এইরূপ নানা হাস্য পরিহাস হইতেছে এমন সময়ে কঞ্চুকী আসিয়া বলিল, মহাশ্বেতে! গন্ধর্ব্বরাজ চিত্ররথ ও মহিষী মদিরা আপনাকে আহ্বান করিতেছেন। মহাশ্বেতা তথায় যাইবার সময় কাদম্বরীকে জিজ্ঞাসিলেন, সখি! চন্দ্রাপীড় এক্ষণে কোথায় থাকিবেন? কাদম্বরী কহিলেন, প্রিয়সখি! কি জন্য তুমি এরূপ জিজ্ঞাসা করিতেছ? দর্শন অবধি আমি চন্দ্রাপীড়কে মন, প্রাণ, গৃহ, পরিজন সমুদায় সমর্পণ করিয়াছি। ইনি সমুদায় বস্তুর অধিকারী হইয়াছেন। যেখানে রুচি হয় থাকুন! তোমার প্রাসাদের সমীপবর্ত্তী ঐ প্রমোদবনে ক্রীড়াপর্ব্বতের প্রস্থদেশস্থ মণিমন্দিরে গিয়া চন্দ্রাপীড় অবস্থিতি করুন, এই কথা বলিয়া মহাশ্বেতা চলিয়া গেলেন। বিনোদের নিমিত্ত কতিপয় বীণাবাদিকা গায়িকা সমভিব্যাহারে দিয়া কাদম্বরী চন্দ্রাপীড়কে তথায় যাইতে কহিলেন। কেয়ূরক পথ দেখাইয়া অগ্রে অগ্রে চলিল। তাঁহার গমনের পর কাদম্বরী শয্যায় নিপতিত হইয়া জাগ্রদবস্থায় স্বপ্ন দেখিলেন, যেন লজ্জা আসিয়া কহিল, চপলে! তুমি কি কুকর্ম্ম করিয়াছ? আজি তোমার এরূপ চিত্তবিকার কেন হইল? কুলকুমারীদিগের এরূপ হওয়া কোন ক্রমেই উচিত নয়। লজ্জা কর্ত্তৃক তিরস্কৃত হইয়া মনে মনে কহিলেন, আমি মোহান্ধ হইয়া কি চপলতা প্রকাশ করিয়াছি! এক জন উদাসীন অপরিচিত ব্যক্তির সমক্ষে নিঃশঙ্ক চিত্তে কতভাব প্রকাশ করিলাম। তাঁহার চিত্তবৃত্তি, অভিপ্রায়, স্বভাব কিছুই পরীক্ষা করিলাম না, তিনি কিরূপ লোক কিছু জানিলাম না। অথচ তাঁহার হস্তে মন, প্রাণ, সমুদায় সমর্পণ করিলাম। লোকে এই ব্যাপার শুনিলে আমাকে কি বলিবে? আমি সখীদিগের সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যাবৎ মহাশ্বেতা বৈধব্যদশায় ক্লেশভোগ করিবেন, তত দিন সাংসারিক সুখে বা অলীক আমোদে অনুরক্ত হইব না; আমার সেই প্রতিজ্ঞা আজি কোথায় রহিল। সকলেই আমাকে উপহাস করিবে, সন্দেহ নাই। পিতা এই ব্যাপার শুনিয়া কি মনে করিবেন? মাতা কি ভাবিবেন? প্রিয়সখী মহাশ্বেতার নিকট কি বলিয়া মুখ দেখাইব? যাহা হউক আমার অত্যন্ত লঘুহৃদয়তা ও চপলতা প্রকাশ হইয়াছে। বুঝি আমার চপলতা প্রকাশ করাইবার নিমিত্তই প্রজাপতি ও রতিপতি মন্ত্রণাপূর্ব্বক এই উদাসীন পুরুষকে এখানে পাঠাইয়া থাকিবেন। অন্তঃকরণে একবার অনুরাগ সঞ্চার হইলে তাহা ক্ষালিত করা দুঃসাধ্য। কাদম্বরী এইরূপ ভাবিতেছিলেন এমন সময়ে প্রণয় যেন সহসা তথায় আসিয়া কহিল, কাদম্বরী! কি ভাবিতেছ? তোমার অলীক অনুরাগে ও কপট মিত্রতায় বিরক্ত হইয়া চন্দ্রাপীড় এখান হইতে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইয়াছেন। গন্ধর্ব্বকুমারী তখন আর স্থির হইয়া থাকিতে পারিলেন না। অমনি শয্যা হইতে ত্বরায় উঠিয়া গবাক্ষদ্বার উদ্ঘাটন পূর্ব্বক এক দৃষ্টে ক্রীড়াপর্ব্বতের দিকে চাহিয়া রহিলেন।
২.০৯ চন্দ্রাপীড় মণিমন্দিরে প্রবেশিয়া
