তিনি আমাদিগের কথায় কিছুই প্রত্যুত্তর দিলেন না, চিত্রপুত্তলিকার ন্যায় অনিমিষ নয়নে সেই লতামণ্ডপ দেখিতে লাগিলেন। পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করাতে রোষ ও অসন্তোষ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন, আমি এখান হইতে যাইব না। তোমরা স্কন্ধাবার লইয়া চলিয়া যাও। তাঁহার এই কথার ভাবার্থ কিছু বুঝিতে না পারিয়া নানা অনুনয় করিলাম ও কহিলাম, দেব চন্দ্রাপীড় আপনাকে স্কন্ধাবার লইয়া যাইবার ভার দিয়া বাটী গমন করিয়াছেন; অতএব আপনার এখানে বিলম্ব করা অবিধেয়। আপনি বৈরাগ্যের কথা কহিতেছেন কেন? এই জনশূন্য অরণ্যে আপনাকে একাকী পরিত্যাগ করিয়া গেলে যুবরাজ আমাদিগকে কি বলিবেন? আজি আপনার এরূপ চিত্তবিভ্রম দেখিতেছি কেন? যদি আমাদিগের কোন অপরাধ হইয়া থাকে, ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। এক্ষণে স্নান করুন। তিনি কহিলেন, তোমরা কি নিমিত্ত আমাকে এত প্রবোধ দিতেছ। আমি চন্দ্রাপীড়কে না দেখিয়া এক দণ্ড থাকিতে পারি না, ইহা অপেক্ষা আর আমার শীঘ্র গমনের কারণ কি আছে? কিন্তু এই স্থানে আসিয়া ও এই লতামণ্ডপ দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইয়াছে ও ইন্দ্রিয় বিকল হইয়া আসিতেছে যাইবার আর সামর্থ্য নাই। যদি তোমরা বলপূর্ব্বক লইয়া যাও, বোধ হয় এখান হইতে না যাইতে যাইতেই আমার প্রাণ দেহ হইতে বহির্গত হইবেক। আমাকে লইয়া যাইবার আর আগ্রহ করিও না। তোমরা স্কন্ধাবার সমভিব্যাহারে বাটী গমন কর ও চন্দ্রাপীড়ের মুখচন্দ্র অবলোকন করিয়া সুখী হও। আমার আর সে মুখারবিন্দ দেখিবার সম্ভাবনা নাই। এরূপ কি পুণ্যকর্ম্ম করিয়াছি যে, চিরকাল সুখে কাল ক্ষেপ করিব!
অকস্মাৎ আপনার এ আবার কি ব্যামোহ উপস্থিত হইল? এই কথা জিজ্ঞাসা করাতে কহিলেন, আমি শপথ করিয়া বলিতেছি ইহার কারণ কিছু জানি না। তোমাদিগের সঙ্গেই এই প্রদেশে আসিয়াছি। তোমাদিগের সমক্ষেই এই লতামণ্ডপ দর্শন করিতেছি। জানি না, কি নিমিত্ত আমার মন এরূপ চঞ্চল হইল। এই কথা বলিয়া তথা হইতে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক যেরূপ লোক অনন্যদৃষ্টি হইয়া নষ্ট বস্তুর অন্বেষণ করে, সেইরূপ লতাগৃহে, তরুতলে, তীরে ও মন্দিরে ভ্রমণ করিয়া যেন, অপহৃত অভীষ্ট সামগ্রীর অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। আমরা আহার করিতে অনুরোধ করিলে কহিলেন, আমার প্রাণ আপন প্রাণ অপেক্ষাও চন্দ্রাপীড়ের প্রিয়তর। সুতরাং সুহৃদের সন্তোষের নিমিত্ত অবশ্য রক্ষা করিতে হইবেক। এই কথা বলিয়া সরোবরে স্নান করিয়া যৎকিঞ্চিৎ ফলমূল ভক্ষণ করিলেন। এইরূপে তিন দিন অতিবাহিত হইল। আমরা প্রতিদিন নানাপ্রকার বুঝাইতে লাগিলাম। কিছুতেই চঞ্চল চিত্তকে স্থির করিতে পারিলেন না। পরিশেষে তাঁহার আগমন ও আনয়ন বিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়া কতিপয় সৈন্য তাঁহার নিকটে রাখিয়া, আমরা স্কন্ধাবার লইয়া আসিতেছি। রাজকুমারের অতিশয় ক্লেশ হইবে বলিয়া পূর্ব্বে এ সংবাদ পাঠান যায় নাই।
