চন্দ্রাপীড় চিত্ররথতনয়ার তদানীন্তন অবস্থা দেখিয়া মনে মনে কহিলেন, আমার হৃদয় কি দুর্ব্বিদগ্ধ! মনোরথ ফলোন্মুখ হইয়াছে তথাপি বিশ্বাস করিতেছে না। ভাল, কৌশল করিয়া দেখা যাউক এই স্থির করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, দেবি! তোমার এরূপ অপরূপ ব্যাধি কোথা হইতে সমুত্থিত হইল? তোমাকে আজি এরূপ দেখিতেছি কেন? মুখকমল মলিন হইয়াছে, শরীর শীর্ণ হইয়াছে, হঠাৎ দেখিলে চিনিতে পারা যায় না। যদি আমা হইতে এ রোগের প্রতিকারের কোন সম্ভাবনা থাকে, এখনই বল। আমার দেহ দান বা প্রাণ দান করিলেও যদি সুস্থ হও আমি এখনি দিতে প্রস্তুত আছি। কাদম্বরী বালা ও স্বভাবমুগ্ধা হইয়াও অনঙ্গের উপদেশপ্রভাবে রাজকুমারের বচনচাতুরীর যথার্থ ভাবার্থ বুঝিলেন। কিন্তু লজ্জাপ্রযুক্ত বাক্য দ্বারা উত্তর দিতে অসমর্থ হইয়া ঈষৎমুহাস্য করিয়া সচিত উত্তর প্রদান করিলেন। মদলেখা তাহারই ভাবার্থ ব্যক্ত করিয়া কহিল, রাজকুমার! কি বলিব আমরা এরূপ অপরূপ ব্যাধি ও অদ্ভুত সন্তাপ কখন কাহারও দেখি নাই। সন্তাপিত ব্যক্তির নলিনীকিসলয় হুতাশনের ন্যায়, জ্যোৎস্না উত্তাপের ন্যায়, সমীরণ বিষের ন্যায় বোধ হয়, ইহা আমরা কখনও শ্রবণ করি নাই। জানি না এ রোগের কি ঔষধ আছে। প্রণয়োন্মুখ যুবজনের অন্তঃকরণ কি সন্দিগ্ধ! কাদম্বরীর সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া ও মদলেখার সেইরূপ উত্তর শুনিয়াও চন্দ্রাপীড়ের চিত্ত সন্দেহদোলা হইতে নিবৃত্ত হইল না। তিনি ভাবিলেন, যদি আমার প্রতি কাদম্বরীর যথার্থ অনুরাগ থাকিত, এ সময় স্পষ্ট করিয়া ব্যক্ত করিতেন। এই স্থির করিয়া মহাশ্বেতার সহিত মধুরালাপগর্ভ নানাবিধ কথাপ্রসঙ্গে ক্ষণ কাল ক্ষেপ করিয়া পুনর্ব্বার স্কন্ধাবারে চলিয়া গেলেন। কাদম্বরীর অনুরোধে কেবল পত্রলেখা তথায় থাকিল।
২.১০ চন্দ্রাপীড় স্কন্ধাবারে প্রবেশিয়া
চন্দ্রাপীড় স্কন্ধাবারে প্রবেশিয়া উজ্জয়িনী হইতে আগত এক বার্ত্তাবহকে দেখিতে পাইলেন। প্রীতিবিস্ফারিত লোচনে পিতা, মাতা, বন্ধু, বান্ধব, প্রজা, পরিজন প্রভৃতি সকলের কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসিলেন। সে প্রণতিপূর্ব্বক দুই খানি লিখন তাঁহার হস্তে প্রদান করিল। যুবরাজ পিতৃপ্রেরিত পত্রিকা অগ্রে পাঠ করিয়া তদনন্তর শুকনাসপ্রেরিত পত্রের অর্থ অবগত হইলেন। এই লিখিত ছিল “বহু দিবস হইল তোমরা বাটী হইতে গমন করিয়াছ। অনেক কাল তোমাদিগকে না দেখিয়া আমরা অতিশয় উৎকণ্ঠিতচিত্ত হইয়াছি। পত্রপাঠ মাত্র উজ্জয়িনীতে না পঁহুছিলে, আমাদিগের উদ্বেগ বৃদ্ধি হইতে থাকিবে।” বৈশম্পায়নও যে দুইখানি পত্র পাইয়াছিলেন তাহাতেও এইরূপ লিখিত ছিল। যুবরাজ পত্র পাইয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন কি করি, এক দিকে গুরুজনের আজ্ঞা, আর দিকে প্রণয়প্রবৃত্তি। গন্ধর্ব্বরাজতনয়া কথা দ্বারা অনুরাগ প্রকাশ করেন নাই বটে, কিন্তু ভাবভঙ্গির দ্বারা বিলক্ষণ লক্ষিত হইয়াছে। ফলতঃ তিনি অনুরাগিণী না হইলে আমার অন্তঃকরণ কেন তাঁহার প্রতি এত অনুরক্ত হইবে? যাহা হউক, এক্ষণে পিতার আদেশ অতিক্রম করা হইতে পারে না। এই স্থির করিয়া সমীপস্থিত বলাহকের পুত্ত্র মেঘনাদকে কহিলেন, মেঘনাদ! পত্রলেখাকে সমভিব্যাহারে করিয়া কেয়ূরক এই স্থানে আসিবে। তুমি দুই এক দিন বিলম্ব কর, পত্রলেখা আসিলে তাহাকে সঙ্গে লইয়া বাটী যাইবে এবং কেয়ূরককে কহিবে যে, আমাকে