বড়সাহেব রাজারামকে ডেকে বললে–খুনের কঠা কি শুনিটেছি? কে খুন করিল?
রাজারাম বললেন–আমাদের লোক নয় হুজুর। তার শত্রু ছিল। অনেক–রামু বাগ্দির। কে খুন করেচে আমরা কি জানি?
–আমাদের লাঠিয়াল গিয়াছিল কি না?
–না হুজুর। –পুলিসের কাছে এই কঠা প্রমাণ করিটে হইবে।
ছোটসাহেবকে বললে–আই থিঙ্ক দ্যাট ম্যান হাজ ওভারশট হিজ মার্ক দিস টাইম। আই ডোন্ট এ্যাপ্রিসিয়েট দিস মার্ডার বিজনেস, ইউ সি? টু ম্যাচ অফ এ ট্রাবল–হ্যাঁেয়েন আই এ্যাম দি এনকোয়্যারিং ম্যাজিষ্ট্রেট।
–আই অর্ডার্ড ওনলি দি ফিশ-বান্ড টু বি সোয়েপট এ্যাওয়ে, সার।
–আই নো, গেট রেডি ফর দি ট্রাবল দিস টাইম।
পুলিস তদন্তের পূর্বে রামকানাই কবিরাজের ডাক পড়লো রাজারামের বাড়ি। রাজারাম তাঁকে বলে দিলেন, এই কথা তাঁকে বলতে হবে– বুনোপাড়ার লোকদের রামুকে খুন করতে তিনি দেখেচেন।
রামকানাই চক্রবর্তী বললেন–একেবারে মিথ্যে কথা কি করে বলি রায়মশাই?
–বলতি হবে। বেশি ফ্যাচফ্যাচ করবেন না। যা বলা হচ্ছে তাই করবেন।
–আজ্ঞে এ তো বড় বিপদে ফেললেন রায়মশাই।
–আপনাকে পান খেতে দেবো কুঠি থেকে।
রাম রাম! ও কথা বলবেন না। পয়সা নিয়ে ও কাজ করবো না।
তদন্তের সময় রামকানাইয়ের ডাক পড়লো। দারোগা নীলকুঠির অনেক নুন খেয়েছে, সে অনেক চেষ্টা করলে রামকানাইয়ের সাক্ষ্য ওলটপালট করে দিতে।
রামকানাইয়ের এক কথা। নীলকুঠির লাঠিয়ালদের তিনি বাঁধাল থেকে পালাতে দেখেচেন। রামু সর্দারের মৃতদেহও তিনি দেখেচেন, তবে কে তাকে মেরেছে, তা তিনি দেখেন নি।
দারোগা বললে-বুনোপাড়ার সঙ্গে ওর বিবাদ ছিল জানেন?
–না দারোগামশাই।
–বুনোপাড়ার কোনো লোককে সেখানে দেখেছিলেন?
–না।
–ভালো করে মনে করুন।
–না দারোগামশাই।
যাবার সময় দারোগা রাজারাম রায়কে ডেকে বলে গেল–দেওয়ানজি, কবিরাজ বুড়ো বড় তেঁদড়। ওকে হাত করার চেষ্টা করতে হবে। ডাবের জল খাওয়ান বেশি করে।
রামকানাইকে নীলুকঠিতে ডেকে নিয়ে যাওয়া হল পাইক দিয়ে। প্রসন্ন চক্রবর্তী আমিন বললে–কবিরাজমশায়–বড়সায়েব বাহাদুর বলেচেন আপনাকে খুশি করে দেবেন। শুধু কি চান বলুন–বড় সন্তুষ্ট হয়েচেন আপনার ওপর।
–আমি আবার কি চাইব? গরিব বামুন, আমিনমশায়। যা দেন তিনি।
–তবুও বলুন কি আপনার–মানে ধরুন টাকাকড়ি কি ধান–
–ধান দিলে খুব ভালো হয়।
–তাই আমি বলচি দেওয়ানজির কাছে
রামকানাই চক্রবর্তীকে তারপর নিয়ে যাওয়া হল ছোটসাহেবের খাস কামরায়। রামকানাই গরিব ব্যক্তি, সাহেব-সুবোর আবহাওয়ায় কখনো আসেন নি, কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকলেন। ছোটসাহেব পাইপ মুখে বসে ছিল। কড়া সুরে বললে–ইদিকি এসো–
–আজ্ঞে সায়েবমশায়–নমস্কার হই। –
-তুমি কি কর?
