কুসুমচাপই হউক, আর যে হউক, তাহার রূপ, গুণ, স্বভাব কি প্রকার বর্ণনা কর তাহা হইলে বুঝিতে পারি কে আমাকে এত যাতনা দিতেছে। তিনি এই কথা কহিলে বলিলাম, সে দুরাত্মা অনঙ্গ, তাহার রূপ কোথায়? সে জ্বালাবতী ও ধূমপটল বিস্তার না করিয়াও সন্তাপপ্রদান ও অশ্রুপাতন করে। ত্রিভুবনে প্রায় এরূপ লোক নাই, যাহাকে তাহার শরের শরব্য হইতে না হয়। কুসুমচাপের যেরূপ স্বরূপ বর্ণনা করিলে, বোধ হয়, আমি তাহার বাণপাতের পথবর্ত্তী হইয়া থাকিব। এক্ষণে কি কর্ত্তব্য উপদেশ দাও। এই কথা শুনিয়া আমি প্রবোধবাক্যে বলিলাম, দেবি! কত শত বিখ্যাত অবলাগণ ইচ্ছা পূর্ব্বক স্বয়ংবরবিধানে প্রবৃত্ত হইয়া আপন অভিলাষ সম্পাদন করিয়া থাকেন, অথচ লোকসমাজে নিন্দনীয় হয়েন না। আপনিও স্বয়ংবরবিধানের আয়োজন করুন ও এক খানি পত্রিকা লিখিয়া দেন। সেই পত্রিকা দেখাইয়া আমি রাজকুমারকে আনিয়া আপনার মনোরথ পূর্ণ করিতেছি। এই কথায় অতিশয় হৃষ্ট হইয়া প্রীতিপ্রফুল্ল নয়নে ক্ষণকাল অনুধ্যান করিয়া কহিলেন, তাহারা অতিশয় সাহসকারিণী, যাহারা স্বয়ংবরে প্রবৃত্ত হয় ও মনোগত কথা প্রিয়তমের নিকট বলিয়া পাঠায়। কুমারীজনের এতাদৃশ প্রাগল্ভ্য ও সাহস কোথা হইতে হইবে? কি কথাই বা বলিয়া পাঠাইব? তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় এ কথা বলা পৌনরুক্ত। আমি তোমার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত, বেশবনিতারাই ইহা কথা দ্বারা ব্যক্ত করিয়া থাকে। তোমা ব্যতিরেকে জীবিত থাকিতে পারি না এ কথা অনুভববিরুদ্ধ ও অবিশ্বাস্য। যদি তুমি না আইস, আমি স্বয়ং তোমার নিকট যাইব, এ কথায় চাপল্য প্রকাশ হয়। প্রাণপরিত্যাগ দ্বারা প্রণয়প্রকাশ করিতেছি, এ কথা আপাততঃ অসম্ভব বোধ হয়। অবশ্য একবার আসিবে, এ কথা বলিলে গর্ব্ব প্রকাশ হয়। তিনি এখানে আসিলেই বা কি হইবে, যখন হিমগৃহে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছিল, তিনি কত কথা কহিলেন; আমি তাঁহার সমক্ষে একটি মনের কথা ব্যক্ত করিতে পারিলাম না। আমার সেই মুখ, সেই অন্তঃকরণ, কিছুই পরিবর্ত্ত হয় নাই। পুনর্ব্বার সাক্ষাৎ হইলেই যে মনোগত অনুরাগ প্রকাশ করিয়া তাঁহাকে প্রণয়পাশে বদ্ধ করিতে পারিব, তাহারই বা প্রমাণ কি? যাহা হউক, এক্ষণে সখীজনের যাহা কর্ত্তব্য, কর। এই বলিয়া আমাকে পাঠাইয়া দিলেন। ফলতঃ গন্ধর্ব্বরাজকুমারীর সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া তৎকালে তথা হইতে আপনার প্রত্যাগমন করায় নিতান্ত নিঃস্নেহতা প্রকাশ হইয়াছে; এটি যুবরাজের উপযুক্ত কর্ম্ম হয় নাই। এই কথা বলিয়া পত্রলেখা ক্ষান্ত হইল।
২.১১ চন্দ্রাপীড় স্বভাবতঃ ধীরপ্রকৃতি
