রাজারাম প্রশংসমান দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বললেন–বাঃ, কবে করলে?
–রবিবার রাতদুপুরের পর।
–সঙ্গে কে ছিল?
–করিম লেঠেল আর আমি। পিম্যান ছিল সয়ারাম বোষ্টম।
–রিপোর্ট কর নি কেন? আগে জানাতি হয় এ সব কথা। তা হলি বড়সায়েবের কাছে আমাকে মুখ খেতি হত না। যাও–
–কিছু মনে করবেন না দেওয়ানজি। কেন বলি নি শুনুন, ভরসা পাই নি, ঠিক বলচি। রাহাতুনপুরির সেই ব্যাপারের পর আর কিছু
–সে ভয় নেই। ম্যাজিস্ট্রেট বদলে গিয়েচে। বড়সাহেব নিজে বললে আমাকে।
.
কিন্তু সেদিন সকালেই চরপাড়ায় গোলমাল বাধলো।
পাইক এসে খবর দিলে চরপাড়ার প্রজারা দাগ উপড়ে ফেলেছে। রাজারাম রায় বড়-সাহেবকে কথাটা জানালেন না। তাঁর দূর সম্পর্কের সেই ভাইপো রামকান্ত রায়, যে কলকাতায় আমুটি কোম্পানীর হৌসে নকলবিশি করে এবং যে অদ্ভুত কলের গাড়ী ও জাহাজের কথা বলেছিল, সে নীলকুঠিতে এসেছিল দেওয়ানের সঙ্গে দেখা করতে।
প্রসন্ন চক্রবর্তী আমিন যে কাজ একা করে এসেছে, তাতে দেওয়ান রাজারাম নিজেও কিছু ভাগ বসাতে চান, রিপোর্ট সেইভাবেই লিখছিলেন, প্রসন্ন চক্রবর্তীকে অবিশ্যি হাওয়া করে দিচ্ছিলেন একেবারে।
রাজারাম তখুনি ঘোড়া ছুটিয়ে বেরুলেন চরপাড়ার দিকে। সেখানে এক বটতলায় বসে একে একে সমস্ত মুচিদের ডাকলেন। যার যত জমিতে আগে দাগ ছিল, তার চেয়ে বেশি দাগ স্বীকার করিয়ে টিপসই নিলেন প্রত্যেকের। কারো কিছু কথা শুনলেন না।
রামু সর্দারকে ডেকে বললেন–এবার পাঁচপোতার বাঁওড়ে বাঁধাল দিইছিলে তুমি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ রায়মশাই। ফি বছর মোর বাঁধাল পড়ে।
হুঁ।
রামু সর্দারের বুক কেঁপে গেল। দেওয়ানজিকে সে চেনে। ঘোড়ায় উঠবার সময় সে দেওয়ানকে বললে–মোর কি দোষ হয়েচে? অপরাধ নেবেন না যদি কেউ কিছু বলে থাকে।
দেওয়ানজি ঘোড়ায় চেপে উড়ে বেরিয়ে গেলেন।
সন্ধের পর পাঁচপোতার বাঁওড়ের বাঁধালে রামু সর্দার বসে তামাক খাচ্ছে আর চার-পাঁচজন নিকিরি ও চাষীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে, এমন সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে আট-দশজন লোক এসে ওর বাঁধাল ভাঙ্গতে আরম্ভ করলে।
রামু সর্দার খাড়া হয়ে উঠে বললে–কে? কে? বাঁধালে হাত দেয় কোন সুমুন্দির ভাই রে?
করিম লাঠিয়াল এগিয়ে এসে বললে–তোর বাবা।
–তবে রে–
রামু সর্দার বাগদি পাড়ার মোড়ল। দুর্বল লোক নয় সে। লাঠি হাতে সে এগিয়ে যেতেই করিম লাঠিয়ালের লাঠি এসে পড়লো ওর মাথায়। রামু সর্দার লাঠি ঠেকিয়ে দিতেই করিম হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো– সামলাও!
