বোধহয় কেউ ধাক্কা-টাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। দায়সারা উত্তর দিলেন উৎপল। তারপর আবার বললেন, আসলে অনেকদিন আমি কোনও গোয়েন্দা গল্প লিখিনি। কারণ, গোয়েন্দা গল্প লিখতে হলে একটু বড় জায়গা দরকার–ততটা জায়গা কোনও পত্রিকা দিতে চায় না। মানে, আমাকে দিতে চায় না।
উৎপলের কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন তেতো হতাশা সূক্ষ্মভাবে যেন অনুভব করতে পারলেন অশোকচন্দ্র। কিছুক্ষণ কী ভাবলেন, তারপর বললেন, ঠিক আছে একটা কথার সরাসরি জবাব দিন…দেবারতিকে কে খুন করেছে?
কে খুন করেছে সেটা উৎপলেন্দুর জানা নেই। কিন্তু যে-ই করুক, কাজটা কি খুব একটা খারাপ হয়েছে। তা ছাড়া, সত্যিই যদি উৎপলেন্দু সেন খুনিকে চিনতেন, তাহলেও কি এ-প্রশ্নের জবাবে ফস করে বলে দিতেন খুনির নাম! মনে মনে হাসলেন তিনি। মুখে বললেন, কে খুন করেছে। জানি না। তবে আমরা যখন গোয়েন্দা গল্প লিখি তখন এমন কাউকে খুনি সাজাই যাকে কেউ কখনও খুনি বলে ভাবতেই পারবে না। ওই দ্য মার্ডার অফ রজার অ্যাকরয়েড-এর মতো।
বেশ বলেছেন, ছোট্ট করে মন্তব্য করলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। তারপর ও দেবারতি মানি আপনার কোনও ইন্টারভিউ নিয়েছিল?
হ্যাঁ, নিয়েছিল। লেখালিখি নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন।
ও.কে.। থ্যাংক ইউ, উৎপলেন্দুকে ধন্যবাদ জানালেন সহযোগিতার জন্য। তারপর রূপেন মজুমদারকে লক্ষ করে একই কথা জানতে চাইলেন ও কীভাবে খুন করা হয়েছে দেবারতিকে।
রূপেন মজুমদার জিভের ডগা দিয়ে মাড়ির দাঁত খোঁচাচ্ছিলেন। এসিজির প্রশ্নে ছোট্ট করে একটা জড়ানো শব্দ করলেন। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা সুপুরির কুচি বের করে মুখে ছুঁড়ে দিলেন। কয়েক সেকেন্ড চোয়াল নেড়ে বললেন, মিস্টার গুপ্ত, কোনও সাহেবী আইডিয়া ধার করে আমি আপনাকে কিছু বলব না–যা বলব সবই নিজের। আমার প্রথম বই ডাকিনীর হাতছানি তে এই ধরনের একটা খুন ছিল। একটা বন্ধ ঘরের ভেতরে একজন যুবতী নিহত হয়ে পড়ে আছে। তার বুকে ছুরির গভীর ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু দরজায় খিল আঁটা আর জানলায় বেশ ঘন মোটা মোটা গরাদ। মেয়েটি মরে পড়ে আছে জানলা থেকে অনেক দূরে। মানে, একটু আগে আপনি যা বললেন ইম্পসিবল প্রবলেম। কিন্তু ওই জন ডিকসন কার নামে কোনও এক সাহেবের কথা আপনি যে বললেন, তার বই পড়া তো দুরের কথা, তাঁর নামই আমি কোনওদিন শুনিনি। আমার ব্যাপারটা সবসময়েই ওরিজিন্যাল। নইলে আমাদের একটা হ্যাংলাপনা আছে দেখবেন, সাহেবদের কথা গদগদ হয়ে মেনে নেওয়া। সাহেব বলিয়াছেন, তাই উহা সত্য…।
নিজের রসিকতায় নিজেই হাসলেন রূপেন মজুমদার। আড়চোখে রত্নাবলী আর উৎপলেন্দুকে একবার দেখে নিয়ে আবার বললেন, স্পষ্ট কথা বললাম বলে কিছু মনে করবেন না জানেন, সাহেবদের লেখার প্রভাবের জন্যেই আমাদের বাংলা ক্রাইম ফিকশানকে কেউ আমল দিতে চায় না। ভাবে, আমরা সবাই চোর। সেইজন্যেই তো আমার সব বইতেই লেখা থাকে, কাহিনিটি সম্পূর্ণ মৌলিক–।
