রামকানাই বিষণ্ণ মুখে বললেন–তা–তা–
–তা-তা নয়, বলতি হবে। আপনি কি চান? বড়সায়েব বড় ভালো নজর দিয়েছে আপনার ওপর। যা চান, তাই দেবে। আপনার উন্নতি হয়ে যাবে এবার।
রাজারাম আরো বললেন–তা হলে যান এখন। নীলকুঠির ঘোড়া দিতাম, কিন্তু আপনি তো চড়তি জানেন না। গোরুর গাড়িতে যাবেন?
রামকানাই খুব বিনীতভাবে হাত জোড় করে বললেন–দেওয়ানমশাই, আমি বড় গরিব। আমারে মুশকিলে ফ্যালবেন না। আদালতে দাঁড়িয়ে হলপ করে তবে সাক্ষী দিতি হয় শুনিচি। আজ্ঞে, আমি সেখানে মিথ্যে কথা বলতি পারবো না। আমায় মাপ করুন দেওয়ানমশাই, আমার বাবা ত্রিসন্ধ্যা না করে জল খেতেন না; কখনো মিথ্যে বলতি শুনি নি। কেউ তাঁর মুখে। আমি বংশের কুলাঙ্গার তাই কবিরাজি করে পয়সা নিই। বিনামূল্যে রোগ আরোগ্য করা উচিত। জানি সব, কিন্তু বড় গরিব, না নিয়ে পারি নে। আদালতে দাঁড়িয়ে মিথ্যে কথা আমি বলতি পারবো না দেওয়ানমশাই!
দেওয়ান রাজারাম রেগে উত্তর দিলেন–এডা বড় ধড়িবাজ। এডারে চুনের গুদামে পুরে রেখো আজ রাত্তিরি। চাপুনির জল খাওয়ালি যদি জ্ঞান হয়। তাতেও যদি না সারে, তবে শ্যামচাঁদ আছে জানো তো?
পাইক নফর মুচি কাছে দাঁড়িয়ে, বললে–চলুন ঠাকুরমশায়।
–কোথায় নিয়ে যাবা?
–চুনের গুদোমে নিয়ে যাতি বলচেন দাওয়ানজি, শোনলেন না? আপনি ব্রাহ্মণ দেবতা, গায়ে হাত দেবো না, দিলি আমার মহাপাপ হবে। আপনি চলুন এগিয়ে।
–কোন দিকি?
–আমার পেছনে পেছনে আসুন।
কিছুদূর যেতেই রাজারাম পুনরায় রামকানাইকে ডেকে বললেন– তা হলি চুনের গুদামেই চললেন? সে জায়গাটাতে কিন্তু নাকে কাঁদতি হবে গেলে। আপনি ভদ্রলোকের ছেলে তাই বললাম।
–তবে আমারে কেন সেখানে পাঠাচ্চেন দেওয়ানমশাই, পাঠাবেন। না।
–আমার তো পাঠানোর ইচ্ছে নয়। আপনি যে এত ভদ্রলোক হয়ে, কুঠির মাইনে বাঁধা কবিরাজ হয়ে, আমাদের একটা উপগার করবেন না–
–তা না, হলপ করে মিথ্যে বলতি পারবো না। ওতে পতিত হতে হয়।
–তবে চুনের গুদামে ওঠে গিয়ে ঠেলে। যাও নফর–চাবি বন্ধ করে এসো।
.
