এ দিকে মহিষী বহুদিবস চন্দ্রাপীড়ের সংবাদ না পাইয়া অতিশয় উদ্বিগ্ন ছিলেন। একদা উপযাচিতক করিতে দেবমন্দিরে সমাগত হইয়াছেন এমন সময়ে, পরিজনেরা আসিয়া কহিল, দেবি! দেবতারা বুঝি এতদিনে প্রসন্ন হইলেন; যুবরাজের সংবাদ আসিয়াছে। পরিজনের মুখে এই কথা শুনিয়া মহিষীর নয়ন আনন্দবাস্পে পরিপ্লুত হইল। শাবকভ্রষ্ট হরিণীর ন্যায় চতুর্দ্দিকে চঞ্চল চক্ষু নিক্ষেপ করিয়া গদ্গদ বচনে কহিলেন, কই কে আসিয়াছে? এরূপ শুভ সংবাদ কে শুনাইল? বৎস চন্দ্রাপীড় ত কুশলে আছেন? মনের ঔৎসুক্য প্রযুক্ত এই কথা বারংবার বলিতে বলিতে স্বয়ং বার্ত্তাবহদিগের নিকটবর্ত্তিনী হইলেন। সজল নয়নে কহিলেন, বৎস! শীঘ্র চন্দ্রাপীড়ের কুশল সংবাদ বল। আমার অন্তঃকরণ অতিশয় ব্যাকুল হইয়াছে। চন্দ্রাপীড়কে তোমরা কোথায় দেখিলে? তিনি কেমন আছেন শীঘ্র বল। তাহারা মহিষীর কাতরতা দেখিয়া অত্যন্ত শোকাকুল হইল এবং প্রণামব্যপদেশে নেত্রজল মোচন করিয়া কহিল, আমরা আচ্ছোদসরোবরতীরে যুবরাজকে দেখিয়াছি। অন্যান্য সংবাদ এই ত্বরিতক নিবেদন করিতেছে, শ্রবণ করুন।
মহিষী তাহাদিগের বিষণ্ণ আকার দেখিয়াই অমঙ্গল সম্ভাবনা করিতেছিলেন, তাহাতে আবার, ত্বরিতক আর আর সংবাদ নিবেদন করিতেছে, এই কথা শুনিয়া বিষণ্ণ হইয়া ভূতলে পড়িলেন। শিরে করাঘাত পূর্ব্বক হা হতাস্মি বলিয়া বিলাপ করিয়া কহিলেন, ত্বরিতক আর কি বলিবে? তোমাদিগের বিষণ্ণ বদন, কাতর বচন ও হর্ষশূন্য আগমনেই সকল ব্যক্ত হইয়াছে। হা বৎস! জগদেকচন্দ্র! চন্দ্রানন! তোমার কি ঘটিয়াছে? কেন তুমি বাটী আসিলে না? শীঘ্র আসিব বলিয়া গেলে কই তোমার সে কথা কোথায় রহিল? কখন আমার নিকট মিথ্যা বল নাই এবারে কেন প্রতারণা করিলে? তোমার যাত্রার সময় আমার অন্তঃকরণে শঙ্কা হইয়াছিল, বুঝি সেই শঙ্কা সত্য হইল। তোমার সেই প্রফুল্ল মুখ আর দেখিতে পাইব না! তুমি কি এক বারে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছ? বস এক বার আসিয়া আমার অঙ্কের ভূষণ হও এবং মধুর স্বরে মা বলিয়া ডাকিয়া কর্ণকুহরে অমৃত বর্ষণ কর। এই হতভাগিনীকে মা বলিয়া সম্বোধন করে, এমন আর নাই। তুমি কখন আমার কথা উল্লঙ্ঘন কর নাই, এক্ষণে আমার কথা শুনিতেছ না কেন? কি জন্য উত্তর দিতেছ না? তুমি এমন বিবেচনা করিও না যে, বিলাসবতী চন্দ্রাপীড়ের অস্তগমনেও জীবন ধারণ করিবে। ত্বরিতকের মুখে তোমার সংবাদ শুনিতে ভয় হইতেছে। উহা যেন শুনিতে না হয়। এই বলিয়া মহিষী মোহ প্রাপ্ত হইলেন।
