রঘুপতি বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নাড়ল। এসিজি বেরিয়ে গেলেন বলরুম ছেড়ে।
বাইরের বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরাতেই দেখতে পেলেন, বলরুমের আর-একটা কাচের দরজা ঠেলে ভাস্কর রাহাও বেরিয়ে আসছেন। উদ্দেশ্য বোধহয় একই ধূমপান।
এসিজি ভাস্কর রাহাকে লক্ষ্য করে হাত নাড়লেন।
চুরুট ধরিয়ে খোলা বারান্দায় এসিজির কাছে চলে এলেন ভাস্কর। চারপাশে সোনা-রোদ, নীল আকাশ, হালকা ঠান্ডা বাতাস, টবে সাজানো গাছ। সামনের বড় রাস্তায় বেলা সাড়ে এগারোটার ব্যস্ততা।
এক মুখ ধোয়া ছেড়ে স্মিত হেসে ভাস্কর রাহা সপ্রশ্নে তাকালেন এসিজির দিকে। দেবারতি খুন হওয়ার পর থেকে এই বৃদ্ধ অধ্যাপক তাদের কম জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। গতকালও তার প্রশ্নবাণের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি, তার ওপর ঘর তল্লাশি করার নাজেহাল ব্যাপার।
আজই তো শেষদিন ভাস্করবাবু, শেষদিন শব্দটার ওপরে একটু জোর দিয়ে যেন বললেন এসিজি।
ভাস্কর রাহা ঘাড় নাড়লেন নীরবে।
আপনি কখনও রুবিক কিউব দেখেছেন, ভাস্করবাবু?
না– মাথা নাড়লেন ভাস্কর।
হাঙ্গেরির এক অধ্যাপক ছাত্রদের গ্রুপ থিয়োরি পড়াতে গিয়ে একটা কিউব তৈরি করেছিলেন ১৯৭৫ সালে। সেই অধ্যাপকের নাম আর্নো রুবিক। এই কিউবে কতকগুলো খুদে-খুদে রঙিন কিউব জুড়ে তৈরি করা হয়েছে একটা বড় কিউব। খুদে কিউবের থাকগুলোকে নানানভাবে ঘুরিয়ে বড় কিউবটার ছটা পিঠে নানানরকম নকশা তৈরি করা যায়। ভারি মজার ধাঁধা…।
ভাস্কর রাহা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না এখন তার কী বলা উচিত। এই বৃদ্ধ গোয়েন্দা হঠাৎই বা তাকে রুবিক কিউবের গল্প শোনাচ্ছেন কেন?
এসিজি রুবিক কিউব নিয়ে যেন আপনমনেই নানান কথা বলছিলেন আর সিগারেটে টান দিচ্ছিলেন ক্রমাগত। তার মাথার ভেতরে খুদে কিউবগুলো বনবন করে ঘুরপাক খেয়ে দেবারতি মানির খুনের নকশা তৈরি করার চেষ্টা করছিল।
আচ্ছা ভাস্করবাবু, আপনাদের মধ্যে কারা কারা ড্রিঙ্ক করেন বলতে পারেন? হঠাৎই জানতে চাইলেন এসিজি।
মজা করে হাসলেন ভাস্কর, বললেন, ঠিক বলতে পারব না–তবে অনেকেই এ-রসে অভ্যস্ত। এটা না হলে লেখালিখি ঠিক জমে না…।
তার মানে? নেশা না করলে আপনার লিখতে অসুবিধে হয়?