রাত প্রায় দশটা। দেওয়ান রাজারাম একা গিয়ে চুনের গুদামের দরজা খুললেন। রামকানাই কবিরাজ ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েচেন। নীলকুঠির চুনের গুদাম শয়নঘর হিসেবে খুব আরামদায়ক স্থান নয়। চুনের গুদাম-এর সঙ্গে চুনের সম্পর্ক তত থাকে না, যত থাকে বিদ্রোহী প্রজা ও কৃষকের। বড়সাহেবের ও নীলকুঠির স্বার্থ নিয়ে যার সঙ্গে বিরোধ বা মতভেদ, সে চুনের গুদামের যাত্রী। এই আলো বাতাসহীন দুটো মাত্র ঘুলঘুলিওয়ালা ঘরে তাকে আবদ্ধ থাকতে হবে ততক্ষণ, যতক্ষণ বড়সাহেব বা ছোটসাহেবের অথবা দেওয়ানজির মরজি। চুনের গুদামের বাইরে একটা বড় মাদারগাছ ছিল। একবার রাসমণিপুরের জনৈক দুর্দান্ত প্রজা ঘুলঘুলি দিয়ে বার হয়ে মাদারগাছের নিচু ডাল ধরে ঝুলে পালিয়ে গিয়েছিল বলে তৎকালীন বড়সাহেব জন সাহেবের আদেশে গাছটা কেটে ফেলা হয়। চুনের গুদামে ইতিপূর্বে একজন প্রজা নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল ভূত দেখে।
রাজারামের মনে ভূতের ভয়টা একটু বেশি। একলা কখনো তিনি এত রাত্রে চুনের গুদামে আসতেন না। আসবার আগে তাঁর গা-টা ছছ করছিল, এখন রামকানাইকে দেখে তিনি মনে একটু সাহস পেলেন। হোক না ঘুমন্ত, তবুও একটা জলজ্যান্ত মানুষ তো বটে। দেওয়ানজি ডাক দিলেন–ও কবরেজ মশাই–ও কবরেজ—
রামকানাই চমকে ধড়মড় করে উঠে বললেন–কে? ও দেওয়ানমশাই–আসুন আসুন–বলেই এমন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাঁকে বসবার ঠাঁই দিতে, যেন রাজারাম তাঁর বাড়িতে আজ রাতের বেলা অতিথিরূপে পদার্পণ করেছেন।
রাজারাম বললেন–থাক থাক। বসবার জন্যি আসি নি, আমার সঙ্গে চলুন।
–কোথায় দেওয়ানমশাই?
–চলুন না।
–তা চলুন। তবে এমন ঘরে আর আমায় পোরবেন না দেওয়ানমশাই, বড় মশা। কামড়ে আমারে খেয়ে ফেলে দিয়েছে একেবারে।
–আপনার গেরোর ফের। নইলে আজ আপনি নীলকুঠির কবিরাজ, আপনাকে এখানে আসতি হবে কেন! যাক যা হবার হয়েচে, এখন চলুন আমার সঙ্গে।
–যেখানেই নিয়ে যান, একটু যেন ঘুমুতি পারি।
–মত বদলেচে?
–না দেওয়ানমশাই, হাত জোড় করে বলচি, আমারে ও অনুরোধ করবেন না। আমি কবিরাজ লোক, কারো অসুখ দেখলি নিজে গাছগাছড়া তুলে এনে বড়ি করে দোবো, নিজের হাতে পাঁচন সেদ্ধ করবো, সে কাজে ক্রটি পাবেন না। কিন্তু ওসব মামলা-মকদ্দমার কাজে আমারে জড়াবেন না। দোহাই আপনার
রামকানাই সরল লোক, নীলকুঠির সাহেবদের ক্রিয়াকলাপ কিছুই জানতেন না–বা সাহেবদের চেয়েও তাদের এইসব নন্দীভূঙ্গির দল যে এককাঠি সরেস, তারা যে রাতদুপুরে সাহেবদের হুকুমে ও ইঙ্গিতে বিনা দ্বিধায় অম্লানবদনে জলজ্যান্ত মানুষকে খুন করে লাশ গাজিপুরের বিলে পুঁতে রেখে আসতে পারে তাই বা তিনি কোন চরক সশ্রতের পুঁথিতে পড়বেন?
ছোটসাহেব একটা লম্বা বারান্দায় বসে নীলের বাণ্ডিলের হিসেব করছিলেন। এই সব বাণ্ডিলবাঁধা নীল কলকাতা থেকে আমুটি কোম্পানির বায়না করা। দিন তিনেকের মধ্যে তাদের তরফ থেকে হৌস ম্যানেজার রবার্টস্ সাহেব এসে নীল দেখবে। ছোটসাহেব নীলের বাণ্ডিলের তদারক করচে এই জন্যই। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রসন্ন আমিন, সে খুব ভালো নীল চেনে, এবং জমানবিশ কালাই গাঙ্গুলী। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সহিস ভজা মুচি।
