মদলেখা গন্ধর্ব্বনগর হইতে প্রত্যাগত হইয়া কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! তোমার অভীষ্টসিদ্ধি হইয়াছে। মহারাজ ও মহিষী আদ্যোপান্ত সমুদায় শ্রবণ করিয়া সস্নেহে কহিলেন, “বৎসে কাদম্বরি! চন্দ্রসমীপবর্ত্তিনী রোহিণীর ন্যায় তোমাকে জামাতার পার্শ্ববর্ত্তিনী দেখিব ইহা মনে প্রত্যাশা ছিল না। স্বাভিলষিত ভর্ত্তাকে স্বয়ং বরণ করিয়াছ, তিনি আবার চন্দ্রমার অবতার শুনিয়া সাতিশয় আনন্দিত হইলাম। শাপাবসানে জামাতা জীবিত হইলে, তাঁহার সহচারিণী তোমাকে দেখিয়া জীবনের সার্থকতা সম্পাদন করিব। এক্ষণে আকাশবাণীর অনুসারে ধর্ম্ম কর্ম্মের অনুষ্ঠান কর। যাহাতে পরিণামে শ্রেয়ঃ হয় তাহার উপায় দেখ।” মদলেখার মুখে পিতা মাতার স্নেহ সংবলিত মধুর বাক্য শুনিয়া কাদম্বরীর উদ্বেগ দূর হইল।
ক্রমে বর্ষাকাল গত ও শরৎকাল আগত হইল। মেঘের অপগমে দিঙ্মণ্ডল যেন প্রসারিত হইল। মার্তণ্ড প্রচণ্ড কিরণদ্বারা পঙ্কময় পথ শুষ্ক করিয়া দিলেন। নদ, নদী, সরোবর ও পুষ্করিণীর কলুষিত সলিল নির্ম্মল হইল। মরালকুল নদীর সিকতাময় পুলিনে সুমধুর কলরব করিয়া কেলি করিতে লাগিল। গ্রামসীমায় পিঙ্গল কলমঞ্জরী ফলভরে অবনত হইল। শুকসারিকা প্রভৃতি পক্ষিগণ ধান্যশীষ মুখে করিয়া শ্রেণীবদ্ধ হইয়া গগনের উপরিভাগে অপূর্ব্ব শোভা বিস্তার করিল। কাশকুসুম বিকসিত হইল। ইন্দীবর, কহ্লার শেফালিকা প্রভৃতি নানা কুসুমের গন্ধযুক্ত বিশদবারিশীকরসম্পৃক্ত সমীরণ মন্দ মন্দ সঞ্চারিত হইয়া জীবগণের মনে আহ্লাদ জন্মিয়া দিল। সকল অপেক্ষা শশধরের প্রভা ও কমলবনের শোভা উজ্জ্বল হইল। এই কাল কি রমণীয়! লোকের গতায়াতের কোন ক্লেশ থাকে না। যে দিকে নেত্রপাত করা যায়, ধান্যমঞ্জরীর শোভা নয়ন ও মনকে পরিতৃপ্ত করে। জল দেখিলে আহ্লাদ জন্মে! চন্দ্রোদয়ে রজনীর সাতিশয় শোভা হয়। নভোমণ্ডল সর্ব্বদা নির্ম্মল থাকে। ভীষণ বর্ষাকালের অপগমে শরৎকালের মনোহর শোভা দেখিয়া কাদম্বরীর দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তও অনেক সুস্থ হইল।
একদা মেঘনাদ আসিয়া কহিল, দেবি! যুবরাজের বিলম্ব হওয়াতে মহারাজ, মহিষী ও মন্ত্রী অতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া অনেক দূত পাঠাইয়াছেন। আমরা তাহাদিগকে সমুদায় বৃত্তান্ত শ্রবণ করাইয়া বাটী যাইতে অনুরোধ করাতে কহিল, আমরা এক বার যুবরাজের অবিকৃত আকৃতি দেখিতে অভিলাষ করি। এতদূর আসিয়া যদি তদবস্থাপন্ন তাঁহাকে দেখিয়া না যাই, মহারাজ কি বলিবেন, মহিষীকে কি বলিয়া বুঝাইব? এক্ষণে যাহা কর্ত্তব্য করুন। উপস্থিত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিলে শ্বশুরকুলে শোক তাপের পরিসীমা থাকিবে না। এই চিন্তা করিয়া কাদম্বরী অত্যন্ত বিষণ্ণ হইলেন। বাস্পালকু [sic: বাস্পাকুল] লোচনে গদ্গদ বচনে