শুকনাস এত বুঝাইলেন, কিন্তু রাজার শোকাচ্ছন্ন মনে প্রবোধের উদয় হইল না। তিনি কহিলেন, শুকনাস! তুমি যাহা বলিলে যুক্তিসিদ্ধ বটে, আমার মন প্রবোধ মানিতেছে না। আমিই যখন ধৈর্য্য অবলম্বন করিতে সমর্থ নহি, মহিষী স্ত্রীলোক হইয়া কি রূপে শোকাবেগ পরিত্যাগ করিবেন। চল, আমরা তথায় যাই, স্বচক্ষে চন্দ্রাপীড়ের অবিকৃত অঙ্গশোভা অবলোকন করি। তাহা হইলে শোকের কিছু শৈথিল্য হইতে পারে। মহিষী কহিলেন, তবে আর বিলম্ব করা নয়। শীঘ্র যাইবার উদ্যোগ করা যাউক। এমন সময়ে এক জন বৃদ্ধ আসিয়া কহিল, দেবি! চন্দ্রাপীড় ও বৈশম্পায়নের নিকট হইতে লোক আসিয়াছে, সংবাদ কি জানিবার নিমিত্ত মনোরমা এই মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে দণ্ডায়মান আছেন। মনোরমার আগমনবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া নরপতি অতিশয় শোকাকুল হইলেন। বাস্পাকুল নয়নে কহিলেন, দেবি! তুমি স্বয়ং গিয়া সমুদায় বৃত্তান্ত তাঁহার কর্ণগোচর কর এবং প্রবোধবাক্যে বুঝাইয়া কহ যে, তিনি আমাদিগের সমভিব্যাহারে তথায় যাইবেন। গমনের সমুদায় আয়োজন হইল। রাজা, মহিষী, মন্ত্রী, মন্ত্রিপত্নী, সকলে চলিলেন। নগরবাসী লোকেরা কেহ বা নরপতির প্রতি অনুরাগবশতঃ কেহ বা চন্দ্রাপীড়ের প্রতি স্নেহযুক্ত, কেহ বা আশ্চর্য্য দেখিবার নিমিত্ত সুসজ্জ হইয়া অনুগমন করিতে প্রস্তুত হইল। রাজা তাহাদিগকে নানাপ্রকার বুঝাইয়া ক্ষান্ত করিলেন। কেবল পরিচারকেরা সঙ্গে চলিল।
কিয়ৎদিন পরে অচ্ছোদ সরোবরের তীরে উপস্থিত হইলেন। তথা হইতে কাদম্বরী ও মহাশ্বেতার নিকট অগ্রে সংবাদ পাঠাইয়া পরে আপনারা আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। গুরুজনের আগমনে লজ্জিত হইয়া মহাশ্বেতা মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশিলেন। কাদম্বরী শোকে বিহ্বল হইয়া মূর্চ্ছাপন্ন হইলেন। নব কিসলয়ের ন্যায় কোমল শয্যায় শয়ন করিয়াও পূর্ব্বে যাঁহার নিদ্রা হইত না, তিনি এক্ষণে এক প্রস্তরের উপর পতিত হইয়া মহানিদ্রায় অভিভূত হইয়াছেন দেখিয়া, মহিষীর শোকের আর পরিসীমা রহিল না। বারংবার আলিঙ্গন, মুখচুম্বন ও মস্তক আঘ্রাণ করিয়া, হা হতাস্মি বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতে লাগিলেন। রাজা বারণ করিয়া কহিলেন, দেবি! জন্মান্তরীণ পুণ্যফলে চন্দ্রাপীড়কে পুত্ত্ররূপে প্রাপ্ত হইয়াছিলাম বটে; কিন্তু ইনি দেবমূর্ত্তি, এ সময়ে স্পর্শ করা উচিত নয়। পুত্ত্র কলত্রাদির বিরহই যাতনাবহ। আমরা স্বচক্ষে চন্দ্রাপীড়ের আনন্দজনক মুখচন্দ্র দেখিতে পাইলাম, আর দুঃখ সন্তাপ কি? যাঁহার প্রভাবে বৎস পুনর্জীবিত হইবেন, যাঁহার প্রভাবে পরিণামে শ্রেয়ঃ হইবে, এক্ষণে একমাত্র অবলম্বন, তোমার বধূ সেই গন্ধর্ব্বরাজপুত্ত্রী শোকে