মহাশ্বেতা কপিঞ্জলের কথা শুনিয়া, হা দেব! জন্মান্তরেও তুমি আমার প্রণয়ানুরাগ বিস্মৃত হইতে পার নাই। আমারই অন্বেষণ করিতে করিতে এই স্থানে আগমন করিয়াছিলে; আমি নৃশংসা রাক্ষসী বারংবার তোমার বিনাশের হেতুভূত হইলাম। দগ্ধবিধি আমাকে আপন প্রয়োজন সম্পাদনের সাধন করিবে বলিয়াই কি এত দীর্ঘ পরমায়ু প্রদান পূর্ব্বক আমার নির্ম্মাণ করিয়াছিল! কপিঞ্জল প্রবোধবাক্যে কহিলেন, গন্ধর্ব্বরাজপুত্ত্রি! শাপদোষে সেই সেই ঘটনা হইয়াছে, তোমার দোষ কি? এক্ষণে যাহাতে পরিণামে শ্রেয়ঃ হয়, তাহার চেষ্টা পাও। যে ব্রত অঙ্গীকার করিয়াছ, তাহাতেই একান্ত অনুরক্ত হও। তপস্যার অসাধ্য কিছুই নাই। পার্ব্বতী যেরূপ তপস্যার প্রভাবে পশুপতির প্রণয়িনী হইয়াছেন, তুমিও সেইরূপ পুণ্ডরীকের সহধর্ম্মিণী হইবে, সন্দেহ করিও না। কপিঞ্জলের সান্ত্ত্বনাবাক্যে মহাশ্বেতা ক্ষান্ত হইলেন। কাদম্বরী বিষণ্ণ বদনে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্! পত্রলেখাও ইন্দ্রায়ুধের সহিত জলপ্রবেশ করিয়াছিল। শাপগ্রস্ত ইন্দ্রায়ুধরূপ পরিত্যাগ করিয়া আপনি স্বরূপ প্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু পত্রলেখা কোথায় গেল, শুনিতে অতিশয় কৌতুক জন্মিয়াছে, অনুগ্রহ করিয়া ব্যক্ত করুন। কপিঞ্জল কহিলেন, জলপ্রবেশানন্তর যে যে ঘটনা হইয়াছে তাহা আমি অবগত নহি। চন্দ্রের অবতার চন্দ্রাপীড় ও পুণ্ডরীকের অবতার বৈশম্পায়ন কোথায় জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং পত্রলেখা কোথা গিয়াছে, জানিবার নিমিত্ত কালত্রয়দর্শী ভগবান্ শ্বেতকেতুর নিকট গমন করি। এই বলিয়া কপিঞ্জল গগনমার্গে উঠিলেন।
তিনি প্রস্থান করিলে রাজপরিজনেরা বিস্ময়ে শোক সন্তাপ বিস্মৃত হইল। চন্দ্রাপীড়ের ও বৈশম্পায়নের পুনরুজ্জীবন পর্য্যন্ত এই স্থানে থাকিতে হইবেক স্থির করিয়া বাসস্থান নিরূপণ করিল ও তথায় অবস্থিতি করিতে লাগিল। কাদম্বরী মহাশ্বেতাকে কহিলেন, প্রিয়সখি! বিধাতা এই হতভাগিনীদিগকে দুঃখের সমান অংশভাগিনী করিয়া পরস্পর দৃঢ়তর সখ্যবন্ধন করিয়া দিলেন। আজি তোমাকে প্রিয়সখী বলিয়া সম্বোধন করিতে লজ্জা বোধ হইতেছে না। ফলতঃ এত দিনের পর আজি আমি তোমার যথার্থ প্রিয়সখী হইলাম। এক্ষণে কর্ত্তব্য কি উপদেশ দাও। কি করিলে শ্রেয়ঃ হইবে কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। মহাশ্বেতা উত্তর করিলেন, প্রিয়সখি! কি উপদেশ দিব! আশাকে কেহ অতিক্রম করিতে পারে না। আশা লোকদিগকে যে পথে লইয়া যায়, লোকেরা সেই পথে যায়। আমি কেবল কথামাত্রের আশ্বাসে প্রাণত্যাগ করিতে পারি নাই। তুমি ত কপিঞ্জলের মুখে সমুদায় বৃত্তান্ত বিশেষ রূপে অবগত হইলে। যাবৎ চন্দ্রাপীড়ের শরীর অবিকৃত থাকে, তাবৎ ইহার রক্ষণাবেক্ষণ কর। শুভ ফল প্রাপ্তির আশয়ে লোকে অপ্রত্যক্ষ দেবতার কাষ্ঠময়, মৃন্ময়, প্রস্তরময় প্রতিমাও পূজা করিয়া থাকে। তুমি ত প্রত্যক্ষ দেবতা চন্দ্রমার সাক্ষাৎ মূর্ত্তি লাভ করিয়াছ। তোমার ভাগ্যের পরিসীমা নাই এক্ষণে যত্ন পূর্ব্বক রক্ষা ও ভক্তিভাবে পরিচর্য্যা কর।
