কাদম্বরী চন্দ্রাপীড়ের অদর্শনে অধীর হইয়া পুনর্ব্বার প্রাসাদের শিখরদেশে আরোহণ করিলেন। দেখিলেন, তিনিও উজ্জ্বল মুক্তাময় হার কণ্ঠে ধারণ করিয়া ক্রীড়াপর্ব্বতের শিখর দেশে বিহার করিতেছেন। গন্ধর্ব্বনন্দিনী কুমুদিনীর ন্যায় চন্দ্রসদৃশ চন্দ্রাপীড়ের দর্শনে মুখবিকাস প্রভৃতি নানা বিলাস বিস্তার করিতে লাগিলেন। ক্রমে দিবাবসান হইল। সূর্য্যমণ্ডল ও দিঙ্মণ্ডল ও গগনমণ্ডল রক্তবর্ণ হইল। অন্ধকারের প্রাদুর্ভাব হওয়াতে দর্শনশক্তির হ্রাস হইয়া আসিল। কাদম্বরী সৌধশিখর হইতে ও চন্দ্রাপীড় ক্রীড়াপর্ব্বতের শিখরদেশ হইতে নামিলেন। ক্রমে সুধাংশু উদিত হইয়া সুধাময় দীধিতি দ্বারা পৃথিবীকে জ্যোৎস্নাময় করিলেন। চন্দ্রাপীড় মণিমন্দিরে শয়ন করিয়া আছেন এমন সময়ে কেয়ূরক আসিয়া কহিল, রাজকুমারী কাদম্বরী আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিতেছেন। তিনি সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক সখীজন সমভিব্যাহারে সমাগত গন্ধর্ব্বরাজপুত্রীর যথোচিত সমাদর করিলেন। সকলে উপবিষ্ট হইলে বিনীতভাবে কহিলেন, দেবি! তোমার অনুগ্রহ ও প্রসন্নতা দর্শনে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি। অনেক অনুসন্ধান করিয়াও এরূপ প্রসাদ ও অনুগ্রহের উপযুক্ত কোন গুণ আমাতে দেখিতে পাই না। ফলতঃ এরূপ অনুগ্রহ প্রকাশ করা শুদ্ধ উদার স্বভাব ও সৌজন্যের কার্য্য, সন্দেহ নাই। কাদম্বরী তাঁহার বিনয়বাক্যে অতিশয় লজ্জিত হইয়া মুখ অবনত করিয়া রহিলেন। অনন্তর, ভারতবর্ষ, উজ্জয়িনী নগরী এবং চন্দ্রাপীড়ের বন্ধু বান্ধব, জনক জননী ও রাজ্যসংক্রান্ত নানাবিধ কথাপ্রসঙ্গে অনেক রাত্রি হইল। কেয়ূরককে চন্দ্রাপীড়ের নিকটে থাকিতে আদেশ করিয়া কাদম্বরী শয়নাগারে গমন পূর্ব্বক শয্যায় শয়ন করিলেন। চন্দ্রাপীড়ও সুশীতল শিলাতলে শয়ন করিয়া কাদম্বরীর নিরভিমান ব্যবহার, মহাশ্বেতার নিষ্কারণ স্নেহ, কাদম্বরীপরিজনের অকপট সৌজন্য. গন্ধর্ব্বনগরের রমণীয়তা ও সুখসমৃদ্ধি মনে মনে চিন্তা করিতে করিতে যামিনী যাপন করিলেন।
তারাপতি সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়া প্রভাতে নিভৃত প্রদেশে নিদ্রা যাইবার নিমিত্ত যেন, অস্তাচলের নির্জ্জন প্রদেশ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। প্রভাতসমীরণ মালতীকুসুমের পরিমল গ্রহণ করিয়া সুপ্তোত্থিত মানবগণের মনে আহ্লাদ বিতরণ পূর্ব্বক ইতস্ততঃ বহিতে লাগিল। প্রদীপের প্রভার আর প্রভাব রহিল না। পল্লবের অগ্র হইতে নিশার শিশির মুক্তার ন্যায় ভূতলে পড়িতে লাগিল। তেজস্বীর অনুচরও অনায়াসে শত্রুবিনাশে সমর্থ হয়, যে হেতু সূর্য্যসারথি অরুণ উদিত হইয়াই সমস্ত অন্ধকার নিরস্ত করিয়া দিলেন। শত্রুবিনাশে কৃতসংকল্প লোকেরা রমণীয় বস্তুকেও অরাতিপক্ষপাতী দেখিলে তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট করে, যে হেতু অরুণ তিমির বিনাশে উদ্যত হইয়া সুদৃশ্য তারাগণকেও অদৃশ্য করিয়া দিলেন; প্রভাতে কমল বিকসিত ও কুমুদ মুকুলিত হইতে আরম্ভ হইলে উভয় কুসুমেরই