প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক বহির্গত হইয়া শুনিলেন, স্কন্ধাবার দশপুরী পর্য্যন্ত আসিয়াছে। শত শত সাম্রাজ্যলাভেও যেরূপ সন্তোষ না হয়, এই সংবাদ শুনিয়া তাদৃশ আহ্লাদ জন্মিল। হর্ষোৎফুল্ল নয়নে কেয়ূরককে কহিলেন, কেয়ূরক! আমার পরম মিত্র বৈশম্পায়ন আসিতেছেন, আর চিন্তা নাই। কেয়ূরক সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া কহিল, রাজকুমার! মেঘোদয়ে যেরূপ বৃষ্টির অনুমান হয়, পূর্ব্বদিকে আলোক দেখিলে যেরূপ রবির উদয় জানা যায়, মলয়ানিল বহিলে যেরূপ বসন্ত কালের সমাগম বোধ হয়, কাশকুসুম বিকসিত হইলে যেরূপ শরদারম্ভ সূচিত হয়, সেইরূপ এই শুভ ঘটনা অচিরাৎ আপনার গন্ধর্ব্বনগরে গমনের সূচনা করিতেছে। গন্ধর্ব্বরাজকুমারী কাদম্বরীর সহিতও আপনার সমাগম সম্পন্ন হইবেক, সন্দেহ করিবেন না। কেহ কখন কি চন্দ্রমাকে জ্যোৎস্নারহিত হইতে দেখিয়াছে? লতাশূন্য উদ্যান কি কখন কাহারও দৃষ্টিপথে পতিত হইয়াছে? কিন্তু বৈশম্পায়ন আসিতে ও তাঁহার সহিত পরামর্শ করিয়া আপনার গন্ধর্ব্বনগরে যাত্রা করিতে বিলম্ব হইবে বোধ হয়। কাদম্বরীর যেরূপ শরীরের অবস্থা তাহা রাজকুমারকে পূর্ব্বেই নিবেদন করিয়াছি, অতএব আমি অগ্রসর হইয়া আপনার আগমনবার্ত্তা দ্বারা তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করিতে অভিলাষ করি।
কেয়ূরকের ন্যায়ানুগত মধুর বাক্য শুনিয়া চন্দ্রাপীড় পরম পরিতুষ্ট হইলেন। কহিলেন, কেয়ূরক! ভাল যুক্তিযুক্ত কথা বলিয়াছ। এতাদৃশী দেশকালজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা কাহারও দেখিতে পাওয়া যায় না। তুমি শীঘ্র গমন কর এবং আমাদিগের কুশল সংবাদ ও আগমনবার্ত্তা দ্বারা প্রিয়তমার প্রাণ রক্ষা কর। প্রত্যয়ের নিমিত্ত পত্রলেখাকেও তোমার সহিত পাঠাইয়া দিতেছি। পরে মেঘনাদকে ডাকাইয়া কহিলেন, মেঘনাদ! পূর্ব্বে তোমাকে যে স্থানে রাখিয়া আসিয়াছিলাম, পত্রলেখা ও কেয়ূরককে সমভিব্যাহারে লইয়া পুনর্ব্বার তথায় যাও। শুনিলাম বৈশম্পায়ন আসিতেছেন, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আমিও তথায় যাইতেছি! মেঘনাদ যে আজ্ঞা বলিয়া গমনের উদ্যোগ করিতে গেল। রাজকুমার কেয়ূরককে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া বহুমূল্যের কর্ণাভরণ পারিতোষিক দিলেন। বাষ্পাকুল লোচনে কহিলেন, কেয়ূরক! তুমি প্রিয়তমার কোন সন্দেশবাক্য আনিতে পার নাই, সুতরাং প্রতিসন্দেশ তোমাকে কি বলিয়া দিব। পত্রলেখা যাইতেছে ইহার মুখে প্রিয়তমার যাহা শুনিতে ইচ্ছা হয় শুনিবেন। পত্রলেখাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, পত্রলেখে! তুমি সাবধানে যাইবে। গন্ধর্ব্বনগরে পঁহুছিয়া আমার নাম করিয়া কাদম্বরীকে কহিবে যে, আমি বাটী আসিবার কালে তোমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসিতে পারি নাই তজ্জন্য অত্যন্ত অপরাধী আছি। তোমরা আমার সহিত যেরূপ সরল ব্যবহার করিয়াছিলে আমার তদনুরূপ কর্ম্ম করা হয় নাই। এক্ষণে স্বীয় ঔদার্য্যগুণে ক্ষমা করিলে অনুগৃহীত হইব।