আবার ভীষণ বাড়ি।
রামু সর্দার ফিরিয়ে বাড়ি দিলে।
–শাবাশ! সামলাও।
রামু সর্দার ফাঁক খুঁজছিল। বিজয়গর্বে অসতর্ক করিম লাঠিয়ালের মাথার দিকে খালি ছিল, বিদ্যুৎ বেগে রামু সর্দার লাঠি উঠিয়ে বললে– তুমি সামলাও কমে খানসামা।
সঙ্গে সঙ্গে রামুর লাঠি ঘুরে গেল বোঁ করে ওর বাঁকা আড়-করা লাঠির ওপর দিয়ে, বেল ফাটার মতো শব্দ হল। করিম পেঁপেগাছের ভাঙ্গা ডালের মতো পড়ে গেল বাঁধালের জালের খুঁটির পাশে। কিন্তু রামু সামলাতে পারলে না। সেও গেল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অমনি করিম লাঠিয়ালের সঙ্গী লাঠিয়ালরা দুড়দাড় করে লাঠি চালালে ওর উপর যতক্ষণ রামু শেষ না হয়ে গেল। রক্তে বাঁধালের ঘাস রাঙা হয়ে ছিল তার পরদিন সকালেও। চাপ চাপ রক্ত পড়ে ছিল ঘাসের ওপর–পথযাত্রীরা দেখেছিল। বাঁধালের চিহ্নও ছিল না তার পরদিন সেখানে। বাঁশ ভেঙ্গেচুরে নিয়ে চলে গিয়েছিল লাঠিয়ালের দল।
এই বাঁধালের খুব কাছে রামকানাই চক্রবর্তী কবিরাজ একা বাস করতেন একটা খেজুর গাছের তলায় মাঠের মধ্যে। রামকানাই অতি গরিব ব্রাহ্মণ। ভাত আর সোঁদালি ফুল ভাজা, এই তাঁর সারা গ্রীষ্মকালের আহার–যতদিন সোঁদালি ফুল ফোটে বাঁওড়ের ধারের মাঠে। কবিরাজি জানতেন ভালোই, কিন্তু এ পল্লীগ্রামে কেউ পয়সা দিত না। খাওয়ার জন্য ধান দিত রোগীরা। তাও শ্রাবণ মাসে অসুখ সারলো তো আশ্বিন মাসের প্রথমে নতুন আউশ উঠলে চাষীর বাড়ি বাড়ি এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে ঘুরে সে ধান নিজেকেই সংগ্রহ করতে হত তাঁকে।
রামকানাই খেজুরতলায় নিজের ঘরটিতে বসে দাশু রায়ের পাঁচালি পড়ছিলেন, এমন সময় হৈচৈ শুনে তিনি বই বন্ধ করে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তারপর আরো এগিয়ে দেখতে পেলেন, নীলকুঠির কয়েকজন লাঠিয়াল বাঁধালের বাঁশ খুলচে। একটু পরে শুনতে পেলেন কারা বলচে খুন হয়েচে। রামকানাই ফিরে আসচেন নিজের ঘরে, তাঁর পাশ দিয়ে হারু নিকিরি আর মনসুর নিকিরি দৌড়ে পালিয়ে চলে গেল।
রামকানাই বললেন–ও হারু, ও মনসুর, কি হয়েচে? কি হয়েচে?
তাদের পেছনে অন্ধকারে পালাচ্ছিল হজরৎ নিকিরি। সে বললে– কে? কবিরাজ মশায়? ওদিকি যাবেন না। রামু বাগদিকে নীলকুঠির লেঠেলরা মেরে ফেলে দিয়ে বাঁধাল লুঠ করচে।
রামকানাই ভয়ে এসে ঘরের দোর বন্ধ করে দিলেন।
একটা খুব আশ্চর্য ব্যাপার ঘটলো এই উপলক্ষে। খুনের চেয়েও বড়, হাঙ্গামার চেয়েও বড়।
.
পরদিন সকালে চারিদিকে হৈচৈ বেধে গেল–নীলকুঠির লোকেরা পাঁচপোতার বাঁধাল ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েচে, রামু সর্দারকে খুন করেছে। দলে দলে লোক দেখতে গেল ব্যাপারটা কি। অনেকে বললে–নীলকুঠির সাহেব এবার জলকর দখল করবে বলে এ রকম করচে।
অনেকে রাজারামের বাড়ি গেল। দেওয়ান রাজারাম আশ্চর্য হয়ে বললেন–খুন? সে কি কথা? আমাদের কুঠির কোনো লোক নয়। বাইরের লোক হবে। রামু বাগদি ছিল বদমাইশের নাজির। তার আবার শত্রুর অভাব! তুমিও যেমন। যা কিছু হবে, অমনি নীলকুঠির ঘাড়ে চাপালেই হোলো। কে খুন করে গেল, নীলকুঠির লোকে করেচেনাও ঠ্যালা!