আবার প্রসন্ন হাসলেন রাহা : ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা খুব মুশকিল। মানে, আমার লেখার মূল সূত্র হচ্ছে, রহস্যের প্রত্যেকটি টুকরোকে কল্পনার সুতোয় গেঁথে খুশিমতো খেলিয়ে তারপর সেগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া সাদা কাগজের পৃষ্ঠায়। একটু-আধটু নেশা করলে লাগামছাড়া কল্পনার সুতো খুশিমতো খেলা করতে পারে–অন্তত আমার তাই মনে হয়…।
মাই গড! অবাক হয়ে বলে উঠলেন এসিজি। তার চোখের নজর ভাস্কর রাহার শরীর ভেদ করে যেন চলে গেছে কোন দিগন্তে। কপালে বয়েসের কারুকাজ। বাতাসে সাদা চুল উড়ছে। দূরে পাখি ডাকছে কোথাও। আর তার মগজের ভেতরে বনবন করে পাক খাওয়া খুদে কিউবগুলো চোখের পলকে নিজেদের সাজিয়ে নিয়ে ফুটিয়ে তুলল রুবিক কিউবের অভিনব এক নকশা দেবারতি মানির খুনের নকশা।
কী আশ্চর্য! এই সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে এ কদিন কী নাজেহালটাই না হয়েছেন অশোকচন্দ্র! এখন তো বলতে গেলে সব জলের মতো স্পষ্ট! ঝাপসা যেটুকু আছে তা অতি সামান্য। রঞ্জন দেবনাথ পরশুদিন ঠিকই বলেছিল? আপনার থিঙ্কিং মেশিন বিগড়ে গেছে রিপেয়ার করতে হবে।
ভাস্করবাবু, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ– এসিজির গলার স্বর কাঁপছিল।
কেন? ভাস্কর রাহা এই বৃদ্ধ হুনুরের আচরণের কোনও থই পাচ্ছিলেন না।
এখন আমি জানি, দেবারতি মানিকে কে খুন করেছে, কীভাবে খুন করেছে। আজ সন্ধে সাতটার সময় আপনার ঘরে সবাইকে থাকতে বলবেন–
নাটকের শেষ দৃশ্য? ঠাট্টা করে জিগ্যেস করলেন রাহা।
আপনাদের সাহিত্যের ভাষায় হয়তো তাই একটু থেমে সিগারেটে টান দিয়ে এসিজি বললেন, তবে আমার কাছে পাখি ধরার কাজ। বুঝলেন, দেবারতি মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী ছিল।
কেন?
খুব মজার হিন্টস দিয়েছিল। দারুণ! আপনমনেই হাসতে শুরু করলেন এসিজি।
রঘুপতি যাদব কখন যেন এসে হাজির হয়েছিল খোলা বারান্দায়। অশোকচন্দ্রকে হাসতে দেখে সে অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কিউ স্যার, কেয়া বাত হ্যায়? কোই খাস বাত হ্যায় কেয়া?
ওর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ডান হাত তুললেন এসিজি। হাসতে-হাসতেই বললেন, ওহে আমার প্রাক্তন ছাত্র, অতি দুর্লভ প্রজাতির একটি পাখি আজ সন্ধেবেলা তুলে দেব তোমার হাতে…।
রঘুপতি যাদব ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল তার প্রাক্তন স্যার-এর দিকে।
.
প্রতীক্ষায়-প্রতীক্ষায় যেন ধৈর্যচ্যুতির সীমারেখায় পৌঁছে গেছেন প্রত্যেকে। কারণ, ঘড়িতে এখন সাতটা বেজে পাঁচ মিনিট। ভাস্কর রাহার দুশো আট নম্বর ঘরে এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে বা বসে অপেক্ষা করছেন দশজন রহস্য-লেখক। তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন বোধহয় স্বাভাবিক নয়। বার্ষিক রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সম্মেলন শেষ হয়ে গেলেও এখন হয়তো শুরু হবে তার আসল সমাপ্তি অনুষ্ঠান।
অনামিকা একটা পালিশ করা কাঠের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল। আর মাঝে-মাঝেই নীচু গলায় কথা বলছিল পাশে দাঁড়ানো রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে।
রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় বসে ছিলেন বিছানায়। তাঁর পাশে রূপেন মজুমদার আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের কাছ থেকে খানিকটা দূরে সোফায় বসে আছেন অধ্যাপক অনিমেষ চৌধুরি, জ্যোতিষ্ক সান্যাল আর অর্জুন দত্ত।
