ভাস্কর রাহা পকেট থেকে আধপোড়া চুরুটটা বের করে আবার ধরালেন। বিকেলের রোদ মরে গিয়ে সন্ধ্যা নামছে। রাস্তার ওপারের বাড়িগুলো ছায়া-ছায়া হয়ে গেছে।
মাথার লম্বা-লম্বা সাদা চুলে হাত বুলিয়ে তিনি ভাবলেন, দেবারতি মানি হয়তো তার অনুরোধ রাখবে। কিন্তু চারদিন পরে ও যদি সেই গোপন খবরটা ফাস করে তা হলেও কী বিপদ কম হবে!
ষাটের দশক থেকে বহু ঝড়ঝাপটা সহ্য করে রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্য আজকের এই অভিজাত জায়গায় উঠে এসেছে। গত তিরিশ বছরে লড়াই কম হয়নি। সমালোচক, সম্পাদক আর প্রকাশকদের অবজ্ঞা-উপেক্ষা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। তাদের প্রায় সকলেরই বক্তব্য, ১৯৭০ সালে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা সাহিত্যের শাখাঁটিরও অপমৃত্যু ঘটেছে। সাহিত্যের কোনও একটি শাখা যদি মাত্র একজন লেখকের ওপরে নির্ভরশীল হয়, তা হলে সেই শাখার অপমৃত্যু হওয়াই ভালো। সাহিত্যের এই শাখাঁটি সম্পর্কে যাঁরা ভাবেন, সেইসব সম্পাদক প্রকাশকরা তো পরে অন্যান্য লেখককে সুযোগ দেননি, প্রশ্রয় দেননি, আশকারা দেননি! নামি পত্র পত্রিকায় সূচিপত্রে তো কোনওদিনই রহস্য-গোয়েন্দা গল্পের কোনও জায়গা ছিল না!
ভাস্কর রাহা ভোলেননি সেই উপেক্ষার দিনগুলো, অবজ্ঞার দিনগুলো, অবহেলার দিনগুলো। নাকি বলা যায় লাঞ্ছনার দিনগুলো?
তারপর অনেক পথ মাড়িয়ে বহু কান্না-ঘাম-রক্তের পর মাত্র পাঁচ-সাত বছর হল রহস্য গোয়েন্দা সাহিত্য মর্যাদার জায়গা পেয়েছে। পাঠকরা এখন রত্নবলী মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসের জন্য অপেক্ষা করেন। তারা চান ভাস্কর রাহার নভেলেট, রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের রোমাঞ্চকর কাহিনি। গত বছরে ভাস্কর রাহার আটটা গোয়েন্দা গল্প নিয়ে টিভিতে দেখানো হল তেরো এপিসোডের সিরিয়াল তৃতীয় নয়ন। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত আটটায় ওই প্রোগ্রাম যখন শুরু হত তখন পথঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। হাজার-হাজার চোখ অপেক্ষা করত টিভির সামনে কখন ছোট পরদায় দেখা দেবে ভাস্কর রাহার শখের গোয়েন্দা সুরজিৎ সেন।
আজ ভাস্কর রাহার খ্যাতি, বাড়ি, গাড়ি–সব কিছুই লেখালিখি থেকে। কিন্তু বিলাসিতা তিনি ঘৃণা করেন। তাই হয়তো খেয়ালখুশি মতো লেখেন। যখন লিখলে প্রচুর টাকা পাওয়া যেতে পারে তখন তিনি লেখেন না। সম্পাদক-প্রকাশককে অনায়াসে হতাশ করেন। সংসারের কোনও চাহিদার দিকেই কখনও মনোযোগ দিয়ে তাকাননি। সবরকম বিলাসিতাকে বর্জন করে একটিমাত্র বিলাসিতাকে আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি–লেখার বিলাসিতা। এই তৃপ্তির জায়গাটা তিনি নষ্ট করতে চান না।
