ক্রমে রাজবাটীর দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া অশ্ব হইতে অবতীর্ণ হইলেন। রাজা বাটীতে নাই, মহিষীর সহিত শুকনাসের ভবনে গিয়াছেন, এই কথা শুনিয়া তথা হইতে মন্ত্রীর ভবনে গমন করিলেন। দেখিলেন, সকলেই বিষণ্ণ। “হা বৎস! নির্ম্মানুষ, ব্যালসঙ্কুল, ভীষণ গহনে কি রূপে আছ! ক্ষুধার সময় কাহার নিকট খাদ্য দ্রব্য প্রার্থনা করিতেছ! তৃষ্ণার সময় কে জলদান করিতেছে! যদি তোমার নির্জ্জন বনে বাস করিবার অভিলাষ ছিল, কেন আমারে সঙ্গে করিয়া লইয়া যাও নাই? বাল্যাবধি কখন তোমার মুখ কুপিত দেখি নাই, অকস্মাৎ ক্রোধোদয় কেন হইল? এরূপ বৈরাগ্যের কারণ কি? তোমার সেই প্রফুল্ল মুখকমল না দেখিয়া আমি আর জীবন ধারণ করিতে সমর্থ নহি।” মনোরমা কাতরস্বরে অন্তঃপুরে এইরূপ নানা প্রকার বিলাপ করিতেছেন, শুনিতে পাইলেন। অনন্তর বিষণ্ণ বদনে মহারাজ ও শুকনাসকে প্রণাম করিয়া আসনে বসিলেন।
রাজা কহিলেন, বৎস চন্দ্রাপীড়! তোমার সহিত বৈশম্পায়নের যে প্রণয় তাহা বিলক্ষণ অবগত আছি। কিন্তু তাঁহার এই অনুচিত কর্ম্ম দেখিয়া আমার অন্তঃকরণ তোমার দোষ সম্ভাবনা করিতেছে। রাজার কথা সমাপ্ত না হইতে শুকনাস কহিলেন, দেব! যদি শশধরে উষ্ণতা, অমৃতে উগ্রতা ও হিমে দাহ্যশক্তি জন্মে, তথাপি নির্দ্দোষস্বভাব চন্দ্রাপীড়ের দোষশঙ্কা হইতে পারে না। একের অপরাধে অন্যকে দোষী জ্ঞান করা অতি অন্যায় কর্ম্ম। মাতৃদ্রোহী, পিতৃঘাতী, কৃতঘ্ন, দুরাচার, দুষ্কর্ম্মান্বিতের দোষে সুশীল চন্দ্রাপীড়ের দোষ সম্ভাবনা করা উচিত নয়। যে পিতা মাতার অপেক্ষা করিল না, রাজাকে গ্রাহ্য করিল না, মিত্রতার অনুরোধ রাখিল না, চন্দ্রাপীড় তাহার কি করিবেন? তাহার কি একবারও ইহা মনে হইল না যে, আমি পিতা মাতার একমাত্র জীবননিবন্ধন, আমাকে না দেখিয়া কি রূপে তাঁহারা জীবন ধারণ করিবেন। এক্ষণে বুঝিলাম কেবল আমাদিগকে দুঃখ দিবার নিমিত্তই সে ভূতলে জন্ম গ্রহণ করিয়ছিল। বলিতে বলিতে শোকে শুকনাসের অধর স্ফুরিত ও গণ্ডস্থল অশ্রু জলে পরিপ্লুত হইল। রাজা তাঁহার সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া কহিলেন, অমাত্য! যেরূপ খদ্যোতের আলোক দ্বারা অনলপ্রকাশ, অনল দ্বারা রবির প্রকাশ, অস্মদ্বিধ ব্যক্তি কর্ত্তৃক তোমার পরিবোধনও সেইরূপ। কিন্তু বর্ষাকালীন