কন্যাজনেরা বহিস্তোরণের নিকট হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইল। চন্দ্রাপীড় কেয়ূরককর্ত্তৃক আনীত ইন্দ্রায়ুধে আরোহণ করিয়া কাদম্বরীপ্রেরিত গন্ধর্ব্বকুমারগণ সমভিব্যাহারে হেমকূটের নিকট দিয়া গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। যাইতে যাইতে সেই পরমসুন্দরী গন্ধর্ব্বকুমারীকে কেবল অন্তঃকরণমধ্যে অবলোকন করিতেছিলেন এমন নহে, কিন্তু চতুর্দ্দিক তন্ময়ী দেখিলেন। তোমার বিরহবেদনা সহ্য করিতে পারিব না বলিয়া কাদম্বরী যেন পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতেছেন দেখিতে পাইলেন। কোথায় যাও যাইতে পাইবে না বলিয়া যেন, সম্মুখে পথ রোধ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন দেখিলেন। ফলতঃ যে দিকে দৃষ্টিপাত করেন সেই দিকেই কাদম্বরীর রূপ লাবণ্য দেখিতে পান। ক্রমে অচ্ছোদসরোবরের তীরে সন্নিবিষ্ট মহাশ্বেতার আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। তথা হইতে ইন্দ্রায়ুধের খুরচিহ্ন অনুসারে অনেক দূর যাইয়া আপন স্কন্ধাবার দেখিতে পাইলেন। গন্ধর্ব্বকুমারদিগকে সন্তোষজনক বাক্যে বিদায় করিয়া স্কন্ধাবারে প্রবেশিলেন। রাজকুমারকে সমাগত দেখিয়া সকলে অতিশয় আহ্লাদিত হইলেন। পত্রলেখা ও বৈশম্পায়নের সাক্ষাতে গন্ধর্ব্বলোকের সমুদায় সমৃদ্ধি বর্ণন করিলেন। মহাশ্বেতা অতি মহানুভাবা, কাদম্বরী পরমসুন্দরী, গন্ধর্ব্বলোকের ঐশ্বর্য্যের পরিসীমা নাই, এইরূপ নানা কথাপ্রসঙ্গে দিবাবসান হইল। কাদম্বরীর রূপ লাবণ্য চিন্তা করিয়া যামিনী যাপন করিলেন।
পর দিন প্রভাতকালে পটমণ্ডপে বসিয়া আছেন এমন সময়ে কেয়ূরক আসিয়া প্রণাম করিল। রাজকুমার প্রথমতঃ অপাঙ্গবিস্তৃত নেত্রযুগল দ্বারা তদনন্তর প্রসারিত বাহুযুগ দ্বারা কেয়ূরককে আলিঙ্গন করিয়া মহাশ্বেতা, কাদম্বরী এবং কাদম্বরীর সখীজন ও পরিজনদিগের কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসিলেন। কেয়ূরক কহিল, রাজকুমার এত আদর করিয়া যাহাদিগের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন তাহাদিগের কুশল, সন্দেহ কি! কাদম্বরী বদ্ধাঞ্জলি হইয়া অনুনয় পূর্ব্বক এই বিলেপন ও তাম্বূল গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিয়াছেন। মহাশ্বেতা বলিয়া পাঠাইয়াছেন, “রাজকুমার! যাহারা আপনাকে নেত্রপথের অতিথি করে নাই তাহারাই ধন্য ও সুখে কালযাপন করিতেছে। যে গন্ধর্ব্বনগর আপনি উৎসবময় ও আনন্দময় দেখিয়া গিয়াছেন তাহা এক্ষণে আপনার বিরহে দীন বেশ ধারণ করিয়াছে! আমি সমুদায় পরিত্যাগ করিয়াছি, রাজকুমারকে বিস্মৃত হইবার চেষ্টা পাইতেছি, কিন্তু আমার মন বারণ না মানিয়া সেই মুখচন্দ্র দেখিতে সর্ব্বদা উৎসুক। কাদম্বরী দিবসবিভাবরী আপনার প্রফুল্ল মুখকমল স্মরণ করিয়া অতিশয় অসুস্থ হইয়াছেন। অতএব আর এক বার গন্ধর্ব্বনগরে পদার্পণ করিলে সকলে চরিতার্থ হই।” শেষনামক হার শয্যায় বিস্মৃত হইয়া ফেলিয়া আসিয়াছিলেন তাহাও আপনাকে দিবার নিমিত্ত এই চামরধারিণীর করে পাঠাইয়াছেন। কেয়ূরকের মুখে কাদম্বরীর ও মহাশ্বেতার সন্দেশবাক্য শ্রবণ করিয়া রাজকুমার অতিশয় আনন্দিত হইলেন। স্বহস্তে হার, বিলেপন ও তাম্বূল গ্রহণ করিলেন। অনন্তর কেয়ূরকের সহিত মন্দুরায় গমন করিলেন। যাইতে যাইতে পশ্চাতে কেহ আসিতেছে কি না মুখ ফিরাইয়া বারংবার দেখিতে লাগিলেন। প্রতীহারীরা তাঁহার অভিপ্রায় বুঝিয়া পরিজনদিগকে সঙ্গে যাইতে নিষেধ করিল। আপনারাও সঙ্গে না গিয়া দূরে দণ্ডায়মান রহিল। চন্দ্রাপীড় কেবল কেয়ূরকের সহিত মন্দুরায় প্রবেশিয়া ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেয়ূরক! বল, আমি তথা হইতে বহির্গত হইলে গন্ধর্ব্বরাজকুমারী কিরূপে দিবস অতিবাহিত করিলেন? মহাশ্বেতা কি বলিলেন? পরিজনেরাই বা কে কি কহিল? আমার কোন কথা হইয়াছিল কি না?