চন্দ্রাপীড় স্বভাবতঃ ধীরপ্রকৃতি হইয়াও কাদম্বরীর আদ্যোপান্ত বিরহবৃত্তান্ত শ্রবণে সাতিশয় অধীর হইলেন; এমন সময়ে প্রতীহারী আসিয়া কহিল, যুবরাজ! পত্রলেখা আসিয়াছে, এই সংবাদ শুনিয়া মহিষী পত্রলেখার সহিত আপনাকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতে আদেশ করিলেন। অনেক ক্ষণ আপনাকে না দেখিয়া অতিশয় ব্যাকুল হইয়াছেন। চন্দ্রাপীড় মনে মনে কহিলেন, কি বিষম সঙ্কট উপস্থিত। এক দিকে গুরু জনের স্নেহ, আর দিকে প্রিয়তমের অনুরাগ। মাতা না দেখিয়া এক দণ্ড থাকিতে পারেন না, কিন্তু পত্রলেখার মুখে প্রাণেশ্বরীর যে সংবাদ শুনিলাম, ইহাতে আর বিলম্ব করা বিধেয় নয়। কি করি, কাহার অনুরোধ রাখি। এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে অন্তঃপুরে প্রবেশিলেন। গন্ধর্ব্বনগরে কিরূপে যাইবেন দিন যামিনী এই ভাবনায় অতিশয় ব্যাকুল হইতে লাগিলেন। কতিপয় বাসর অতীত হইলে একদা বিনোদের নিমিত্ত শিপ্রানদীর তীরে ভ্রমণ করিতেছেন এমন সময়ে দেখিলেন, অতি দূরে কতকগুলি অশ্বারোহী আসিতেছে। তাহারা নিকটবর্ত্তী হইলে দেখিলেন অগ্রে কেয়ূরক, পশ্চাতে কতিপয় গন্ধর্ব্বদারক। রাজকুমার কেয়ূরককে অবলোকন করিয়া পরম পুলকিত হইলেন এবং প্রসারিত ভুজযুগল দ্বারা আলিঙ্গন করিয়া সাদর সম্ভাষণে কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসিলেন। অনন্তর তথা হইতে বাটী আসিয়া নির্জ্জনে গন্ধর্ব্বকুমারীর সন্দেশবার্ত্তা জিজ্ঞাসা করাতে কহিল, আমাকে তিনি কিছুই বলিয়া দেন নাই। আমি মেঘনাদের নিকট পত্রলেখাকে রাখিয়া ফিরিয়া গেলাম এবং রাজকুমার উজ্জয়িনী গমন করিয়াছেন এই সংবাদ দিলাম। মহাশ্বেতা শুনিয়া ঊর্দ্ধে দৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক কেবল এইমাত্র কহিলেন, হাঁ উপযুক্ত কর্ম্ম হইয়াছে। এবং তৎক্ষণাৎ গাত্রোত্থান করিয়া আপন আশ্রমে চলিয়া গেলেন। কাদম্বরী শুনিবামাত্র নিমীলিতনেত্র ও সংজ্ঞাশূন্য হইলেন। অনেক ক্ষণের পর নয়ন উন্মীলন করিয়া মদলেখাকে কহিলেন, মদলেখে! চন্দ্রাপীড় যে কর্ম্ম করিয়াছেন আর কেহ কি এরূপ করিতে পারে! এইমাত্র বলিয়া শয্যায় শয়ন করিলেন। তদবধি কাহারও সহিত কোন কথা কহেন নাই। পর দিন প্রভাত কালে আমি তথায় গিয়া দেখিলাম, কাদম্বরী সংজ্ঞাশূন্য, কেহ কোন কথা কহিলে উত্তর দিতেছেন না। কেবল নয়নযুগল হইতে অনবরত অশ্রুধারা পতিত হইতেছে। আমি তাঁহার সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া অতিশয় চিন্তিত হইলাম এবং তাঁহাকে না বলিয়াই আপনার নিকট আসিয়াছি।