ত্বরায় বাটী যাইতে হইল; এজন্য কাদম্বরী ও মহাশ্বেতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিলাম না। এক্ষণে বোধ হইতেছে তাঁহাদিগের সহিত আলাপ পরিচয় না হওয়াই ভাল ছিল। আলাপ পরিচয় হওয়াতে কেবল পরস্পর যাতনা সহ্য করা বই আর কিছুই লাভ দেখিতে পাই না। যাহা হউক, গুরুজনের আজ্ঞার অধীন হইয়া আমার শরীর উজ্জয়িনীতে চলিল, অন্তঃকরণ যে গন্ধর্ব্বনগরে রহিল ইহা বলা বাহুল্যমাত্র। অসজ্জনের নাম উল্লেখ করিবার সময়ে আমাকেও যেন এক এক বার স্মরণ করেন। মেঘনাদকে এই কথা বলিয়া বৈশম্পায়নকে কহিলেন আমি অগ্রসর হইলাম; তুমি রীতি পূর্ব্বক স্কন্ধাবার লইয়া আইস।
রাজকুমার পার্শ্ববর্ত্তী বার্ত্তাবহকে উজ্জয়িনীর বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিতে করিতে চলিলেন। কতিপয় অশ্বারোহীও সঙ্গে সঙ্গে চলিল। ক্রমে প্রকাণ্ড পাদপ ও লতামণ্ডলীসমাকীর্ণ নিবিড় অটবীমধ্যে প্রবেশিলেন। কোন স্থানে গজভঙ্গ বৃক্ষশাখা পতিত হওয়াতে পথ বক্র ও দুর্গম হইয়াছে। কোন স্থানে বৃক্ষমণ্ডলীর শাখাসকল পরস্পর সংলগ্ন ও মূলদেশ পরস্পর মিলিত হওয়াতে দুষ্প্রবেশ দুর্গ সংস্থাপিত রহিয়াছে। স্থানে স্থানে এক একটা কূপ, উহার জল বিবর্ণ ও বিস্বাদ। উহার মুখ লতাজালে এরূপ আচ্ছন্ন যে, পথিকেরা জল তুলিবার নিমিত্ত লতা দ্বারা যে রজ্জুরচনা করিয়াছিল কেবল তাহা দ্বারাই অনুমিত হয়। মধ্যে মধ্যে গিরিনদী আছে; কিন্তু জল নাই। তৃষ্ণার্ত্ত পথিকেরা উহার শুষ্ক প্রদেশ খনন করাতে ছোট ছোট কূপ নির্ম্মিত হইয়াছে। এই ভয়ঙ্কর কান্তার অতিক্রম করিতে দিবাবসান হইল। দূর হইতে দেখিলেন সম্মুখে এক রক্তবর্ণ পতাকা সন্ধ্যাসমীরণে উড্ডীন হইতেছে।
রাজকুমার সেইদিক্ লক্ষ্য করিয়া কিঞ্চিৎ দূর গমন করিলেন। দেখিলেন চতুর্দ্দিকে খর্জ্জূরবৃক্ষের বনমধ্যে এক মন্দিরে ভগবতী চণ্ডিকার প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত আছে। রক্তচন্দনলিপ্ত রক্তোৎপল ও বিল্বদল সম্মুখে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। দ্রাবিড়দেশীয় এক ধার্ম্মিক তথায় উপবেশন করিয়া কখন বা যক্ষকন্যার মনে অনুরাগসঞ্চারের নিমিত্ত রুদ্রাক্ষমালা জপ, কখন বা দুর্গার স্তুতিপাঠ করিতেছেন। তিনি জরাজীর্ণ, কালগ্রাসে পতিত হইবার অধিক বিলম্ব নাই, তথাপি ভগবতী পার্ব্বতীর নিকট কখন বা দক্ষিণাপথের অধিরাজ্য কখন বা ভূমণ্ডলের আধিপত্য কামনা করিতেছেন। কখন বা প্রেয়সীবশীকরণতন্ত্রমন্ত্র শিখিতেছেন ও তীর্থদর্শনসমাগতা বৃদ্ধা পরিব্রাজিকাদিগের অঙ্গে বশীকরণচূর্ণ নিক্ষেপ করিতেছেন। কখন বা হস্ত বাজাইয়া মস্তক সঞ্চালন পূর্ব্বক মশকের ন্যায় গুন গুন শব্দে গান করিতেছেন। জগদীশ্বরের কি আশ্চর্য্য কৌশল! তিনি যেরূপ এক স্থানে সমুদায় সৌন্দর্য্যের সমাবেশ করিতে পারেন, সেইরূপ তাঁহার কৌশলের সমুদায় বৈরূপ্যও এক স্থানে সন্নিবিষ্ট হইয়া থাকে। দ্রাবিড়দেশীয় ধার্ম্মিকই তাহার প্রমাণস্বরূপ। তিনি কাণা, খঞ্জ, বধির ও রাত্র্যন্ধ; এরূপ লম্বোদর যে রাক্ষসের ন্যায় রাশি রাশি ভোজন করিয়াও উদর পূর্ণ হয় না। শুষ্কলতারচিত পুষ্পকরণ্ডক ও আঙ্কুশিক লইয়া বনে বনে ভ্রমণ ও বৃক্ষে বৃক্ষে আরোহণ করাতে বানরগণ কুপিত হইয়া তাঁহার নাসা কর্ণ ছিন্ন করিয়াছে এবং ভল্লূকের তীক্ষ্ণ নখে গাত্র ক্ষত বিক্ষত হইয়াছে। রাজকুমারের লোকজন তথায় উপস্থিত হইবামাত্র তিনি তাহাদের সহিত কলহ আরম্ভ করিলেন।
