দশ ঘা শেষ করে নফর বললে–যাও, বেরাহ্মণ মানুষ। সায়েব বললি কি হবে, তুমি মরে যেতে দশ ঘা শ্যামচাঁদ খেলে। রাত্তিরি এখান থেকে নড়বা না। সামনে এসে ছোটসায়েব দেখলি ছুটি।
রামকানাই বাকি রাতটুকু মড়ার মতো পড়ে রইলেন আস্তাবলের মেঝেতে।
৩. বাড়ির সামনে বকুলতলা
ভবানী বাঁড়ুয্যে সকালে বাড়ির সামনে বকুলতলায় দাঁড়িয়ে আছেন, আজ হাটবার, চাল কিনবেন। নিলু বলে দিয়েচে একদম চাল নেই। এমন সময় তিলু এক বছরের খোকাকে এনে তাঁর কাছে দিতে গেল। ভবানী বললেন–এখন দিও না, আমি একটু মামার কাছে যাবো। যাও, নিয়ে যাও।
খোকা কিন্তু ইতিমধ্যে মার কোল থেকে নেমে পড়ে ভবানীর। কোলে যাবার জন্যে দুহাত বাড়াচ্চে। তিলু নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে সে কাঁদতে লাগল ও ছোট্ট ডান হাতখানা বাড়িয়ে বাবাকে ডাকতে লাগলো।
–দিয়ে যাও, দিয়ে যাও! দাঁড়াও, ঐ তো দীনু বুড়ি আসচে। দেখে নাও তো চালটা। ভবানী ছেলেকে কোলে করলেন। খোকা আনন্দে তাঁর কান ধরে বলতে লাগল–ই–গুন–আঙ্গুল দিয়ে পথের দিকে দেখিয়ে দিলে।
ভবানী বললেন–না, এখন তোমার বেড়াবার সময় নয়। ওবেলা যাবো।
খোকা ওসব কথা বোঝে না। সে আবার আঙ্গুল দিয়ে পথের দিকে দেখিয়ে বললে–ইঃ।
–না। এখন না।
তিলু বললে–যাচ্চেন তো মামাশ্বশুরের ওখানে। নিয়ে যান না সঙ্গে।
খোকা ততক্ষণে বাবার পৈতের গোছ ছোট্ট মুঠোতে ধরে পথের দিকে টানচে, আর চেঁচিয়ে বলচে-অ্যাঃ–নোবল নোবল–উঁ–
পরেই কান্নার সুর।
তিলু বললে–যাও, যাও। আহা, আপনার সঙ্গে বেড়াতে ভালবাসে।
–কেন, ওর তিন মা! আমি না হলে চলে না?
–না গো। রান্নাঘরে যখন থাকে, তখন থাকে থাকে কেবল আঙ্গুল তুলে বাইরের দিকে দেখায়, মানে আপনার কাছে নিয়ে যেতে বলে–
এমন সময় দীনু বুড়ি চালের ধামা কাঁধে করে নিয়ে ওদের কাছাকাছি এসে পড়তেই ওরা বললে–দেখি কি চাল?
দীনু বুড়ির বয়স আশির ওপর, চেহারা ভারতচন্দ্র বর্ণিত জরতীবেশিনী অন্নদার মতো। এমন কি হাতের ছোট্ট লড়িটি পর্যন্ত। ওদের কাছে এসে একগাল হেসে ধামা নামিয়ে বললে–ডবল নাগরা দিদিমণি। আর কে? জামাই?
তিলু বললে–হ্যাঁ গো। দর কি?