অসম্ভবনীয় ও অচিন্তনীয় বৈশম্পায়নবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া চন্দ্রাপীড় বিস্মিত ও উদ্বিগ্নচিত্ত হইলেন। মনে মনে চিন্তা করিলেন, প্রিয়সখার অকস্মাৎ এরূপ বৈরাগ্যের কারণ কি? আমি ত কখন কোন অপরাধ করি নাই। কখন অপ্রিয় কথা কহি নাই। অন্যে অপরাধ করিবে ইহাও সম্ভব নহে। তৃতীয় আশ্রমেরও এ সময় নয়। তিনি অদ্যাপি গৃহস্থাশ্রমে প্রবিষ্ট হন নাই। দেব পিতৃ ঋষি ঋণ হইতে অদ্যাপি মুক্ত হন নাই। এরূপ অবিবেকী নহেন যে, কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া মূর্খের ন্যায় উন্মার্গগামী হইবেন। এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে এক পটগৃহে প্রবেশিয়া শয্যায় শয়ন করিলেন। ভাবিলেন যদি বাটীতে না গিয়া এইখান হইতে প্রিয়সুহৃদের অন্বেষণে যাই, তাহা হইলে পিতা, মাতা, শুকনাস ও মনোরমা এই বৃত্তান্ত শুনিয়া ক্ষিপ্তপ্রায় হইবেন। তাঁহাদিগের অনুজ্ঞা লইয়া এবং শুকনাস ও মনোরমাকে প্রবোধবাক্যে আশ্বাস প্রদান করিয়া বাটী হইতে বন্ধুর অন্বেষণে যাওয়াই কর্ত্তব্য। যাহা হউক, বন্ধু অন্যায় কর্ম্ম করিয়াও আমার পরম উপকার করিলেন, আমার মনোরথ সম্পাদনের বিলক্ষণ সুযোগ হইল। এই অবসরে প্রিয়তমাকে দেখিতে পাইব। এই রূপে প্রিয়সুহৃদের বিরহবেদনাকেও পরিণামে শুভ ও সুখের হেতু জ্ঞান করিয়া দুঃখে নিতান্ত নিমগ্ন হইলেন না। স্বয়ং যাইলেই প্রিয়সুহৃৎকে আনিতে পারিবেন এই বিশ্বাস থাকাতে নিতান্ত কাতরও হইলেন না।
অনন্তর আহারাদি সমাপন করিয়া পটগৃহের বহির্গত হইলেন। দেখিলেন সূর্য্যদেব অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় কিরণ বিস্তার করিতেছেন। গগনে দৃষ্টিপাত করা কাহার সাধ্য। একে নিদাঘকাল, তাহাতে বেলা ঠিক্ দুই প্রহর, চতুর্দ্দিকে মাঠ ধূ ধূ করিতেছে। দিঙ্মণ্ডল যেন জ্বলিতেছে, বোধ হয়। পক্ষিগণ নিস্তব্ধ হইয়া নীড়ে অবস্থিতি করিতেছে। কিছুই শুনা যায় না, কেবল চাতকের কাতর স্বর এক এক বার শ্রবণগোচর হয়। মহিষকুল পঙ্কশেষ পল্বলে পড়িয়া আছে। পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হরিণ ও হরিণীগণ সূর্য্যকিরণে জলভ্রম হওয়াতে ইতস্ততঃ দৌড়িতেছে, কুক্কুরগণ বারংবার জিহ্বা বহির্গত করিতেছে। গ্রীষ্মের প্রভাবে বায়ু উত্তপ্ত হইয়া অনলের ন্যায় গাত্রে লাগিতেছে। গাত্র হইতে অনবরত ঘর্ম্মবারি বিনির্গত হইতেছে। রাজকুমার জলসেচন দ্বারা আপনার বাসগৃহ শীতল করিয়া তথায় বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। গ্রীষ্মকালে দিবসের শেষভাগ অতি রমণীয়। সূর্য্যের উত্তাপ থাকে না। মন্দ মন্দ সন্ধ্যাসমীরণ অমৃতবৃষ্টির ন্যায় শরীরে সুখস্পর্শ বোধ হয়। এই সময় সকলে গৃহের বহির্গত হইয়া সুশীতল সমীরণ সেবন করে, প্রফুল্ল অন্তঃকরণে তরুগণের শ্যামল শোভা দেখিয়া এবং দিঙ্মণ্ডলের শোভা দেখিয়া সাতিশয় আনন্দিত হয়। রাজকুমার সন্ধ্যাকালে পটগৃহের বহির্গত হইলেন এবং আকাশমণ্ডলের চমৎকার শোভা দেখিতে লাগিলেন। নিশীথসময়ে চন্দ্রোদয়ে পৃথিবী জ্যোৎস্নাময় হইলে প্রয়াণ-সূচক শঙ্খধ্বনি হইল। স্কন্ধাবারস্থিত সেনাগণ উজ্জয়িনীদর্শনে সাতিশয় উৎসুক ছিল। শঙ্খধ্বনি শুনিবামাত্র অমনি সুসজ্জ হইয়া গমন করিতে আরম্ভ করিল। যামিনী প্রভাত হইবার সময় স্কন্ধাবার উজ্জয়িনীতে আসিয়া পঁহুছিল। বৈশম্পায়নের বৃত্তান্ত নগরে পূর্ব্বেই প্রচারিত হইয়াছিল। পৌরজনেরা রাজকুমারকে দেখিয়া, হতোঽস্মি! বলিয়া রোদন করিতে লাগিল। রাজকুমার ভাবিলেন, পৌরজনেরা যখন এরূপ বিলাপ করিতেছে, না জানি পুত্ত্রশোকে মনোরমা ও শুকনাসের কত দুঃখ ক্লেশ হইয়া থাকিবেক।