সমান শোভা হইল এবং মধুকর কলরব করিয়া উভয়তেই বসিতে লাগিল। অরুণোদয়ে তিমির নিরস্ত হইলে চক্রবাক প্রিয়তমার সন্নিধানে গমনের উদ্যোগ করিতেছে এমন সময়ে বিরহকাতরা চক্রবাকী প্রিয়তমের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইল। দিবাকরের উদয়ের সময় বোধ হইল যেন, দিগঙ্গনারা সাগরগর্ভ হইতে সুবর্ণের রজ্জু দ্বারা হেমকলস তুলিতেছে। দিবাকরের লোহিত কিরণ জলে প্রতিফলিত হওয়াতে বোধ হইল যেন, বাড়বানল সলিলের অভ্যন্তর হইতে উত্থিত হইয়া দিগ্বলয় দাহ করিবার উদ্যোগ করিতেছে। চিরকাল কাহারও সমান অবস্থা থাকে না প্রভাতে কুমুদবন ভ্রষ্ট, কমলবন শোভাবিশিষ্ট, শশী অস্তগত, রবি উদিত, চক্রবাক প্রীত ও পেচক বিষণ্ণ হইয়া যেন ইহাই প্রকাশ করিতে লাগিল।
চন্দ্রাপীড় গাত্রোত্থানপূর্ব্বক মুখ ধৌত করিয়া প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিলেন। কাদম্বরী কোথায় আছেন জানিবার নিমিত্ত কেয়ূরককে পাঠাইলেন। কেয়ূরক প্রত্যাগত হইয়া কহিল, মন্দরপ্রাসাদের নিম্ন দেশে অঙ্গনসৌধবেদিকায় মহাশ্বেতা ও কাদম্বরী বসিয়া আছেন। চন্দ্রাপীড় তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কেহ বা রক্তপটব্রতধারিণী কেহ বা পাশুপতব্রতধারিণী তাপসী; বুদ্ধ জিন কার্ত্তিকেয় প্রভৃতি নানা দেবতার স্তুতিপাঠ করিতেছেন। মহাশ্বেতা সাদর সম্ভাষণ ও আসন দান দ্বারা দর্শনাগত গন্ধর্ব্বপুরন্ধ্রীদিগের সম্মাননা করিতেছেন। কাদম্বরী মহাভারত শুনিতেছেন। তথায় আসনে উপবিষ্ট হইয়া মহাশ্বেতার প্রতি দৃষ্টিপাত পূর্ব্বক কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন। মহাশ্বেতা চন্দ্রাপীড়ের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া কাদম্বরীকে কহিলেন, সখি! সঙ্গিগণ রাজকুমারের বৃত্তান্ত কিছুই জানিতে না পারিয়া অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আছেন, ইনিও তাহাদের নিকট যাইতে নিতান্ত উৎসুক। কিন্তু তোমার গুণে ও সৌজন্যে বশীভূত হইয়া যাইবার কথা উল্লেখ করিতে পারিতেছেন না। অতএব অনুমতি কর, ইনি তথায় গমন করুন। ভিন্নদেশবর্ত্তী হইলেও কমলিনী ও কমলবান্ধবের ন্যায় এবং কুমুদিনী ও কুমুদনাথের ন্যায় তোমাদিগের পরস্পর প্রীতি অবিচলিত ও চিরস্থায়িনী হউক।
সখি! আমি দর্শন অবধি রাজকুমারের অধীন হইয়াছি, অনুরোধের প্রয়োজন কি? রাজকুমার যাহা আদেশ করিবেন তাহাতেই সম্মত আছি। কাদম্বরী এই কথা কহিয়া গন্ধর্ব্বকুমারদিগকে ডাকাইয়া আদেশ করিলেন, তোমরা রাজকুমারকে আপন স্কন্ধাবারে রাখিয়া আইস। চন্দ্রাপীড় গাত্রোত্থানপূর্ব্বক বিনয় বাক্যে মহাশ্বেতার নিকট বিদায় লইলেন। অনন্তর কাদম্বরীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেবি! বহুভাষী লোকের কথায় কেহ বিশ্বাস করে না। অতএব অধিক কথায় প্রয়োজন নাই। পরিজনের কথা উপস্থিত হইলে আমাকেও এক জন পরিজন বলিয়া স্মরণ করিও। এই বলিয়া অন্তঃপুরের বহির্গত হইলেন। কাদম্বরী প্রেমস্নিগ্ধ চক্ষু দ্বারা এক দৃষ্টে দেখিতে লাগিলেন। পরিজনেরা বহিস্তোরণ পর্য্যন্ত অনুগমন করিল।
