তারিয়ে তারিয়ে রোহিমধু খেতে খেতে কে যেন বলল, পছন্দের মাগী তো বউ হল তোর, কি রে সেঙাই? একটা মাথা কাটা গেল না, রক্ত ঝরল না পাহাড়ে। সোয়দ পাচ্ছি না এ বিয়েতে। কেমন যেন নিমকছাড়া!
হু-হু–মাথা ঝাঁকাল বুড়ো খাপেগা, বিয়ের আমোদে ঢিলে দিলে চলবে না। কখন যে সালুয়ালাঙ বক্তির শররা বর্শা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তার কি কিছু ঠিক আছে? ওরাও তো পাহাড়ী, ওদের মেয়েকে আমাদের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছি। সহজে কি ছাড়বে? লড়াই একটা বাধবে বলে মনে হচ্ছে।
হু-হু, আমাদেরও তৈরি থাকতে হবে। অনেকগুলো গলায় একই ঘোষণা।
বুড়ো খাপেগা বলল, তারপর কোহিমায় কী হল সেঙাই, সে গল্প বল।
সেঙাই-এর মন গন্ধমাতাল মৌমাছির মতো একটা মনোহর মুখের চারপাশে পাক খাচ্ছিল। সে মুখ মেহেলীর। অন্য কোনো দিকে, কোনো গল্পে, কোনো কথায় তার আকর্ষণ নেই। তার সমস্ত মনোযোগ, সকল উৎসাহ একটি মুখকে দেখার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছে। ওই মুখটায় কত সুখ। কত কুহক। অন্যমনস্কের মতো সেঙাই বলল, কোহিমার কথা অনেক, মোরাঙে বসে রত্তিরে বলব।
৩৫. নকোয়া গ্রাম থেকে রাঙসুঙ
৩৫.
নানকোয়া গ্রাম থেকে রাঙসুঙ সরাসরি এসে উঠল পোকরি কেসুঙে। সাঞ্চামখাবার বাইরের ঘরে জাঁকিয়ে বসল। রাঙসুঙের সঙ্গে জনকয়েক জোয়ান ছেলে এসেছে। তাদের হাতে বড় বড় বর্শার ফলা ঝকমক করছে।
রাঙসুঙ মেজিচিজুঙের বাপ।
সমস্ত কেসুঙটাকে কাঁপিয়ে একটা হুঙ্কার ছাড়ল রাঙসুঙ, নসু কেহেঙ মাসে বউপণ পাঠালুম। এখনও তোর মেয়ের বিয়ে দিলি না! খারে বর্শাগুলো মেরে দেবার মতলব নাকি? এদিকে আমার ছেলেটা পাহাড়ে বাঘ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ঘরে থাকে না।
বিয়ে তো দেব, কিন্তু আমার মেয়েটা যে উধাও হয়েছে।
উধাও হয়েছে।
হু-হু, মেহেলীটা কেলুরি বস্তিতে পালিয়ে গেছে। হুই বস্তির সেঙাইকে বিয়ে করতে চায়।
সেঙাইকে বিয়ে করলেই হল! আমরা আগে মেয়ের বায়না দিয়ে গেছি। রক্তচোখে তাকাল রাঙসুঙ।
অপরাধীর মতো মুখ করে সাঞ্চামখাবা বলল, হু-হু, সে কথা তো একশো বার মানি। মেহেলীটা বস্তিতে থাকলে এই মাসেই বিয়ে দিতুম। কিন্তু এখন কী করি, তোরাই বল?
হুঙ্কারটা এবার আরো জোরাল শোনাল। প্রথমে ধিক্কারে গলাটা দপ করে জ্বলে উঠল রাঙসুঙের, তোরা একেবারে মাগীরও অধম। ঘর থেকে মেয়ে কেমন করে পালায়! বর্শা ছিল না? ফুড়ে রাখতে পারলি না!
ছিল। বর্শা হাঁকড়েই তো রাখতে চেয়েছিলাম মেহেলীকে, কিন্তু তার আগেই যে শয়তানের বাচ্চাটা জঙ্গলে ভাগল।
হুঃ! বিকট শব্দ করে রাঙসুঙ বলল, তারপর?