পত্রলেখা, মেঘনাদ ও কেয়ূরক বিদায় হইলে রাজকুমার বৈশম্পায়নের সহিত সাক্ষাৎ করিতে অতিশয় উৎসুক হইলেন। তাঁহার আগমন পর্য্যন্ত প্রতীক্ষা করিতে পারিলেন না। আপনিই স্কন্ধাবারে যাইবেন স্থির করিয়া মহারাজের আদেশ লইতে গেলেন। রাজা প্রণত পুত্ত্রকে সস্নেহে আলিঙ্গন করিয়া গাত্রে হস্তস্পর্শ পূর্ব্বক শুকনাসকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, অমাত্য! চন্দ্রাপীড়ের শ্মশ্রুরাজি উদ্ভিন্ন হইয়াছে। এক্ষণে পুত্ত্রবধূ-মুখাবলোকন দ্বারা আত্মাকে পরিতৃপ্ত করিতে বাঞ্ছা হয়। মহিষীর সহিত পরামর্শ করিয়া সম্ভ্রান্তকুলজাত উপযুক্ত কন্যা অন্বেষণ কর। মন্ত্রী কহিলেন, মহারাজ! উত্তম কল্প বটে! রাজকুমার সমুদায় বিদ্যা শিখিয়াছেন, উত্তম রূপে রাজ্য শাসন ও প্রজা পালন করিতেছেন। এক্ষণে নববধূর পাণিগ্রহণ করেন ইহা সকলের বাঞ্ছা। চন্দ্রাপীড় মনে মনে কহিলেন, কি সৌভাগ্য! গন্ধর্ব্বকুমারীর সহিত সমাগমের উপায়চিন্তাসমকালেই পিতার বিবাহ দিবার অভিলাষ হইয়াছে। এই সময় বৈশম্পায়ন আসিলে প্রিয়তমার প্রাপ্তিবিষয়ে আর কোন বাধা থাকে না। অনন্তর স্কন্ধাবারের প্রত্যুদ্গমনের নিমিত্ত পিতার আদেশ প্রার্থনা করিলেন। রাজাও সম্মত হইলেন। বৈশম্পায়নকে দেখিবার নিমিত্ত এরূপ উৎসুক হইয়াছিলেন যে, সে রাত্রি নিদ্রা হইল না। নিশীথ সময়েই প্রস্থানসূচক শঙ্খধ্বনি করিতে আদেশ দিলেন। শঙ্খধ্বনি হইবামাত্র সকলে সুসজ্জ হইয়া রাজপথে বহির্গত হইল। পৃথিবী জ্যোৎস্নাময়, চতুর্দ্দিক্ আলোকময়। সে সময় পথ চলার কোন ক্লেশ হয় না। চন্দ্রাপীড় দ্রুত বেগে অগ্রে অগ্রে চলিলেন। রাত্রি প্রভাত না হইতেই অনেক দূর চলিয়া গেলেন। স্কন্ধাবার যে স্থানে সন্নিবেশিত ছিল, প্রভাতে ঐ স্থান দেখিতে পাইলেন। গাঢ় অন্ধকারে আলোক দেখিলে যেরূপ আহ্লাদ জন্মে, দূর হইতে স্কন্ধাবার নেত্রগোচর করিয়া রাজকুমার সেইরূপ আনন্দিত হইলেন। মনে মনে কল্পনা করিলেন, অতর্কিত রূপে সহসা উপস্থিত হইয়া বন্ধুর মনে বিস্ময় জন্মাইয়া দিব।
ক্রমে নিকটবর্ত্তী হইয়া স্কন্ধাবারে প্রবেশিলেন। দেখিলেন কতকগুলি স্ত্রীলোক এক স্থানে বসিয়া কথা বার্ত্তা কহিতেছে। তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বৈশম্পায়ন কোথায়? তাহারা রাজকুমারকে চিনিত না; সুতরাং সমাদর বা সম্ভ্রম প্রদর্শন না করিয়াই উত্তর করিল কি জিজ্ঞাসা করিতেছ, বৈশম্পায়ন এখানে কোথায়? আঃ কি প্রলাপ করিতেছিস্ রোষ প্রকাশ পূর্ব্বক এই কথা বলিয়া রাজকুমার তাহাদিগের যৎপরোনাস্তি তিরস্কার করিলেন। কিন্তু তাঁহার অন্তঃকরণ নিতান্ত ব্যাকুল ও চঞ্চল হইয়া উঠিল। অনন্তর কতিপয় প্রধান সৈনিক পুরুষ নিকটে আসিয়া বিনীত ভাবে প্রণাম করিল। চন্দ্রাপীড় জিজ্ঞাসা করিলেন, বৈশম্পায়ন কোথায়? তাহারা বিনয়বচনে কহিল, যুবরাজ! এই তরুতলে শীতল ছায়ায় উপবেশন