায় সাক্ষী দেবে কি না বলো। যদি দ্যাও, তোমাকে আরো দশ টাকা এখুনি মাইনে বাড়িয়ে দেবো। কেমন রাজি? কোনো কথা বলতি হবে না, তুমি বুনোপাড়ার ছিকৃষ্ট বুনো আর দুএকজন। লোককে লাঠি হাতে চলে যেতি দেখে বলবে। রাজি?
–আজ্ঞে সায়েবমশায়?
–ও সায়েমশায় বলা খাটবে না। করতি হবে, সাক্ষী দিতি হবে। তোমার উন্নতি করে দেবো। এখানে বাঁধা মাইনের কবরেজ হবে। কুড়ি টাকা মাইনে ধরে দিও দেওয়ান জুন মাস থেকে।
দেওয়ান রাজারাম তখুনি পড়াপাখির মতো বলে উঠলেন–যে আজ্ঞে হুজুর।
বেশ নিয়ে যাও। কবিরাজ রাজি আছে। নিয়ে যাও ওকে। প্রসন্ন আমিন, তোমার ঘরে শোবার জায়গা করে দিতি পারব না কবিরাজের?
প্রসন্ন আমিন তটস্থ হয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললে–হাঁ হুজুর। আমার বিছানা পাতাই আছে, তাতেও উনি শুতে পারেন না হয়—
রামকানাইয়ের মুখ শুকিয়ে গিয়েচে, জলতেষ্টায় তাঁর জিভ জড়িয়ে। এসেছে, কিন্তু নীলকুঠিতে সায়েবের ও মুচির ছোঁয়া জল তিনি খাবেন, কারণ এইমাত্র দেখলেন বেহারা শ্রীরাম মুচি ছোটসায়েবের জন্যে কাচের বাটি করে মদ (মদ নয় কফি, রামকানাই ভুল করেচেন) নিয়ে এল–সত্যিক জাতের ছোঁয়াছুঁয়ি এখানে–নাঃ, এইসব ব্রাহ্মণেরও দেখচি এখানে জাত নেই। এখানে কবিরাজি করতে হলে জল খাবেন না এখানকার, শুধু ডাব খেয়ে কাটাতে হবে।
প্রসন্ন আমিন বললে–তা হলে চলুন কবিরাজমশাই–রাত হয়েচে।
দেওয়ান রাজারাম পাকা লোক, তিনি এই সময় বললেন–তা হলে কবিরাজমশায়ের সাক্ষী দেওয়া ঠিক হোলো তো?
প্রসন্ন আমিন রামকানাইয়ের দিকে চাইলে। রামকানাই বললে– সায়েবমশাই, তা আমি কেমন করে দেবো? সে আগেই বললাম তো দেওয়ানমশাইকে।
ছোটসাহেব চোখ গরম করে বললে–সাক্ষী দেবে না?
–না, সায়েবমশাই। মিথ্যে কথা বলতি আমি পারবো না। দোহাই আপনার। হাতজোড় করচি আপনার কাছে। আমার বাবা ছিলেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত
-ও, তুমি এমনি সায়েস্তা হবে না। তোমার মাথার ঠিক এমনি হবে না। ভজা, নফরকে ডাক দ্যাও। দশ ঘা শ্যামচাঁদ কষে দিক।
নফর মুচি লম্বা জোয়ান মিশকালো লোক। সে অনেক লোককে নিজের হাতে খুন করেছে। কুঠির বাইরে আশপাশ গ্রামে নফরকে সবাই ভয় করে। নফর বোধ হয় ঘুমুচ্ছিল। ভজার পেছনে পেছনে সে চোখ মুছতে মুছতে এল।
ছোটসাহেব রামকানাইয়ের দিকে চেয়ে বললেন–কেমন? লাগাবে শ্যামচাঁদ?
–আজ্ঞে সায়েবমশাই–তাহলি আমি মরে যাবো। আমারে মারতি বলবেন না। আষাঢ় মাসে বাত শ্লেষ্ম হয়ে আমার শরীর বড় দুর্বল
–মরে গেলে তাতে আমার কিছুই হবে না। নিয়ে যাও নফর–
–নফর বললে–যে আজ্ঞে হুজুর।
নফর এসে রামকানাইয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চললো। যাবার সময় দেওয়ানজির দিকে তাকিয়ে বললে–তাহলি আস্তাবলে নিয়ে যাই?
এই সময় দেওয়ানের দিকে সে সামান্যক্ষণের জন্য স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
দেওয়ান বললেন–নিয়ে যাও
রামকানাই বলিদানের পাঁঠার মতো নফরের সঙ্গে চললেন। লোকটা স্বভাবত নির্বোধ, এখুনি যে নফর মুচির জোরালো হাতের শ্যামচাঁদের ঘায়ে তাঁর পিঠের চামড়া ফালা ফালা হয়ে যাবে সে সম্ভাবনা কানে শুনলেও বুদ্ধি দিয়ে এখনো হৃদয়ঙ্গম করে উঠতে পারেন নি।
আস্তাবলে দাঁড় করিয়ে নফর ক্ষীণ চন্দ্রালোকে রামকানাইয়ের দিকে ভালো করে চেয়ে বললে—ক’ঘা খাবা!
–আমারে মেরো না বাবা। আমার বাত শ্লেষ্মর অসুখ আছে, আমি তাহলি মরি যাবো।
–মরে যাও, বাওড়ের জলে ভাসিয়ে দেবানি। তার জন্যে ভাবতি হবে না। অমন কত এ হাতে ভাসিয়ে দিইচি। পেছন ফিরে দাঁড়াও।
দু’ঘা মাত্র শ্যামচাঁদ খেয়ে রামকানাই মাটিতে পড়ে গিয়ে ছটফট করতে লাগলেন। নফর কোথা থেকে একটা চটের থলে এনে রামকানাইয়ের গায়ে ফেলে দিলে। তার ধুলোয় রামকানাইয়ের মুখের ভিতর ভর্তি হয়ে দাঁত কিচকিচ করতে লাগলো। পিঠে তখন ওদিকে নফর সজোরে শ্যামচাঁদ চালাচ্চে ও মুখে শব্দ করচেরাম, দুই, তিন, চার–