চন্দ্রাপীড় মণিমন্দিরে প্রবেশিয়া শিলাতলবিন্যস্ত শয্যায় শয়ন করিয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন, গন্ধর্ব্বরাজদুহিতা আমার সমক্ষে যেরূপ ভাব ভঙ্গি প্রকাশ করিলেন সে সকল কি তাঁহার স্বাভাবিক বিলাস, কি মকরকেতু আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া প্রকাশ করাইলেন? তাঁহার তৎকালীন বিলাসচেষ্টা স্মরণ করিয়া আমার অন্তঃকরণ চঞ্চল হইতেছে। আমি যখন সেই সময়ে তাঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তখন মুখ অবনত করিয়াছিলেন। যখন অন্যাসক্তদৃষ্টি হই তখন আমার প্রতি কটাক্ষপাত পূর্ব্বক ছলক্রমে মন্দ মন্দ হাসিয়াছিলেন। অনঙ্গ উপদেশ না দিলে এ সকল বিলাস প্রকাশ হয় না। যাহা হউক, অলীক সংকল্পে প্রতারিত হওয়া বুদ্ধিমানের কর্ম্ম নহে। অগ্রে তাঁহার মন পরীক্ষা করিয়া দেখা উচিত। এই স্থির করিয়া সমভিব্যাহারিণী বীণাবাদিনী ও গায়িকাদিগকে গান বাদ্য আরম্ভ করিতে আদেশ দিলেন। গানভঙ্গ হইলে উপবনের শোভা অবলোকন করিবার নিমিত্ত ক্রীড়াপর্ব্বতের শিখরদেশে উঠিলেন। কাদম্বরী গবাক্ষদ্বার দিয়া দেখিতে পাইয়া মহাশ্বেতার আগমন দর্শনচ্ছলে তথা হইতে প্রাসাদের উপরিভাগে আরোহণ করিয়া হৃদয়বল্লভের প্রতি অনুরাগসঞ্চারের চিহ্নস্বরূপ নানাবিধ অনঙ্গলীলা ও মনোহর বিলাস প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তাহাতেই এরূপ অন্যমনস্ক হইলেন যে, যে ব্যপদেশে প্রাসাদের শিখরদেশে উঠিলেন তাহাতে কিছুমাত্র মনোযোগ রহিল না। মহাশ্বেতা আসিয়া প্রতিহারী দ্বারা সংবাদ দিলে সৌধশিখর হইতে অবতীর্ণ হইলেন ও স্নান ভোজন প্রভৃতি সমুদায় দিবসব্যাপার সম্পন্ন করিলেন।
চন্দ্রাপীড় মণিমন্দিরে স্নান ভোজন সমাপন করিয়া মরকতশিলাতলে বসিয়া আছেন এমন সময়ে তমালিকা, তরলিকা ও অন্যান্য পরিজন সমভিব্যাহারে কাদম্বরীর প্রধান পরিচারিকা মদলেখা আসিতেছে দেখিলেন। কাহারও হস্তে সুগন্ধি অঙ্গরাগ, কাহারও করে মালতীমালা, কাহারও বা পাণিতলে ধবল দুকূল এবং এক জনের করে এক ছড়া মুক্তার হার। ঐ হারের এরূপ উজ্জ্বল প্রভা যে চন্দ্রোদয়ে যেরূপ দিঙ্মণ্ডল জ্যোৎস্নাময় হয়, উহার প্রভায় সেইরূপ চতুর্দ্দিক্ আলোকময় হইয়াছে। মদলেখা সমীপবর্ত্তিনী হইলে চন্দ্রাপীড় যথোচিত সমাদর করিলেন। মদলেখা স্বহস্তে রাজকুমারের অঙ্গে অঙ্গরাগ লেপন করিয়া দিল, বস্ত্রযুগল প্রদান করিল এবং গলে মালতীমালা সমর্পণ করিয়া কহিল, রাজকুমার! আপনার আগমনে অনুগৃহীত, আপনার সরল স্বভাব ও প্রকৃতিমধুর ব্যবহারে বশীভূত এবং আপনার অহঙ্কারশূন্য সৌজন্যে সন্তুষ্ট হইয়া কাদম্বরী বয়স্যভাবে প্রণয়সঞ্চারের প্রমাণস্বরূপ এই হার প্রেরণ করিয়াছেন। তিনি আপনার ঐশ্বর্য্য বা সম্পত্তি দেখাইবার আশয়ে পাঠান নাই। ইহা কেবল শুদ্ধ সরলস্বভাবতার কার্য্য বিবেচনা করিয়া অনুগ্রহ পূর্ব্বক গ্রহণ করুন। রত্নাকর এই হার বরুণকে দিয়াছিলেন। বরুণ গন্ধর্ব্বরাজকে এবং গন্ধর্ব্বরাজ, কাদম্বরীকে দেন। অমৃতমন্থনসময়ে দেবগণ ও অসুরগণ সাগরের অভ্যন্তর হইতে সমস্ত রত্ন গ্রহণ করিয়াছিলেন, কেবল ইহাই শেষ ছিল; এই নিমিত্ত এই হারের নাম শেষ। গগনমণ্ডলেই চন্দ্রের উদয় শোভাকর হয় এই বিবেচনা করিয়া রাজকুমারের কণ্ঠে পরাইয়া দিবার নিমিত্ত এই হার পাঠাইয়াছেন। এই বলিয়া চন্দ্রাপীড়ের কণ্ঠদেশে হার পরাইয়া দিল। চন্দ্রাপীড় কাদম্বরীর সৌজন্য ও দাক্ষিণ্য এবং মদলেখার মধুর বচনে চমৎকৃত ও বিস্মিত হইয়া কহিলেন, তোমাদিগের গুণে অতিশয় বশীভূত হইয়াছি। কাদম্বরীর প্রদান বলিয়া হার গ্রহণ করিলাম। অনন্তর সন্তোষজনক নানা কথা বলিয়া ও কাদম্বরীসম্বদ্ধ নানা সংবাদ শুনিয়া মদলেখাকে বিদায় করিলেন।