বিলাসবতী দেবমন্দিরে মোহ প্রাপ্ত হইয়া পড়িয়া আছেন, শুনিয়া মহারাজ অতিশয় চঞ্চল ও ব্যাকুল হইলেন। শুকনাসের সহিত তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কেহ কদলীদল দ্বারা বীজন, কেহ জলসেচন, কেহ বা শীতল পাণিতল দ্বারা মহিষীর গাত্রস্পর্শ করিতেছে। ক্রমে মহিষীর চৈতন্যোদয় হইল এবং মুক্ত কণ্ঠে হা হতাস্মি বলিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। রাজা প্রবোধবাক্যে কহিলেন, দেবি! যদি চন্দ্রাপীড়ের অত্যহিত ঘটিয়া থাকে, রোদন দ্বারা তাহার কি প্রতিকার হইবে? বিশেষতঃ সমুদায় বৃত্তান্ত শ্রবণ করা হয় নাই। অগ্রে বিশেষ রূপে সমুদায় শ্রবণ করা যাউক, পরে যাহা কর্ত্তব্য, করা যাইবেক। এই বলিয়া ত্বরিতককে ডাকাইলেন। জিজ্ঞাসিলেন, ত্বরিতক! চন্দ্রাপীড় কোথায় কিরূপ আছেন? বাটী আসিবার নিমিত্ত পত্র লিখিয়াছিলাম, আসিলেন না কেন? কি উত্তর দিয়াছেন? ত্বরিতক, যুবরাজের বাটী হইতে গমন অবধি হৃদয়বিদারণ পর্য্যন্ত সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিল। রাজা আর শুনিতে না পারিয়া আর্ত্তস্বরে বারণ করিয়া কহিলেন, ক্ষান্ত হও — ক্ষান্ত হও! আর বলিতে হইবে না। যাহা শুনিবার শুনিলাম। হা বৎস! হৃদয়বিদারণের ক্লেশ তুমিই অনুভব করিলে। বন্ধুর প্রতি যেরূপ প্রণয় প্রকাশ করিতে হয়, তাহার দৃষ্টান্ত পথে দণ্ডায়মান হইয়া পৃথিবীর প্রশংসাপাত্র হইলে। স্নেহ প্রকাশের নবীন পথ উদ্ভাবিত করিলে। তুমিই সার্থকজন্মা মহাপুরুষ। আমরা পাপিষ্ঠ, নির্দ্দয়, নরাধম। যেন কৌতুকাবহ উপন্যাসের ন্যায় এই দুর্ব্বিষহ দারুণ বৃত্তান্ত অবলীলাক্রমে শুনিলাম, কই কিছুই হইল না। অরে ভীরু প্রাণ! ব্যাকুল হইতেছিস্ কেন? যদি স্বয়ং বহির্গত না হইস্ এবার বলপূর্ব্বক তোকে বহির্গত করিব। দেবি! প্রস্তুত হও, এ সময় কালক্ষেপের সময় নয়। চন্দ্রাপীড় একাকী যাইতেছেন, শীঘ্র তাঁহার সঙ্গী হইতে হইবে। আর বিলম্ব করা বিধেয় নয়। আঃ হতভাগ্য শুকনাস! এখনও বিলম্ব করিতেছ? প্রাণপরিত্যাগের এরূপ সময় আর কবে পাইবে? এই বেলা চিতা প্রস্তুত কর। প্রজ্জ্বলিত অনলশিখা আলিঙ্গন করিয়া তাপিত অঙ্গ শীতল করা যাউক। ত্বরিতক সভয়ে বিনীত বচনে নিবেদন করিল, মহারাজ! আপনি যেরূপ সম্ভাবনা ও শঙ্কা করিতেছেন সেরূপ নয়। যুবরাজের শরীর প্রাণবিযুক্ত হইয়াছে; কিন্তু অনির্ব্বচনীয় ঘটনাবশতঃ অবিকৃত আছে। এই বলিয়া আকাশবাণীর সমুদায় বিবরণ, ইন্দ্রায়ুধের কপিঞ্জলরূপ ধারণ ও শাপবৃত্তান্ত অবিকল বর্ণন করিল। উহা শ্রবণ করিয়া রাজার শোক বিস্ময়রসে পরিণত হইল। তখন বিস্মিত নয়নে শুকনাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন।