জলাশয়ের ন্যায় তোমার মন কলুষিত হইয়াছে। কলুষিত মনে বিবেকশক্তি স্পষ্ট রূপে প্রকাশিত হয় না। সে সময়ে অদূরদর্শীও দীর্ঘদর্শীকে অনায়াসে উপদেশ দিতে পারে। অতএব আমার কথা শুন। এই ভূমণ্ডলে এমন লোক অতি বিরল, যাহার যৌবনকাল নির্ব্বিকার ও নির্দ্দোষে অতিক্রান্ত হয়। যৌবনকাল অতি বিষম কাল। এই কালে উত্তীর্ণ হইলে শৈশবের সহিত গুরুজনের প্রতি স্নেহ বিগলিত হয়। বক্ষঃস্থলের সহিত বাঞ্ছা বিস্তীর্ণ বাহুযুগলের সহিত বুদ্ধি স্থূল হয়। মধ্যভাগের সহিত বিনয় ক্ষীণ হয়। এবং অকারণেই বিকারের আবির্ভাব হয়। বৈশম্পায়নের কোন দোষ নাই, ইহা কালের দোষ। কি জন্য তাহার বৈরাগ্যোদয় হইল, তাহা বিশেষ রূপে না জানিয়া দোষার্পণ করাও বিধেয় নয়। অগ্রে তাহাকে আনয়ন করা যাউক। তাহার মুখে সমুদায় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া যাহা কর্ত্তব্য, পরে করা যাইবেক। শুকনাস কহিলেন, মহারাজ! বাৎসল্য প্রযুক্ত এরূপ কহিতেছেন। নতুবা, যাহার সহিত একত্র বাস, একত্র বিদ্যাভ্যাস ও পরম সৌহার্দ্দে কালযাপন হইয়াছে, পরম প্রীতিপাত্র সেই মিত্রের কথা অগ্রাহ্য করা অপেক্ষা আর কি অধিক অপরাধ হইতে পারে?
চন্দ্রাপীড় নিতান্ত দুঃখিত হইয়া বিনয় বচনে কহিলেন, তাত! এ সকল আমারই দোষ, সন্দেহ নাই। এক্ষণে অনুমতি করুন, আমি স্বীয় পাপের প্রায়শ্চিত্তের নিমিত্ত, অচ্ছোদসরোবরে গমন করি এবং বৈশম্পায়নকে নিবৃত্ত করিয়া আনি। অনন্তর পিতা মাতা, শুকনাস ও মনোরমার নিকট বিদায় লইয়া ইন্দ্রায়ুধে আরোহণ পূর্ব্বক বন্ধুর অন্বেষণে চলিলেন। শিপ্রানদীর তীরে সে দিন অবস্থিতি করিয়া রজনী প্রভাত না হইতেই সমভিব্যাহারী লোকদিগকে গমনের আদেশ দিলেন; আপনি অগ্রে অগ্রে চলিলেন। যাইতে যাইতে মনে মনে কত মনোরথ করিতে লাগিলেন। সুহৃদের অজ্ঞাতসারে তথায় উপস্থিত হইয়া সহসা কণ্ঠধারণ পূর্ব্বক কোথায় পলায়ন করিতেছ বলিয়া প্রিয়সখার লজ্জা ভঞ্জন করিয়া দিব। তদনন্তর মহাশ্বেতার আশ্রমে উপস্থিত হইব। তিনি আমাকে দেখিয়া সাতিশয় আহ্লাদিত হইবেন, সন্দেহ নাই। মহাশ্বেতার আশ্রমে সৈন্য সামন্ত রাখিয়া হেমকূটে গমন করিব। তথায় প্রিয়তমার প্রফুল্ল মুখকমল দর্শনে নয়নযুগল চরিতার্থ করিব ও মহাসমারোহে তাঁহার পাণিগ্রহণ করিয়া জীবন সফল ও আত্মাকে পরিতৃপ্ত করিব। অনন্তর প্রিয়তমার অনুমতি লইয়া মদলেখার সহিত পরিণয় সম্পাদন দ্বারা বন্ধুর সংসারবৈরাগ্য নিবারণ করিয়া দিব। এইরূপ মনোরথ করিতে করিতে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, পথশ্রম ও জাগরণ জন্য ক্লেশকে ক্লেশবোধ না করিয়া দিন যামিনী গমন করিতে লাগিলেন।