গন্ধর্ব্বকুমারীর বিরহবৃত্তান্ত শুনিতেছেন এমন সময়ে মূর্চ্ছা রাজকুমারের চেতন হরণ করিল। সকলে সসম্ভ্রমে তালবৃন্ত ব্যজন ও শীতল চন্দনজল সেচন করাতে অনেক ক্ষণের পর চেতন হইলেন। দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক কহিলেন, কাদম্বরীর মন আমার প্রতি এরূপ অনুরক্ত তাহা আমি পূর্ব্বে জানিতে পারি নাই। এক্ষণে কি করি, কি উপায়ে প্রিয়তমার প্রাণ রক্ষা হয়! বুঝি, দুরাত্মা বিধি বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটাইয়া আমাকে মহাপাপে লিপ্ত ও কলঙ্কিত করিবার মানস করিয়াছে। এ সকল দৈববিড়ম্বনা সন্দেহ নাই। নতুবা নিরর্থক কিন্নরমিথুনের অনুসরণে কেন প্রবৃত্তি হইবে? অচ্ছোদসরোবরেই বা কেন যাইব? মহাশ্বেতার সঙ্গেই বা কেন সাক্ষাৎ হইবে? গন্ধর্ব্বনগরেই বা কি জন্য গমন করিব? আমার প্রতি কাদম্বরীর অনুরাগসঞ্চারই বা কেন হইবে? এ সকল বিধাতার চাতুরী সন্দেহ নাই। নতুবা, অসম্ভাবিত ও স্বপ্নকল্পিত ব্যাপার সকল কি রূপে সংঘটিত হইল? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে দিবাবসান হইল। নিশি উপস্থিত হইলে জিজ্ঞাসিলেন, কেয়ূরক! তোমার কি বোধ হয় আমাদিগের গমন পর্য্যন্ত কাদম্বরী জীবিত থাকিবেন? তাঁহার সেই পরম সুন্দর মুখচন্দ্র আর কি দেখিতে পাইব? কেয়ূরক কহিল, রাজকুমার! এই সংসারে আশাই জীবনের মূল। আশা আশ্বাস প্রদান না করিলে কেহ জীবিত থাকিতে পারে না। লোকেরা আশালতা অবলম্বন করিয়া দুঃখসাগরে নিতান্ত নিমগ্ন হয় না। আপনি নিতান্ত কাতর হইবেন না, ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক গমনের উপায় দেখুন। আপনি তথায় যাইবেন এই আশা অবলম্বন করিয়া গন্ধর্ব্বকুমারী কালক্ষেপ করিতেছেন, সন্দেহ নাই। অনন্তর রাজকুমার কেয়ূরককে বিশ্রাম করিতে আদেশ দিয়া কিরূপে গন্ধর্ব্বপুরে যাইবেন তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। ভাবিলেন যদি পিতা মাতাকে না বলিয়া তাঁহাদিগের অজ্ঞাতসারে গমন করি, তাহা হইলে কোথায় সুখ কোথায় বা শ্রেয়ঃ? পিতা যে রাজ্য-ভার দিয়াছেন সে কেবল দুঃখভার, প্রতিদিন পর্য্যবেক্ষণ না করিলে বিষমসঙ্কটের হেতুভূত হয়। সুতরাং তাঁহাকে না বলিয়া কি রূপে যাওয়া যাইতে পারে? বলিয়া যাওয়া উচিত; কিন্তু কি বলিব? গন্ধর্ব্বরাজকুমারী আমাকে দেখিয়া প্রণয়পাশে বদ্ধ হইয়াছেন, আমি সেই প্রাণেশ্বরী ব্যতিরেকে প্রাণ ধারণ করিতে পারি না, কেয়ূরক আমাকে লইতে আসিয়াছে, আমি চলিলাম, নিতান্ত নির্লজ্জ ও অসারের ন্যায় এ কথাই বা কি রূপে বলিব? বহুকালের পর বাটী আসিয়াছি; কি ব্যপদেশেই বা আবার শীঘ্র বিদেশে যাইব? পরামর্শ জিজ্ঞাসা করি এরূপ একটী লোক নাই। প্রিয়সখা বৈশম্পায়নও নিকটে নাই। এরূপ নানাপ্রকার চিন্তা করিতে করিতে রাত্রি প্রভাত হইল।