স্বয়ং শোকার্ণবে নিমগ্ন হইয়াও শুকনাস ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক সাক্ষাৎ জ্ঞানরাশির ন্যায় রাজাকে বুঝাইতে লাগিলেন। কহিলেন, মহারাজ! বিচিত্র এই সংসারে প্রকৃতির পরিণাম, জগদীশ্বরের ইচ্ছা, শুভাশুভ কর্ম্মের পরিপাক অথবা স্বভাববশতঃ নানাপ্রকার কার্য্যের উৎপত্তি হয় ও নানাবিধ ঘটনা উপস্থিত হইয়া থাকে। শাস্ত্রকারেরা এরূপ অনেক ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা যুক্তি ও তর্কশক্তিতে আপাততঃ অলীক রূপে প্রতীয়মান হয়; কিন্তু বস্তুতঃ তাহা মিথ্যা নহে। ভুজঙ্গদষ্ট ও বিষবেগে অভিভূত ব্যক্তি মন্ত্রপ্রভাবে জাগরিত ও বিষমুক্ত হয়। যোগপ্রভাবে যোগীরা সকল ভূমণ্ডল করতলস্থিত বস্তুর ন্যায় দেখিতে পান। ধ্যানপ্রভাবে লোক অনেক কাল জীবিত থাকে। ইহার প্রমাণ আগম, রামায়ণ মহাভারত প্রভৃতি সমুদায় পুরাণে অনেকপ্রকার শাপবৃত্তান্তও বর্ণিত আছে। নহুষ রাজর্ষি অগস্ত্য ঋষির শাপে অজগর হইয়াছিলেন। বশিষ্ঠমুনির পুত্রের শাপে সৌদাস রাক্ষস হয়েন। শুক্রাচার্য্যের শাপে যযাতির যৌবনাবস্থায় জরা উপস্থিত হয়। পিতৃশাপে ত্রিশঙ্কু চণ্ডালকুলে জন্মপরিগ্রহ করেন। অধিক কি, জন্মমরণরহিত ভগবান্ নারায়ণও কখন জমদগ্নির আত্মজ, কখন বা রঘুবংশে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কখন বা মানবের ঔরসে জন্মপরিগ্রহ করিয়া লীলা প্রচার করিয়া থাকেন। অতএব মনুষ্যলোকে দেবতাদিগের উৎপত্তি অলীক বা অসম্ভব নয়। আপনি পূর্ব্বকালীন নৃপগণ অপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন নহেন। চন্দ্রমাও চক্রপাণি অপেক্ষা সমধিক ক্ষমতাবান্ নহেন। তিনি শাপদোষে মহারাজের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিবেন, ইহা নিতান্ত আশ্চর্য্য নয়। বিশেষতঃ স্বপ্নবৃত্তান্ত বিবেচনা করিয়া দেখিলে আর কিছুই সন্দেহ থাকে না। মহিষীর গর্ভে পূর্ণ শশধর প্রবেশ করিতেছে আপনি স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন। আমিও স্বপ্নে পুণ্ডরীক দেখিয়াছিলাম। অমৃতদীধিতির অমৃতের প্রভাব ভিন্ন বিনষ্ট দেহের অবিকার কিরূপে সম্ভবে? এক্ষণে ধৈর্য্য অবলম্বন করুন। শাপও পরিণামে আমাদিগের বর হইবে। আমাদের সৌভাগ্যের পরিসীমা নাই। শাপাবসানে বধূসমেত চন্দ্রাপীড়রূপধারী ভগবান্ চন্দ্রমার মুখচন্দ্র অবলোকন করিয়া জীবন সার্থক হইবে। এ সময় অভ্যুদয়ের সময় শোকতাপের সময় নয় এক্ষণে পুণ্য কর্ম্মের অনুষ্ঠান করুন, শীঘ্র শ্রেয়ঃ হইবে। কর্ম্মের অসাধ্য কিছুই নাই।
