সম্মেলনের তাল কেটে গেল।
এরপর গল্প পড়ার কথা রূপেন মজুমদার আর রঞ্জন দেবনাথের। সেইমতো ঘোষণাও করা হল মাইকে। কিছুক্ষণ চাপা গুঞ্জনের পর রূপেন মজুমদার মঞ্চে গেলেন। খানিকটা কল্পবিজ্ঞান মেশানো একটা ক্রাইম গল্প পড়ে শোনালেন। তারপর কেমন-লাগল-গোছের ভঙ্গিতে হাসলেন। শ্রোতাদের কেউ যখন গল্প নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুললেন না, তখন নেমে এলেন মঞ্চ থেকে।
রূপেন মজুমদারের বয়েস প্রায় পঞ্চান্নছাপ্পান্ন। পনেরো-ষোলো বছর বয়েস থেকেই তার লেখা ছাপা হচ্ছে। পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে, তাই বাইশ বছর বয়েসেই নিজের টাকায় পরপর দুটো উপন্যাস ছেপে বের করেছিলেন। সেই বই দুটোর ভূমিকায় স্পষ্ট করে লেখা ছিল, উপন্যাস যুগল সম্পূর্ণভাবে তাঁর মৌলিক চিন্তার ফসল। অবশ্য যে-কোনও পাঠক বই দুটো পড়ে তার সঙ্গে একমত হবেন। কারণ, লেখা দুটোর প্লট যেমন দুর্বল, তেমনই সেকেলে তার ভাষা। পড়লেই মনে হয়, লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের ছাতার নীচ থেকে এখনও বেরোতে পারেননি।
কিন্তু এসব ব্যাপার রূপেন মজুমদারকে এতটুকু দমিয়ে রাখতে পারেনি। ভদ্রলোক একের পর এক বই লিখে গেছেন। সেগুলো যে-করে-হোক ছাপাও হয়েছে। শত্রুরা বলে সম্পাদক-প্রকাশককে তোয়াজের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে তার জুড়ি নেই। তবে গত তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে রূপেন মজুমদারের একটাই স্লোগান : তিনিই রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের একমাত্র মৌলিক লেখক। দুষ্টজনে ফিসফিসিয়ে বলে, রূপেন মজুমদারের ইংরেজি পড়ার অভ্যেস নেই, তাই এখনও সতী রয়ে গেছেন। আর উৎপলেন্দু সেন ওঁকে বলেন, বাংলা রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের একমাত্র ভার্জিন রাইটার। এখনও ওঁর ধর্ম নষ্ট হয়নি।
রঞ্জন দেবনাথকে বারবার মাইকে ডেকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যখন কর্মকর্তারা একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েছেন তখনই হুট করে সে কোত্থেকে এসে হাজির হল। স্মার্ট ভঙ্গিতে মঞ্চে উঠে গিয়ে গল্প পড়তে শুরু করল।
রঞ্জন দেবনাথের চেহারা সুন্দর। লেখালিখির লাইনে না এসে অভিনয় জগতে গেলেও সে হয়তো ছাপ ফেলতে পারত। বয়েস বড়জোর চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। চোখে এখনও চশমা ওঠেনি। গায়ের রং ফরসা, তবে সামান্য চাপা। মাথায় কোঁকড়া চুল। গালে চাপ দাড়ি, সঙ্গে মানানসই সরু গোঁফ। ধারালো নাক। উজ্জ্বল সপ্রতিভ চোখ। পরনে নীল-সবুজ স্ট্রাইপ দেওয়া ফুলহাতা শার্ট আর গাঢ় রঙের টেরিনের প্যান্ট।
রঞ্জনের গল্প পড়ার ভঙ্গিতে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসের ছাপ ফুটে বেরোচ্ছে। ভাস্কর রাহা ওর গল্পের প্রতিটি শব্দ প্রতিটি লাইন গভীর মনোযোগে শুনছিলেন। গল্পের নাম সংসারে পাপ আছে। বেশ নতুন ধরনের নাম।
রঞ্জন দেবনাথের প্রথম উপন্যাস অন্ধকারে বাঘবন্দী খেলা প্রকাশিত হয়েছিল কম করেও বারো-তেরো বছর আগে। তারপর ওর একটা গল্প সঙ্কলন বেরোয়, এবং তার বছরখানেকের মধ্যেই একটা গোয়েন্দা উপন্যাস পায়ের শব্দ নেই প্রকাশিত হয়।