কেয়ূরক কহিল, রাজকুমার! শ্রবণ করুন, আপনি গন্ধর্ব্বনগরের বহির্গত হইলে কাদম্বরী পরিজন সমভিব্যাহারে প্রাসাদশিখরে আরোহণ করিয়া আপনার গমনপথ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। আপনি নেত্রপথের অগোচর হইলেও অনেকক্ষণ সেই দিকে নেত্রপাত করিয়া রহিলেন। অনন্তর তথা হইতে নামিয়া যেখানে আপনি ক্ষণকাল অবস্থান করিয়াছিলেন সেই ক্রীড়াপর্ব্বতে গমন করিলেন। তথায় যাইয়া চন্দ্রাপীড় এই শিলাতলে বসিয়াছিলেন, এই স্থানে স্নান করিয়াছিলেন, এই স্থানে ভোজন করিয়াছিলেন, এই মরকতশিলায় শয়ন করিয়াছিলেন, এই সকল দেখিতে দেখিতে দিবস অতিবাহিত হইল। দিবাবসানে মহাশ্বেতার অনেক প্রযত্নে যৎকিঞ্চিৎ আহার করিলেন। রবি অস্তগত হইলেন। ক্রমে চন্দ্রোদয় হইল। চন্দ্রোদয়ে চন্দ্রকান্তমণির ন্যায় তাঁহার দুই চক্ষু দিয়া জলধারা পড়িতে লাগিল। নেত্র মুকুলিত করিয়া কপোলে কর প্রদান পূর্ব্বক বিষণ্ণ বদনে কতপ্রকার চিন্তা করিতে লাগিলেন। ভাবিতে ভাবিতে অতিকষ্টে শয়নাগারে প্রবেশিলেন। প্রবেশমাত্রে শয়নাগার কারাগার বোধ হইল। সুশীতল কোমল শয্যাও উত্তপ্ত বালুকার ন্যায় গাত্র দাহ করিতে লাগিল। প্রভাত হইতে না হইতেই আমাকে ডাকাইয়া আপনার নিকট পাঠাইয়া দিলেন।
গন্ধর্ব্বকুমারীর পূর্ব্বরাগজনিত বিষম দশার আবির্ভাব শ্রবণে আহ্লাদিত ও কাতর হইয়া রাজকুমার আর চঞ্চল চিত্তকে স্থির করিতে পারিলেন না। বৈশম্পায়নকে স্কন্ধাবারের রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়া পত্রলেখার সহিত ইন্দ্রায়ুধে আরোহণ পূর্ব্বক গন্ধর্ব্বনগরে চলিলেন। কাদম্বরীর বাটীর দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া ঘোটক হইতে নামিলেন। সম্মুখাগত এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসিলেন, গন্ধর্ব্বরাজকুমারী কাদম্বরী কোথায়? সে প্রণতি পূর্ব্বক কহিল, ক্রীড়াপর্ব্বতের নিকটে দীর্ঘিকাতীরস্থিত হিমগৃহে অধিষ্ঠান করিতেছেন। কেয়ূরক পথ দেখাইয়া চলিল। রাজকুমার প্রমোদবনের মধ্য দিয়া কিঞ্চিৎ দূর যাইয়া দেখিলেন, কদলীদল ও তরুপল্লবের শোভায় দিঙ্মণ্ডল হরিদ্বর্ণ হইয়াছে। তরুগণ বিকশিত কুসুমে আলোকময় ও সমীরণ কুসুমসৌরভে সুগন্ধময়। চতুর্দ্দিকে সরোবর, অভ্যন্তরে হিমগৃহ। বোধ হয় যেন, বরুণ জলক্রীড়া করিবার নিমিত্ত ঐ গৃহ নির্ম্মাণ করিয়াছেন। তথায় প্রবেশ মাত্র বোধ হয় যেন তুষারে অবগাহন করিতেছি। ঐ গৃহে সুশীতলশিলাতলবিন্যস্ত শৈবাল ও নলিনীদলের শয্যায় শয়ন করিয়াও কাদম্বরীর গাত্রদাহ নিবারণ হইতেছে না, প্রবেশিয়া দেখিলেন। কাদম্বরী রাজকুমারকে দেখিবামাত্র অতিমাত্র সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান করিয়া যথোচিত সমাদর করিলেন। মেঘাগমে চাতকীর যেরূপ আহ্লাদ হয়, চন্দ্রাপীড়ের আগমনে কাদম্বরী সেইরূপ আহ্লাদিত হইলেন। সকলে আসনে উপবিষ্ট হইলে, ইনি রাজকুমারের তাম্বূলকরঙ্কবাহিনী ও পরমপ্রীতিপাত্র, ইঁহার নাম পত্রলেখা, এই বলিয়া কেয়ূরক পত্রলেখার পরিচয় দিল। পত্রলেখা বিনীত ভাবে মহাশ্বেতা ও কাদম্বরীকে প্রণাম করিল। তাঁহারা যথোচিত সমাদর ও সম্ভাষণ পূর্ব্বক হস্ত ধারণ করিয়া আপন সমীপদেশে বসাইলেন এবং সখীর ন্যায় জ্ঞান করিতে লাগিলেন।