জ্ঞানশূন্যা হইয়াছেন দেখিতেছ না? যাহাতে ইঁহার চৈতন্যোদয় হয় তাহার চেষ্টা পাও! কই! বধূ কোথায়? বলিয়া রাণী সসম্ভ্রমে কাদম্বরীর নিকটে গেলেন এবং ধরিয়া তুলিয়া ক্রোড়ে বসাইলেন। বধূর মুখশশী মহিষী যত বার দেখেন ততই নয়নযুগল হইতে অশ্রুজল নির্গত হয়। তখন বিলাপ করিয়া কহিলেন, আহা! মনে করিয়াছিলাম চন্দ্রাপীড়ের বিবাহ দিয়া পুত্ত্রবধূ লইয়া পরম সুখে কালক্ষেপ করিব, কিন্তু জগদীশ্বরের কি বিড়ম্বনা, পরমপ্রীতিপাত্র সেই বধূর বৈধব্যদশা ও তপস্বিবেশ দেখিতে হইল। হায়! যাহাকে রাজভবনের অধিকারিণী করিব ভাবিয়াছিলাম, তাহাকে বনবাসিনী ও নিতান্ত দুঃখিনী দেখিতে হইল। এই বলিয়া বারংবার বধূর মুখ চুম্বন করিতে লাগিলেন। রাণীর অশ্রুজল ও পাণিতল স্পর্শে কাদম্বরীর চৈতন্যোদয় হইল। তখন নয়ন উন্মীলন পূর্ব্বক লজ্জায় অবনতমুখী হইয়া একে একে গুরুজনদিগকে প্রণাম করিলেন। বৈধব্যদশা শীঘ্র দূর হউক বলিয়া সকলে আশীর্ব্বাদ করিলেন। রাজা মদলেখাকে ডাকিয়া কহিলেন, বৎসে! তুমি বধূর নিকটে গিয়া কহ যে, আমরা কেবল দেখিবার পাত্র আসিয়া দেখিলাম। কিন্তু যেরূপ আচার করিতে হয় এবং এত দিন যেরূপ নিয়মে ছিলেন আমাদিগের আগমনে লজ্জার অনুরোধে যেন তাহার অন্যথা না হয়। বধূ যেন সর্ব্বদা বৎসের নিকটবর্ত্তিনী থাকেন। এই বলিয়া সঙ্গিগণ সমভিব্যাহারে আশ্রমের বহির্গত হইলেন।
আশ্রমের অনতিদূরে এক লতামণ্ডপে বাসস্থান নিরূপণ করিয়া সমুদায় নৃপতিগণকে ডাকাইয়া কহিলেন, ভ্রাতঃ! পূর্ব্বে স্থির করিয়াছিলাম, চন্দ্রাপীড়ের বিবাহ দিয়া তাঁহাকে রাজ্যভার সমর্পণ করিয়া, তৃতীয় আশ্রমে প্রবেশ করিব। এবং জগদীশ্বরের আরাধনায় শেষদশা অতিবাহিত হইবেক। আমার মনোরথ সফল হইল না বটে কিন্তু পুনর্ব্বার সংসারে প্রবেশ করিতে আস্থা নাই। তোমরা সহোদরতুল্য ও পরম সুহৃদ্। নগরে প্রতিগমন করিয়া সুশৃঙ্খল রূপে রাজ্য শাসন ও প্রজা পালন কর। আমি পরলোকে পরিত্রাণ পাইবার উপায় চিন্তা করি। যাহারা পুত্ত্র কিংবা ভ্রাতার প্রতি সংসারভার সমর্পণ করিয়া চরমে পরমেশ্বরের আরাধনা করিতে পারে তাহারাই ধন্য ও সার্থকজন্মা। এই অকিঞ্চিৎকর মাংসপিণ্ডময় শরীর দ্বারা যৎকিঞ্চিৎ ধর্ম্ম উপার্জ্জন হইলেও পরম লাভ বলিতে হইবেক। ধর্ম্মসঞ্চয় ব্যতিরেকে পরলোকে পরিত্রাণের উপায়ান্তর নাই। তোমরা এক্ষণে বিদায় হও এবং আপন আপন আলয়ে গমন করিয়া সুখে রাজ্যভোগ কর। আমি এই স্থানেই জীবনক্ষেপ করিব, মানস করিয়াছি। এই বলিয়া সকলকে বিদায় করিলেন এবং তদবধি তপস্বিবেশে জগদীশ্বরের আরাধনায় অনুরক্ত হইলেন। তরুমূলে হর্ম্ম্যবুদ্ধি, হরিণশাবকে সুতস্নেহ সংস্থাপন পূর্ব্বক সস্ত্রীক শুকনাস সহিত প্রতি দিন চন্দ্রাপীড়ের মুখচন্দ্র দর্শন করিয়া সুখে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন।