–ছপয়সা।
–না, এক আনা করে হাটে দর গিয়েচে।
–না দিদিমণি, তোমাদের খেয়ে মানুষ, তোমাদের ফাঁকি দেবানি? ছপয়সা না দ্যাও, পাঁচ পয়সা দিও। এক মুঠো নিয়ে চিবিয়ে দ্যাখো কেমন মিষ্টি। আকোরকোরার মতো।
–চল বাড়ির মধ্যি। পয়সা কিন্তু বাকি থাকবে।
–ঐ দ্যাখো, তাতে কি হয়েচে? ওবেলা দিও।
–ওবেলা না। মঙ্গলবারের ইদিকি হবে না।
–তাই দিও।
এই ফাঁকে খোকা খপ করে একমুঠো চাল ধামা থেকে উঠিয়ে। নিয়েই মুখে পুরে দিলে। কিছু কিছু পড়ে গেল মাটিতে। ভবানী ওর হাত থেকে চাল কেড়ে নিয়ে কোলে নিয়ে বললেন–হাঁ করো–হাঁ করো খোকা
খোকা অমনি আকাশ-পাতাল বড় হাঁ করলে। এটা তিলু খোকাকে শিখিয়েছে। কারণ যখন তখন যা-তা সে দুই আঙ্গুলে খুঁটে তুলে সর্বদা মুখে পুরচে, ওর মা বলে–হাঁ কর খোকন–নক্ষি ছেলে। কেমন হাঁ। করে–
অমনি খোকা আকাশ-পাতাল হাঁ করে অনেকক্ষণ থাকবে, সেই ফাঁকে ওর মা মুখে আঙ্গুল পুরে মুখের জিনিস বার করে ফেলবে।
আজকাল সে হাঁ করে বলে–আ-আ-আ-আ
–ওর মা বলে–থাক–থাক। অত হাঁ করতি হবে না
ভবানী বাঁড়ুয্যে খোকনের মুখ থেকে আঙ্গুল দিয়ে সব চাল বের করে ফেলে দিলেন। এমন সময় পথের ওদিক থেকে দেখা গেল ফণি চক্কত্তি আসচেন, পেছনে ভবানীর মামা চন্দ্র চাটুয্যে। ভবানী বললেন– তিলু, তুমি দীনু বুড়িকে নিয়ে ভেতরে যাও–খোকাকেও নিয়ে যাও
ওঁরা দুজন কাছে আসচেন, তিলু খোকাকে নিতে গেল, কিন্তু সে বাবার কোল আঁকড়ে রইল দুহাতে বাবার গলা জাপটে ধরে। মুখে তারস্বরে প্রতিবাদ জানাতে লাগলো।
তিলু বললেও আপনার কোল থেকে কারো কোলে যেতে চায় না, আমি কি করবো?
ভবানী হাসলেন। এ খোকাকে তিনি কত বড় দেখলেন এক মুহূর্তে। বিজ্ঞ, পণ্ডিত ছেলে টোল খুলে কাব্য, দর্শন, ভক্তিশাস্ত্র পড়াচ্চে ছাত্রদের। সৎ, ধার্মিক, ঈশ্বরকে চেনে। হবে না? তাঁর ছেলে কিনা? খুব হবে। দেশে দেশে ওকে চিনবে, জানবে।
সেই মুহূর্তে তিলুকেও দেখলেন–দীনু বুড়ির আগে আগে চলে গিয়ে বাড়ির ছোট্ট দরজার মধ্যে ঢুকে চলে গেল। কি নতুন চোখেই ওকে দেখলেন যেন। মেয়েরাই সেই দেবী, যারা জন্মের দ্বারপথের অধিষ্ঠাত্রী–অনন্তের রাজ্য থেকে সসীমতার মধ্যেকার লীলাখেলার জগতে অহরহ আত্মাকে নিয়ে আসচে, তাদের নবজাত ক্ষুদ্র দেহটিকে কত যত্নে পরিপোষণ করচে, কত বিনিদ্র উদ্বিগ্ন রাত্রির ইতিহাস রচনা করে জীবনে, কত নিঃস্বার্থ সেবার আকুল অশ্রুরাশিতে ভেজা সে ইতিহাসের অপঠিত অবজ্ঞাত পাতাগুলো।
ভবানী বললেন–শোনো তিলু
–কি?
–খোকাকে নেবে?
–ও যাবে না বললাম যে!
–একটু দাঁড়াও, দেখি। দাঁড়াও ওখানে।
–আহা-হা! ঢং!
মুচকে হেসে সে হেলেদুলে ছোট্ট দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকলো। কি শ্রী! মা হওয়ার মহিমা ওর সারা দেহে অমৃতের বসুধারা সিঞ্চন করেছে।
ফণি চক্কত্তি বললেন–বোসো বাবাজি।
সবাই মিলে বসলেন। ভবানী বাঁড়ুয্যে তামাক সেজে মামা চন্দ্র চাটুয্যের হাতে দিলেন। ফণি চক্কত্তি বললেন–বাবাজি, তোমাকে একটা কাজ করতি হবে–
–কি মামা?
–তোমাকে একবার আমার বাড়ী যেতি হবে। আমি একবার গয়া কাশী যাবো ভাবচি। তোমার মামাও আমার সঙ্গে যাবেন। তুমি তো বাবা সব জানো এদিকের পথঘাট। কোথা দিয়ে যাবো, কি করবো!