রত্নাবলী বেশ বুঝতে পারছিলেন, রূপেন মজুমদারের কথার খোঁচাটা তাকে লক্ষ করে যতটা উৎপলেন্দুকে লক্ষ করে ততটা নয়। আর উৎপলেন্দু হতবাক হয়ে রূপেন মজুমদারের নির্লজ্জ ঢাক পেটানো দেখছিলেন। সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন লোকের সামনে কেমন অনায়াসে নিজেকে জাহির করছেন। আজকের যুগে নির্লজ্জতাও বোধহয় একটা আর্ট।
রূপেন মজুমদারের অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে বিরক্ত হচ্ছিলেন এসিজি। কিন্তু পেশেন্টদের ওপর বিরক্ত হওয়া নার্সদের ধর্ম নয়। কারণ গূঢ় রোগলক্ষণগুলো জানতে হলে ধৈর্য ধরে পেশেন্টের সব কথা শুনতে হয়। সুতরাং মজুমদারের কথা শেষ হতেই তিনি জিগ্যেস করলেন, কিন্তু আপনার ওই প্রথম বইতে যুবতীটি খুন হয়েছিল কীভাবে?
ডাকিনীর হাতছানি আপনি পড়েননি? অবাক হওয়া হাসিতে মুখ ভরিয়ে রূপেন বললেন, ঠিক আছে, আপনাকে এক কপি প্রেজেন্ট করব। আমার ঘরে বই আছে। তারপর খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রঘুপতি যাদবের দিকে তাকিয়ে : আপনাকেও এক কপি দেব। পড়ে দেখবেন। এমন নতুন সব আইডিয়া দিয়েছি যে, তাজ্জব হয়ে যাবেন।
রঘুপতি যাদব পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সকলের কথা শুনছিল। কোনও মন্তব্য করেনি। কিন্তু রূপেনের কথার পর সে আর চুপ করে থাকতে পারল না। রূঢ় গলায় বলে উঠল, আপনার ওই কিতাবের মতো আপনার ব্রেনটাও কি ঘরে জমা করে এসেছেন, মজুমদারবাবু? স্যার আপনাকে তখন থেকে কী জিগ্যেস করছেন তা আপনার মাথায় ঢুকছে না?
রূপেন মজুমদার চোখের পলকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। আমতা-আমতা করে এসিজিকে বললেন, খুনটা হয়েছিল জানলা দিয়ে। ছুরির হাতলে নাইলনের দড়ি বেঁধে খুনি ছুরিটা ছুঁড়ে মেরেছিল মেয়েটাকে লক্ষ করে। তারপর কাজ হাসিল হয়ে যেতেই দড়ি টেনে ছুরিটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।
বাঃ, কায়দাটা বেশ নতুন তো! ডিকসন কারের কোনও গল্পে এরকম ইনজিনিয়াস মোডাস অপার্যানডাই-এর কথা বলা নেই– প্রশংসা করলেন রত্নাবলী। কিন্তু উৎপলেন্দুর যেন মনে হল, ওঁর প্রশংসার মধ্যে কোথায় যেন বিদ্রুপের তীর লুকোনো রয়েছে।
প্রশংসায় রূপেন মজুমদার খানিকটা বেপরোয়া হয়ে ঢাক পেটাতে শুরু করলেন? তাহলেই দেখুন, ওই সাহেবের চেয়ে বুদ্ধিতে আমি কিছু কম যাই না! তা ছাড়া আমার গল্পে এরকম গরাদ ছাড়া জানলা আর দু-দিক থেকেই লক করা যায় এমন সাহেবী দরজা ছিল না। এসব থাকলে খুনের কায়দা তৈরি করা তো জলের মতো সহজ! নাটকীয়ভাবে একটু থামলেন রূপেন মজুমদার। তৃপ্তির অহঙ্কার আর এক চিলতে হাসি তার চোখেমুখে। পাতলা হয়ে আসা মাথার চুল ডান হাতের আলতো ছোঁয়ায় ঠিক করে নিলেন। তারপর সরাসরি তাকালেন এসিজির চোখে।