করুন, আমরা সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিতেছি। তাহাদিগের কথায় আরও উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, আমি স্কন্ধাবার হইতে বাটী গমন করিলে কি কোন সংগ্রাম উপস্থিত হইয়াছিল? কি কোন অসাধ্য ব্যাধি বন্ধুকে কবলিত করিয়াছে? কি অত্যহিত ঘটিয়াছে? শীঘ্র বল। তাহারা সসম্ভ্রমে কর্ণে করক্ষেপ করিয়া কহিল না, না, অত্যহিত বা অমঙ্গলের আশঙ্কা করিবেন না। রাজকুমার প্রথমে ভাবিয়াছিলেন বন্ধু জীবদ্দশায় নাই; এক্ষণে সে ভাবনা দূর হইল ও শোকাশ্রু আনন্দাশ্রু রূপে পরিগণিত হইল। তখন গদ্গদ বচনে কহিলেন, তবে বৈশম্পায়ন কোথায় আছেন, কি নিমিত্ত আসিলেন না? তাহারা কহিল, রাজকুমার! শ্রবণ করুন।
২.১২ আপনি বৈশম্পায়নকে স্কন্ধাবার লইয়া
আপনি বৈশম্পায়নকে স্কন্ধাবার লইয়া আসিবার ভার দিয়া প্রস্থান করিলে তিনি কহিলেন, পুরাণে শুনিয়াছি অচ্ছোদসরোবর অতি পবিত্র তীর্থ। অশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়াও লোকে তীর্থ দর্শন করিতে যায়। আমরা সেই তীর্থের নিকটে আসিয়াছি, অতএব একবার না দেখিয়া এখান হইতে যাওয়া উচিত নয়। অচ্ছোদসরোবরে স্নান করিয়া এবং তত্তীরস্থিত ভগবান্ শশাঙ্কশেখরকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া যাত্রা করা যাইবে। এই বলিয়া সেই সরোবর দেখিতে গেলেন। তথায় বিকসিতকুসুম, নির্ম্মল জল, রমণীয় তীরভূমি, শ্রেণীবদ্ধ তরু, কুসুমিত লতাকুঞ্জ দেখিয়া বোধ হইল যেন, বসন্ত সপরিবারে ও সবান্ধবে তথায় বাস করিতেছেন। ফলতঃ তাদৃশ রমণীয় প্রদেশ ভূমণ্ডলে অতি বিরল। বৈশম্পায়ন তথায় ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত পূর্ব্বক এক মনোহর লতামণ্ডপ দেখিলেন। ঐ লতামণ্ডপের অভ্যন্তরে এক শিলা পতিত ছিল। পরমপ্রীতিপাত্র মিত্রকে বহু কালের পর দেখিলে অন্তঃকরণে যেরূপ ভাবোদয় হয়, লতামণ্ডপ দেখিয়া বৈশম্পায়নের মনে সেইরূপ অনির্ব্বচনীয় ভাবোদয় হইল। তিনি নিমেষশূন্য নয়নে সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলেন। ক্রমে নিতান্ত উন্মনা হইতে লাগিলেন। পরিশেষে ভূতলে উপবিষ্ট হইয়া বামকরে বামগণ্ড সংস্থাপন পূর্ব্বক নানাপ্রকার চিন্তা করিতে লাগিলেন। তাঁহার আকার দেখিয়া বোধ হইল যেন, কোন বিস্মৃত বস্তুর স্মরণ করিতেছেন। তাঁহাকে সেইরূপ উন্মনা দেখিয়া আমরা মনে করিলাম, বুঝি রমণীয় লতামণ্ডপ ও মনোহর সরোবর ইঁহার চিত্তকে বিকৃত করিয়া থাকিবেক। যৌবনকাল কি বিষম কাল! এই কালে উত্তীর্ণ হইলে আর লজ্জা, ধৈর্য্য, কিছুই থাকে না। যাহা হউক, অধিক ক্ষণ এখানে আর থাকা হইবে না। শাস্ত্রকারেরা কহেন, বিকারের সামগ্রী শীঘ্র পরিহার করাই বিধেয়। এই স্থির করিয়া কহিলাম, মহাশয়! সরোবর দর্শন হইল এক্ষণে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক অবগাহন করুন। বেলা অধিক হইয়াছে। স্কন্ধাবার সুসজ্জ হইয়া আপনার প্রতীক্ষা করিতেছে। আর বিলম্ব করিবেন না।