কহিলেন, হাঁ, তাহারা অযুক্ত কথা কহে নাই। যে অদ্ভুত, অলৌকিক ব্যাপার উপস্থিত, ইহা স্বচক্ষে দেখিলেও প্রত্যয় হয় না। না দেখিয়া মহারাজের নিকটে গিয়া তাহারা কি বলিবে? কি বলিয়াই বা মহিষীকে বুঝাইবে? যাঁহাকে ক্ষণমাত্র অবলোকন করিলে আর বিস্মৃত হইতে পারা যায় না, ভৃত্যেরা তাঁহার চিরকালীন স্নেহ কি রূপে বিস্মৃত হইবে? শীঘ্র তাহাদিগকে আনয়ন কর। যুবরাজের অবিকৃত শরীরশোভা দেখিয়া তাহাদিগের আগমনশ্রম সফল হউক। অনন্তর দূতগণ আশ্রমে প্রবেশিয়া কাদম্বরীকে প্রণাম করিল। সজল নয়নে রাজকুমারের অঙ্গসৌষ্ঠব দেখিতে লাগিল। কাদম্বরী কহিলেন, তোমরা স্নেহসুলভ শোকাবেগ পরিত্যাগ কর। নিরবধি দুঃখকেই দুঃখ বলিয়া গণনা করা উচিত; কিন্তু ইহা সেরূপ নয়, ইহাতে পরিণামে মঙ্গলের প্রত্যাশা আছে। এই বিস্ময়কর ব্যাপারে শোকের অবসর নাই। এরূপ ঘটনা কেহ কখন দেখে নাই, শ্রবণও করে নাই। প্রাণবায়ু প্রয়াণ করিলে শরীর অবিকৃত থাকে ইহা আশ্চর্য্যের বিষয়। এক্ষণে তোমরা প্রতিগমন কর। এবং উৎকণ্ঠিতচেতা মহারাজকে এইমাত্র বলিও যে, আমরা অচ্ছোদসরোবরে যুবরাজকে দেখিয়া আসিতেছি। উপস্থিত ঘটনা প্রকাশ করিবার প্রয়োজন নাই। প্রকাশ করিলে মহারাজের কখন বিশ্বাস হইবে না, প্রত্যুত শোকে তাঁহার প্রাণ বিগমের সম্ভাবনা।
দূতেরা কহিল, দেবি! হয় আমরা না যাই, অথবা গিয়া না বলি, ইহা হইলে এই ব্যাপার অপ্রকাশিত থাকিতে পারে; কিন্তু দুই অসম্ভব। বৈশম্পায়নের অন্বেষণ করিতে আসিয়া যুবরাজের বিলম্ব হওয়াতে মহারাজ অতিশয় ব্যাকুল হইয়া আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন। আমরা না যাইলে বিষম অনর্থ ঘটিবার সম্ভাবনা। গিয়া তনয়বার্ত্তাশ্রবণলালস মহারাজ, মহিষী ও শুকনাসের উৎকণ্ঠিত বদন অবলোকন করিলে নির্ব্বিকার চিত্তে স্থির হইয়া থাকিতে পারিব, ইহাও অসম্ভব। কাদম্বরী কহিলেন, হাঁ অলীক কথায় প্রভুকে প্রতারণা করাও পরিচিত ব্যক্তির উচিত নয়, তাহা বুঝিয়াছি। কিন্তু গুরুজনের মনঃপীড়া পরিহারের আশয়ে ঐরূপ বলিয়াছিলাম। যাহা হউক মেঘনাদ! দূতদিগের সমভিব্যাহারে এরূপ একটী বিশ্বস্ত লোক পাঠাইয়া দেও, যে সমুদায় ব্যাপার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছে এবং বিশেষরূপে সমুদায় বিবরণ বলিতে পারিবে। মেঘনাদ কহিল, দেবি! আমরা প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, যত দিন যুবরাজ পুনর্জ্জীবিত না হইবেন তাবৎ বন্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়া বনে বাস করিব; কদাচ পরিত্যাগ করিয়া যাইব না। সেই ভৃত্যেই ভৃত্য, যে সম্পৎকালের ন্যায় বিপৎকালেও প্রভুর সহবাসী হয়। কিন্তু আপনার আজ্ঞা প্রতিপালন করাও আমাদিগের কর্ত্তব্য কর্ম্ম। এই বলিয়া ত্বরিতকনামা এক বিশ্বস্ত সেবককে ডাকাইয়া দূতগণের সমভিব্যাহারে রাজধানী পাঠাইয়া দিল।