তারপর সেদিন সন্ধের সময় পলিঙা এসে খবর দিল, মেহেলী হুই কেলুরি বস্তিতে ভেগেছে। আমরা কী করি বল? সাঞ্চামখাবাকে বড়ই ম্রিয়মাণ দেখাতে লাগল।
হু–হুস করে আবার একটা লম্বা আওয়াজ করল রাঙসুঙ। খরধার বর্শার বাজুটা বাগিয়ে ধরে বলল, একেবারে ছাগী হয়ে গেছিস তোরা। কত বড় বংশ তোদের! তোদের বংশের মেয়ে ছিনিয়ে নিতে এসে কেলুরি বস্তির জেভেখাঙ মরেছিল। মেয়ে নিতে এসে তোদের কাছে কত মানুষ মাথা রেখে গেছে। এমন বনেদি বংশ তোদের, সেই বংশের নামডাক শুনে একটা মেয়ে নিয়ে ছেলের বউ করব ভেবেছিলুম।
হু-হু, বংশটা আমাদের সত্যিই বনেদি। লোটারা, সাঙটামরা, আওরা, কোনিয়াকরা–এই নাগা পাহাড়ের সব জাতের মানুষই আমাদের বংশকে খাতির করে চলে। কথাটা ঠিকই বলেছিস রাঙসুঙ। বংশগৌরবে রীতিমতো উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল সাঞ্চামোবা।
রাঙসুঙের মেজাজটা বড়ই বেয়াড়া ধরনের। নিমেষে সাঞ্চামখাবার উদ্দীপনা নিভিয়ে দিল। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে হুমকে উঠল রাঙসুঙ, থাম থাম, বেশি ফ্যাকর ফ্যাকর করতে হবে না। হুই মুখে মুখেই তোদের বংশের যত কেরামতি। না হলে ঘরের মেয়ে পিরিতের ঠেলায় শব্দুরদের বস্তিতে গিয়ে উঠতে পারে! মাগীটাকে আর ওর পিরিতের ছোঁড়াটাকে কুপিয়ে মুণ্ডু কেটে মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখতে পারলি না?
হু-হু, কী করি বল। কেলুরি বস্তিতে তাগড়া তাগড়া সব জোয়ান ছোকরা রয়েছে। বর্শা হাঁকড়ায়। সুচের একটা কোপ ঝাড়লে অনিজার বাপের সাধ্যি নেই যে বাঁচায়। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ল সাঞ্চামখাবা।
কী বললি! জানের ভয়ে বস্তির ইজ্জত বংশের ইজ্জত, সব সাবাড় করতে হবে–এমন মরদ তুই! আহে ভু টেলো। সমস্ত কেসুঙটাকে কাঁপিয়ে, ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ সালুয়ালাকে আচমকা ভয় পাইয়ে দিয়ে বীভৎস গলায় গর্জে উঠল রাঙসুঙ, ওরে টেফঙের বাচ্চা, তোর মেয়েটার জন্যে যখন বউপণ পাঠিয়েই দিয়েছি তখন ও আমার ছেলের বউ হয়ে গেছে। আমাদের বস্তি তো বেশি দূরে নয়। তিনটে চড়াই আর দুটো খাড়াই পাহাড় পেরুলেই যাওয়া। যায়। একটা লোক পাঠিয়ে দিতে পারলি না? পাঁচশো জোয়ান এনে মাগীটাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতাম। হুই সেঙাই ছোকরাটাকে এনে ওর মাংস দিয়ে কাবাব বানিয়ে খেতাম।
হু-হু, ঠিক বলেছিস। এই বুদ্ধিটা তখন ঠিক জোগায়নি। নইলে ঠিক খবর দিতুম। যাক ও সব। তোর মেজাজটা বিগড়ে গেছে। একটু রোহি মধু গিলে সেটাকে চাঙ্গা করে নে। ভীরু, ফিসফিস গলায় সাঞ্চামখাবা বলল।
হু-হু, তাই নিয়ে আয়। ইজা হুবতা! নির্বিকার ভঙ্গিতে গালাগালিটা আউড়ে কটমট করে তাকাল রাঙসুঙ। বলল, খবরটা শুনে মন একেবারে খিঁচড়ে গেছে। মনে হচ্ছে, তোর মুণ্ডুটাই বর্শার মাথায় গেঁথে বস্তিতে নিয়ে যাই।
