চন্দ্রাপীড় মন্দিরের সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া তুরঙ্গম হইতে অবতীর্ণ হইলেন। ভক্তিভাবে দেবীকে প্রদক্ষিণ করিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন। কাদম্বরীর বিরহে তাঁহার অন্তঃকরণ অতিশয় উৎকণ্ঠিত ছিল, দ্রাবিড়দেশীয় ধার্ম্মিকের আমোদজনক ব্যাপারে কিঞ্চিৎ সুস্থ হইল। তিনি স্বয়ং তাঁহার জন্মভূমি, জাতি, বিদ্যা, পুত্ত্র, বিভব, বিষয় ও প্রব্রজ্যার কারণ সমুদায় জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। ধার্ম্মিক আপনার শৌর্য্য, বীর্য্য, ঐশ্বর্য্য, রূপ, গুণ, বুদ্ধিমত্তার এ রূপে পরিচয় দিলেন যে তাহা শুনিয়া কেহ হাস্য নিবারণ করিয়া রাখিতে পারে না। অনন্তর রবি অস্তগত হইলে অগ্নি জ্বালিয়া ও ঘোটকের পর্য্যাণ বৃক্ষশাখায় রাখিয়া সকলে নিদ্রা গেলে রাজকুমার শয়ন করিয়া কেবল গন্ধর্ব্বনগর চিন্তা করিতে লাগিলেন। প্রভাতে চণ্ডিকার উপাসককে যথেষ্ট ধন দিয়া তথা হইতে বহির্গত হইলেন। কতিপয় দিনে উজ্জয়িনীনগরে পঁহুছিলেন। রাজকুমারের আগমনে নগর আনন্দময় হইল। তারাপীড় চন্দ্রাপীড়ের আগমনবার্ত্তা শ্রবণে সাতিশয় আনন্দিত হইয়া সভাস্থ রাজমণ্ডলী সমভিব্যাহারে স্বয়ং প্রত্যুদ্গমন করিলেন। প্রণত পুত্ত্রকে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া তাঁহার শরীর শীতল হইল। যুবরাজ তথা হইতে অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া প্রথমতঃ জননীকে, অনন্তর অবরোধকামিনীদিগকে, একে একে প্রণাম করিলেন। পরে অমাত্যের ভবনে গমন করিয়া শুকনাস ও মনোরমার চরণ বন্দনা পূর্ব্বক বৈশম্পায়ন পশ্চাৎ আসিতেছেন সংবাদ দিয়া তাঁহাদিগকে আহ্লাদিত করিলেন। বাটী আসিয়া জননীর নিকট আহারাদি সমাপন করিয়া, অপরাহ্ণে শ্রীমণ্ডপে আসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। তথায় জীবিতেশ্বরী গন্ধর্ব্বরাজকুমারীর মোহিনী মূর্ত্তি স্মৃতিপথারূঢ় হইল। পত্রলেখা আসিলে প্রিয়তমার সংবাদ পাইব এইমাত্র আশা অবলম্বন করিয়া কথঞ্চিৎ কাল যাপন করিতে লাগিলেন।
কিছু দিন পরে মেঘনাদ ও পত্রলেখা আসিয়া উপস্থিত হইল। যুবরাজ সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া পত্রলেখাকে মহাশ্বেতা ও কাদম্বরীর কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা করিলেন। পত্রলেখা কহিলেন, সকলেই কুশলে আছেন। প্রিয়তমার সংক্ষেপ সংবাদ শ্রবণে যুবরাজের মন পরিতৃপ্ত হইল না। তিনি ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, পত্রলেখে! আমি তথা হইতে আগমন করিলে তুমি তথায় কত দিন ছিলে? গন্ধর্ব্বরাজপুত্ত্রী কিরূপ তোমার আদর করিয়াছিলেন? কি কি কথা হইয়াছিল? সমুদায় বিশেষ রূপে বর্ণন কর। পত্রলেখা কহিল, শ্রবণ করুন। আপনি আগমন করিলে আমি তথায় যে কয়েক দিন ছিলাম, গন্ধর্ব্বকুমারীর নব নব প্রসাদ অনুভব করিতাম। আমোদ আহ্লাদে পরম সুখে দিবস অতিবাহিত করিয়াছি। তিনি আমা ব্যতিরেকে এক দণ্ডও থাকিতেন না। যেখানে যাইতেন, আমাকে সঙ্গে লইয়া যাইতেন। সর্ব্বদা আমার চক্ষুর উপর তাঁহার নয়নোৎপল ও আমার করে তাঁহার পাণিপল্লব থাকিত। একদা প্রমোদবনবেদিকায় আরোহণ পূর্ব্বক কিছু বলিতে অভিলাষ করিয়া বিষণ্ণ বদনে আমার মুখপানে অনেক ক্ষণ চাহিয়া রহিলেন। তৎকালে তাঁহার মনে কোন অনির্ব্বচনীয় ভাবোদয় হওয়াতে তাঁহার কম্পিত ও রোমাঞ্চিত কলেবর হইতে বিন্দু বিন্দু স্বেদজল নিঃসৃত হইতে লাগিল। কিন্তু কিছুই বলিতে পারিলেন না। আমি তাঁহার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, দেবি! কি বলিতেছেন বলুন। কিন্তু তাঁহার কথা স্ফূর্ত্তি হইল না; কেবল নয়নযুগল হইতে জলধারা পড়িতে লাগিল। এ কি! অকস্মাৎ এরূপ দুঃখের কারণ কি? এই কথা জিজ্ঞাসা করাতে বসনাঞ্চলে নেত্রজল মোচন করিয়া বলিলেন, পত্রলেখে! দর্শন অবধি তুমি আমার প্রিয়পাত্র হইয়াছ। আমার হৃদয় কাহাকেও বিশ্বাস করিতে সম্মত নহে; কিন্তু তোমাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করিয়াছে। তোমাকে মনের কথা না বলিয়া আর কাহাকে বলিব। প্রিয়সখীকে আত্মদুঃখে দুঃখিত না করিয়া আর কাহাকে আত্মদুঃখে দুঃখিত করিব? কুমার চন্দ্রাপীড় লোকের নিকটে আমাকে নিন্দনীয় করিলেন ও যৎপরোনাস্তি যন্ত্রণা দিলেন। কুমারীজনের কুসুমসুকুমার অন্তঃকরণ যুবজনেরা বলপূর্ব্বক আক্রমণ করে, কিছুমাত্র দয়া করে না। এক্ষণে গুরুজনের অননুমোদিত পথে পদার্পণ করিয়া কিরূপে নিষ্কলঙ্ক কুলে জলাঞ্জলি প্রদান করি। কুলক্রমাগত লজ্জা ও বিনয়ই বা কিরূপে পরিত্যাগ করি। যাহা হউক, জগদীশ্বরের নিকটে এই প্রার্থনা, জন্মান্তরে যেন তোমাকে প্রিয়সখীরূপে প্রাপ্ত হই। আমি প্রাণত্যাগ দ্বারা কুলের কলঙ্ক নিবারণ করিব, অভিলাষ করিয়াছি।
আমি তাঁহার দুরবগাহ অভিপ্রায়ে প্রবেশ করিতে না পারিয়া বিষণ্ণ বদনে বিজ্ঞাপন করিলাম, দেবি! যুবরাজ কি অপরাধ করিয়াছেন, আপনি তাঁহাকে এত তিরস্কার করিতেছেন কেন? এই কথা শুনিয়া রোষ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন, ধূর্ত্ত প্রতিদিন স্বপ্নাবস্থায় আমার নিকট উপস্থিত হইয়া আমাকে কত কুপ্রবৃত্তি দেয়, তাহা ব্যক্ত করা যায় না। কখন সঙ্কেতস্থান নির্দ্দেশ পূর্ব্বক মদনলেখন প্রেরণ করে; কখন বা দূতীমুখে নানা অসৎপ্রবৃত্তি দেয়। আমি ক্রোধান্ধ হইয়া অমনি জাগরিত হই ও চক্ষু উন্মীলন করি, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাই না। কাহাকে তিরস্কার করি, কাহাকেই বা নিষেধ করি কিছুই বুঝিতে পারি না। এই কথা দ্বারা অনায়াসে কাদম্বরীর সংকল্প ব্যক্ত হইল। তখন আমি হাসিতে হাসিতে কহিলাম, দেবি! একজনের অপরাধে অন্যের প্রতি দোষারোপ করা উচিত নয়। আপনি দুরাত্মা কুসুমচাপের চাপল্যে প্রতারিত হইয়াছেন, চন্দ্রাপীড়ের কিছুমাত্র অপরাধ নাই।