রহস্য-গোয়েন্দা সাহিত্যের এই সফলতাও তাকে ভীষণ তৃপ্তি দেয়। এ যেন সুদীর্ঘকাল লড়াইয়ের পর শ্রান্ত ক্লান্ত-রক্তাক্ত অবস্থায় হঠাৎ জিতে যাওয়া। এর আনন্দই আলাদা।
অথচ সত্তর দশকের শুরুতে অবস্থাটা কী করুণ ছিল! ক্রাইম পত্রিকার সম্পাদক এবং কর্ণধার রামচন্দ্র সাহার কাছে লেখকরা সকলে মিলে দাবি জানিয়েছিলেন, প্রকাশিত লেখার জন্য প্রত্যেক লেখককে পাঁচ টাকা করে হলেও সম্মান-দক্ষিণা দিতে হবে। সে কি ভয়ংকর যুদ্ধের কাল! ভাস্কর রাহা, উৎপলেন্দু সেন, অনিমেষ চৌধুরি, অর্জুন দত্ত, রূপেন মজুমদার–সকলেই সামিল ছিলেন সেই দাবিতে। এঁদের জন্য বড় কাগজের দরজা ছিল বন্ধ। ছোট কয়েকটি রহস্য-রোমাঞ্চ পত্রিকাই একমাত্র সম্বল। প্রকাশিত লেখার জন্য সম্মান-দক্ষিণা না-দেওয়াটা যখন ক্রমে-ক্রমে সেই সব পত্রিকার অভ্যাস ও অধিকারে দাঁড়িয়ে গেছে, ঠিক তখনই এই স্লোগান : টাকা ছাড়া আমরা লিখব না। অন্তত পাঁচটাকা হলেও দিতে হবে।
রামচন্দ্র সাহা সেই দাবি মেনে নিয়েছিলেন। চাঁদের মাটিতে পা দেওয়ার মতোই সেটা ছিল রহস্য-গোয়েন্দা সাহিত্যের একটি স্মরণীয় ক্ষণ। রামচন্দ্র সাহা অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ১৯৭৪ সালে। কিন্তু ভাস্কর রাহাদের কাছে এই মানুষটা এখনও মরেনি। কখনও মরবে না।
দেবারতি মানি এসব লড়াইয়ের কী জানে! সুতরাং ওর পক্ষেই সম্ভব, পাথরের এক ঘায়ে রহস্য-গোয়েন্দা সাহিত্যের স্ফটিক-সৌধটিকে চুরমার করে দেওয়া। ওকে বারণ করতে হবে, দরকার হলে বাধা দিতে হবে। গোপন কথা গোপনই থাক। তা নইলে এই ঝড়ের ধাক্কা হয়তো সামলে ওঠা মুশকিল হবে।
ভাস্কর রাহার কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখ ছোট হল।
কী তোর গোপন খবর, দেবারতি মানি?
.
০২.
রাত নটা নাগাদ তিনতলায় নিজের ঘরে বসে ছিলেন উৎপলেন্দু সেন। সামনে ছোট গোল টেবিলে ঠান্ডা জলের বোতল, ম্যাকডাওয়েলের ছোট খোকা, আর কাচের গ্লাস। গ্লাসে অল্প হুইস্কি ঢেলে জল মিশিয়ে তারিয়ে তারিয়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। ওর নেশার সঙ্গী হয়ে বসে আছেন আরও দুজন ও ভয়ঙ্কর পত্রিকায় সম্পাদক প্রেমময় চৌধুরি, আর রহস্য প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড-এর প্রধান মালিক কৌশিক পাল।
কৌশিক পাল বয়েসে তরুণ। সবসময় মোটর বাইকে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত স্কুল বইয়ের ব্যাবসা করে। আর আগস্ট থেকে জানুয়ারি রহস্য-রোমাঞ্চ বইয়ের ব্যাবসা। কলকাতা বইমেলার সময় কৌশিক অন্তত পঁচিশটা বই বের করে। ওর মুখে কখনও কেউ হা-হুঁতাশ শোনেনি। সবসময়েই উৎসাহে টইটম্বুর।
নিজের গ্লাসে ছোট চুমুক দিয়ে কৌশিক বলল, উৎপলদা, আপনি তা হলে ডিসেম্বরের মধ্যে আমাকে কপি রেডি করে দিচ্ছেন। দেখবেন, যেন পনেরো ফর্মার বেশি না হয়। আমি পঞ্চাশ টাকার বেশি দাম করব না।