পথে বর্ষাকাল উপস্থিত। নীলবর্ণ মেঘমালায় গগনমণ্ডল আচ্ছাদিত হইল। দিনকর আর দৃষ্টিগোচর হয় না। চতুর্দ্দিকে মেঘ, দশ দিক্ অন্ধকার। দিবা রাত্রির কিছুই বিশেষ রহিল না। ঘনঘটার ঘোরতর গভীর গর্জ্জন ও ক্ষণপ্রভার দুঃসহ প্রভা ভয়ানক হইয়া উঠিল। মধ্যে মধ্যে বজ্রাঘাত ও শিলাবৃষ্টি। অনবরত মূষলধারে বৃষ্টি হওয়াতে, নদী সকল বর্দ্ধিত হইয়া উভয় কূল ভগ্ন করিয়া ভীষণ বেগে প্রবাহিত হইল। সরোবর, পুষ্করিণী, নদ, নদী পরিপূর্ণ হইয়া গেল। চতুর্দ্দিক জলময় ও পথ পঙ্কময়। ময়ূর ও ময়ূরীগণ আহ্লাদে পুলকিত হইয়া নৃত্য আরম্ভ করিল। কদম্ব, মালতী, কেতকী, কুটজ প্রভৃতি নানাবিধ তরু ও লতার বিকসিত কুসুম আন্দোলিত করিয়া নবসলিলসিক্ত বসুন্ধরার মৃদগন্ধ বিস্তার পূর্ব্বক ঝাঞ্ঝাবায়ু উৎকলাপ শিখিকুলের শিখাকলাপে আঘাত করিতে লাগিল। কোন দিকে কেকারব, কোন দিকে ভেকরব, গগনে চাতকের কলরব, চতুর্দ্দিকে ঝঞ্ঝাবায়ু ও বৃষ্টিধারার গভীর শব্দ এবং স্থানে স্থানে গিরিনির্ঝরের পতনশব্দ। গগনমণ্ডলে আর চন্দ্রমা দৃষ্টিগোচর হয় না। নক্ষত্রগণ আর দেখিতে পাওয়া যায় না। এইরূপে বর্ষাকাল উপস্থিত হইয়া কালসর্পের ন্যায় চন্দ্রাপীড়ের পথরোধ করিল। ইন্দ্রচাপে তড়িদ্ গুণ সংযোগ করিয়া গভীর গর্জ্জন পূর্ব্বক বারিরূপ শর বৃষ্টি করিতে লাগিল। তড়িৎ যেন তর্জ্জন করিয়া উঠিল। বর্ষাকাল সমাগত দেখিয়া, চন্দ্রাপীড় সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইলেন। ভাবিলেন, এ আবার কি উৎপাত; আমি প্রিয় সুহৃৎ ও প্রিয়তমার সমাগমে সমুৎসুক হইয়া, প্রাণপণে ত্বরা করিয়া যাইতেছি। কোথা হইতে জলদকাল দশ দিক্ অন্ধকার করিয়া বৈরনির্যাতনের আশয়ে উপস্থিত হইল? অথবা, বিদ্যুতের আলোকে পথ আলোকময় করিয়া, মেঘরূপ চন্দ্রাতপ দ্বারা রৌদ্র নিবারণ করিয়া, আমার সেবার নিমিত্তই বুঝি, জলদকাল সমাগত হইয়াছে। এই সময় পথ চলিবার সময়। এই স্থির করিয়া গমন করিতে আরম্ভ করিলেন।