রঞ্জন পত্র-পত্রিকায় কম লিখলেও পাঠকেরা ওর লেখার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তারপর একরকম আচমকাই ও লেখা ছেড়ে দেয়। বলতে গেলে, মঞ্চ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় গ্রিনরুমে। সম্পাদক-প্রকাশকদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু তারপর…।
তারপর, প্রায় এগারো বছর পর, রঞ্জন এ-বছর মাসিক গোয়েন্দা পত্রিকায় শারদীয় সংখ্যায় খুনির নাম অজানা নামে একটা নভেলেট লেখে। ক্ষুরধার বুদ্ধি মেশানো স্মার্ট লেখা। পড়লেই বোঝা যায়, রঞ্জন এগারো বছর ধরে ওর লেখার তরোয়ালে শান দিতে ভোলেনি। এই লেখাটা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সম্পাদক ও প্রকাশকরা ওর বাড়িতে হানা দিয়ে বাকি কাজটুকু সেরে ফেলেন। তারা রঞ্জন দেবনাথকে গ্রিনরুম থেকে আবার ঠেলে দেন মঞ্চের দিকে।
কিন্তু এগারো বছর বড় সুদীর্ঘ সময়। ভাবলেন ভাস্কর রাহা। এই লম্বা সময় নষ্ট করে ছেলেটা ভীষণ ভুল করেছে। নইলে এতদিনে ও প্রথম সারিতে নিজের জায়গা করে নিত।
রঞ্জন দেবনাথের গল্প পড়া শেষ। সেই সঙ্গে সম্মেলনের প্রথমদিনের কর্মসূচিতেও ইতি পড়ল। মাইকে ঘোষণা শোনা গেল, বাইরের লাউঞ্জে চা-কফির ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া পাশের হলে যে বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে সেটা দেখতেও যেন কেউ না ভোলেন।
দর্শক-আসন থেকে সকলে উঠে পড়ে রওনা হলেন দরজার দিকে। ছাই রঙের উর্দি পরা হোটেলের কয়েকজন বেয়ারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অতিথিদের অনুরোধ করছে চা-কফির কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যেতে।
ভিড় ঠেলে ভাস্কর রাহা এগোচ্ছিলেন। ওঁর পাশে উৎপলেন্দু সেন। আর পিছনে অর্জুন দত্ত আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায়।
এয়ার কন্ডিশন্ড বলরুমে চুরুটের জন্য ভাস্কর রাহার আঙুল নিশপিশ করছিল, কিন্তু তিন তারা হোটেলের আদব-কায়দা লঙঘন করতে পারেননি। এখন, দরজার বাইরে বেরোনো মাত্রই, তিনি তিনবারের চেষ্টায় একটা সস্তা চুরুট ধরালেন। উৎপলও পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, কী ভাস্করবাবু, কেমন বুঝছেন?
রাহা বেশ উৎসাহ নিয়ে খুশি-খুশি মুখে বললেন, ভালোই তো! কে ভেবেছিল, পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলা ক্রাইম ফিকশন এরকম একটা জায়গায় চলে আসবে! যাই বলুন উৎপল, এই সম্মেলনে এসে আমার বেশ লাগছে। ধরুন পশ্চিমে মডার্ন ক্রাইম স্টোরি শুরু হয়েছে ভলতেয়ারের হাতে– প্রায় আড়াইশো বছর আগে। তার প্রায় একশো বছর পর এডগার অ্যালান পো নিয়ে এলেন গোয়েন্দা দুপাঁকে। আর আমাদের এখানে ক্রাইম কাহিনির পত্তন একশো বছরের কিছু বেশি। মানে বাঁকাউল্লার দপ্তর, গিরিশচন্দ্র বসুর সেকালের দারোগার কাহিনি এইসব বইগুলো ধরলে। তার মানে, আমরা পশ্চিমের চেয়ে প্রায় দেড়শো বছর পিছিয়ে থেকে দৌড় শুরু করেছি। সে হিসেবে এখনকার অবস্থাকে তো রীতিমতো রমরমা ব্যাপার বলা যায়—