–আজ্ঞে, কবিরাজি করি।
–বেশ। কুঠিতে কবিরাজি করবে?
–আজ্ঞে কার কবিরাজি সায়েমশায়?
–আমাদের।
–সে আপনাদের অভিরুচি। যা বলবেন, তাই করবো বৈ কি!
–তাই করবা?
–আজ্ঞে কেন করবো না?
–মাসে তোমায় দশ টাকা করে দেওয়া হবে তা হলি।
রামকানাই চক্রবর্তী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। দশ টাকা! মাসে দশ টাকা আয় তো দেওয়ানমশায়দের মতো বড়মানুষের রোজগার! আজি হঠাৎ এত প্রসন্ন হলেন কেন এরা?
রামকানাই কবিরাজ বললেন–দশ টাকা সায়েবমশায়?
–হ্যাঁ, তাই দেওয়া হবে।
রাজারামকে ডেকে ধূর্ত ছোটসাহেব বলে দিলে–এই লোকের কাছে একটা চুক্তি করে লেখাপড়া হোক। দশ টাকা মাসে কবিরাজির জন্যে কুঠির ক্যাশ থেকে দেওয়া হবে। দশটা টাকা দিয়ে দ্যাও এক মাসের আগাম।
–বেশ হুজুর।
পরদিন রামকানাইয়ের আবার ডাক পড়লো নীলকুঠিতে। তার আগের দিন বিকেলে টাকা নিয়ে চলে এসেছেন হৃষ্ট মনে। আজ সকালে আবার কিসের ডাক? দেওয়ান রাজারামের সেরেস্তায় গিয়ে হাজিরা দিতে হল রামকানাইকে। দেওয়ান বললেন–তা হলে তো আপনি এখন আমাদের লোক হয়ে গেলেন?
রামকানাই বিনীতভাবে জানালেন, সে তাঁদের কৃপা।
-না না, ওসব নয়। আপনি ভালো কবিরাজ। আমাদেরও দরকার। দশ টাকা পেয়েছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–একটা কথা। সব তো হোলো। নীলকুঠির নুন তো খ্যালেন, এবার যে তার গুণ গাইতি হবে।
–আজ্ঞে মহানুভব বড়সায়েব, ছোটসায়েব, আর দেওয়ানজির গুণ সর্বদাই গাইবো। গরিব ব্রাহ্মণ, যা উপকার আপনারা করলেন
ও কথা থাক্। সেই খুনের মকদ্দমায় আপনাকে আমাদের পক্ষে সাক্ষী দিতি হবে। এই উপকারডা আপনি করুন আমাদের।
রামকানাই আকাশ থেকে পড়লেন–সে কি? সে তো মিটে গিয়েচে, যা বলবার পুলিসের কাছে বলেছেন, আবার কেন?
–তা নয়, আদালতে বতি হবে। আপনাকে আমরা সাক্ষী মানবো। আপনি বলবেন–বুনোপাড়ার ভন্তে বুনো, ন্যাংটা বুনো, ছিকৃষ্ট বুনো আর পাতিরাম বুনোকে আপনি লাঠি নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছেন।
–কিন্তু তা তো দেখি নি দেওয়ানমশাই?
–না দেখেচেন না-ই দেখেছেন। বোকার মতো কথা বলবেন না। নীলকুঠির মাইনে করা বাঁধা কবিরাজ আপনাকে করা হোলো। সায়েব মেমের রোগ সারালে বকশিশ পাবেন কত। দশ টাকা মাসে তো বাঁধা মাইনে হয়েচে। একটা ঘর কাল আপনার জন্যি দেওয়ানো হবে, বড়সায়েব বলেচে। আপনি তো আমাদের নিজির লোক হয়ে গ্যালেন। আমাদের পক্ষ টেনে একটা কথা–ওই একটা কথা–ব্যস হয়ে গেল! আপনাকে আর কিছু বলতি হবে না। ওই একটা কথা আপনি বলবেন, অমুক অমুক বুনোকে দৌড়ে পালাতে আপনি দেখেছেন।