মদলেখা ও তরলিকা ধরাধরি করিয়া শীত, বাত, আতপ ও বৃষ্টির জল না লাগে এমন স্থানে, এক শিলার উপরে চন্দ্রাপীড়ের মৃত দেহ আনিয়া রাখিল। যিনি নানা বেশভূষায় ভূষিত হইয়া হর্ষোৎফুল্ল লোচনে প্রিয়তমের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন, তাঁহাকে এক্ষণে দীন বেশে ও দুঃখিত চিত্তে তপস্বিনীর আকার অঙ্গীকার করিতে হইল! বিকসিত কুসুম, সুগন্ধি চন্দন, সুরভি ধূপ, যাহা উপভোগের প্রধান সামগ্রী ছিল, তাহা এক্ষণে দেবার্চ্চনায় নিযুক্ত হইল। এক্ষণে নির্ঝরবারি দর্পণ, গিরিগুহা গৃহ, লতা সখী, বৃক্ষগণ রক্ষক, তরুশাখা চন্দ্রাতপ ও কেকারব তন্ত্রীঝঙ্কার হইল। দূর হইতে আগমন করাতে ও সহসা সেই দুঃসহ শোকানলে পতিত হওয়াতে কাদম্বরীর কণ্ঠ শুষ্ক হইয়াছিল; তথাপি পান ভোজন কিছুই করিলেন না। সরোবরে স্নান করিয়া পবিত্র দুকূল পরিধান করিলেন এবং প্রিয়তমের পাদদ্বয় অঙ্কে ধারণ করিয়া দিবস অতিবাহিত করিলেন। রজনী সমাগত হইল। একে বর্ষাকাল, তাহাতে অন্ধকারাবৃত রজনী। চতুর্দ্দিকে মেঘ, মূষলধারে বৃষ্টি, ক্ষণে ক্ষণে বজ্রের নির্ঘাত ও মধ্যে মধ্যে বিদ্যুতের দুঃসহ আলোক। খদ্যোতমালা অন্ধকারাচ্ছন্ন তরুমণ্ডলীকে আবৃত করিয়া আরও ভয়ঙ্কর করিল। গিরিনির্ঝরের পতনশব্দ, ভেকের কোলাহল ও ময়ূরের কেকারবে বন আকুল হইল। কিছুই দেখা যায় না। কিছুই কর্ণগোচর হয় না। কি ভয়ানক সময়! এ সময়ে জনপদবাসী সাহসী পুরুষের মনেও ভয়সঞ্চার হয়; কিন্ত কাদম্বরী সেই অরণ্যে প্রিয়তমের মৃতদেহ সম্মুখে রাখিয়া সেই ভয়ঙ্করী বর্ষাবিভাবরী যাপিত করিলেন।
প্রভাতে অরুণ উদিত হইলে প্রিয়তমের শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কিছুমাত্র বিশ্রী হয় নাই; বরং অধিক উজ্জ্বল বোধ হইতেছে। তখন আহ্লাদিত চিত্তে মদলেখাকে কহিলেন, মদলেখে! দেখ, দেখ! প্রাণেশ্বরের শরীর যেন সজীব বোধ হইতেছে। মদলেখা নিমেষশূন্য নয়নে অনেক ক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! জীবনবিরহে এই দেহ কেবল চেষ্টাশূন্য; নতুবা সেই রূপ, সেই লাবণ্য, কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য হয় নাই। কপিঞ্জল যে শাপবিবরণ বর্ণন করিয়া গেলেন এবং আকাশবাণী দ্বারা যাহা ব্যক্ত হইয়াছে, তাহা সত্য, সংশয় নাই। কাদম্বরী আনন্দিত মনে মহাশ্বেতাকে, তদনন্তর চন্দ্রাপীড়ের সঙ্গিগণকে সেই শরীর দেখাইলেন। সঙ্গিগণ বিস্ময়বিকসিত নয়নে যুবরাজের শরীরশোভা দেখিতে লাগিল। কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, দেবি! মৃত দেহ অবিকৃত থাকে, ইহা আমরা কখন দেখি নাই, শ্রবণও করি নাই। ইহা অতি আশ্চর্য্য ব্যাপার সন্দেহ নাই। এক্ষণে আপনার প্রভাববলে ও তপস্যার ফলে যুবরাজ পুনর্জীবিত হইলে সকলে চরিতার্থ হই। পর দিনও সেইরূপ উজ্জ্বল শরীরসৌষ্ঠব দেখিয়া আকাশবাণীর কোন অংশে আর সংশয় রহিল না। তখন কাদম্বরী কহিলেন, মদলেখে! আশার শেষ পর্য্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করিতে হইবেক। অতএব তুমি বাটী যাও ও এই বিস্ময়াবহ ব্যাপার পিতা মাতার কর্ণগোচর কর। তাঁহারা যাহাতে বিরূপ না ভাবেন, দুঃখিত না হন এবং এখানে না আইসেন, এরূপ করিও। এখানে আসিলে তাঁহাদিগকে দেখিয়া শোকাবেগ ধারণ করিতে পারিব না। সেই বিষম সময়ে অমঙ্গলভয়ে আমার নেত্রযুগল হইতে অশ্রুজল বহির্গত হয় নাই। এক্ষণে জীবিতনাথের পুনঃপ্রাপ্তিবিষয়ে নিঃসন্দিগ্ধচিত্ত হইয়াও কেন বৃথা রোদন দ্বারা প্রিয়তমের অমঙ্গল ঘটাইব? এই বলিয়া মদলেখাকে বিদায় করিলেন।
