আহে ভু টেলো! কুৎসিত গলায় খেউড় গেয়ে উঠল সাঞ্চামখাবা। এতক্ষণ চুপচাপ, ভীরু এবং কুণ্ঠিত হয়ে থাকার পর চিৎকার করে উঠল সে। তার গলায় যেন বাজ চমকাল, ওরে টেফঙের বাচ্চা, আমার মুণ্ডু কেটে নিয়ে যেতে এসেছিস!
এসেছি তোবাদামি পাথরের আসন থেকে লাফিয়ে উঠল রাঙসুঙ। বিরাট মাথাটা ঘনঘন নড়ছে। দোলানিতে আউ পাখির পালকের অদ্ভুত মুকুটটা দুলছে। পরনে আরি পী কাপড়। নরমুণ্ড, বাঘের মাথা, চিতাবাঘের থাবা, বুনো মোষের শিঙ–পাহাড়ী পৃথিবীর ভয়াল সব ছবি সেই কাপড়ে আঁকা রয়েছে। ছোট ছোট চাপা চোখে পিঙ্গল রঙের মণিদুটো জ্বলছে। পুরু পুরু কালো ঠোঁটের ফাঁকে লালচে দাঁতগুলো ভয়ানকভাবে খিঁচিয়ে রয়েছে। বর্শার ফলায় হত্যার প্রতিজ্ঞাটা যেন ঝকমক করছে। নানকোয়া বস্তি থেকে আসার আগে সে কি ভাবতে পেরেছিল, তার থাবার এই বর্শাটার জন্য এমন একটা রক্তের ভোজ এই সালুয়ালাঙ পাহাড়ে অপেক্ষা করছে! রাঙসুঙ প্রচণ্ড শব্দ করে গর্জন করল, আজ তোর রক্ত নিয়ে গিয়ে মোরাঙ চিত্তির করব। আর মুণ্ডু গেঁথে রাখব টেটসে আনিজার চত্বরে।
সামনে দাঁড়িয়ে খোঁচা খাওয়া জখমী জানোয়ারের মতো ফুঁসছিল সাঞ্চামখাবা। উত্তেজনায় রাগে কোমর থেকে জঙগুপি কাপড়ের বাঁধন শিথিল হয়ে ঝুলে পড়েছে। শরীরের পেশীতে পেশীতে আদিম, হিংস্র ক্রোধ ফুলে ফুলে উঠছে। চক্ষের পলকে বাঁশের দেওয়াল থেকে সেও একটা বিশাল সুচেন্যু টেনে নিল।
মুখোমুখি দুই প্রতিপক্ষ। দুই পাহাড়ী হিংসা। সালুয়ালাঙ আর নানকোয়া বস্তি। সাঞ্চামখাবা আর রাঙসুঙ। একটু আগে তাদের দুজনের মনে একটা মধুর সম্পর্ক পাতাবার ইচ্ছা ছিল। রাঙসুঙ আর সাঞ্চামখাবা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল, আত্মীয় হতে চেয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ী মন দ্রুত পরিবর্তনশীল। নিমেষে তার মেজাজ বদলে যায়। এই মুহূর্তে সাঞ্চামখাবা আর রাঙসুঙ দু’টি প্রবল প্রতিপক্ষ, পরস্পরের সাঙ্ঘাতিক শত্রু।
পশ্চিম পাহাড়ের চুড়ায় বেলাশেষের রোদ নিভে আসতে শুরু করেছে। উপত্যকা মালভূমি বন-সব ঝাপসা দেখাচ্ছে। ধূসর রঙের পর্দার নিচে একটু একটু করে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে এই ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ সালুয়ালাঙ, দূরের নীল টিজু নদী, আরো দূরের কেলুরি গ্রাম। ছয় আকাশ ছয় পাহাড়ে ঘেরা এই নাগা পাহাড় দৃষ্টির সামনে থেকে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে।
বেলাশেষের খানিকটা ফ্যাকাসে আলো যাই-যাই করেও এখন পর্যন্ত বাইরের ঘরটায় আটকে রয়েছে। সেই আলোতে সাঞ্চামখাবা আর রাঙসুঙের দুজোড়া চোখের মণি দপদপ করে জ্বলছে। আর জ্বলছে একটি সুচেন্যু আর একটি বর্শার খরধার ফলা।
মারাত্মক কিছু একটা ঘটে যেতে পারত। এই পোকরি কেসুঙটা রক্তে মাখামাখি হত। কিন্তু তার আগেই সাঁ করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দার। সুচেন্যু আর বর্শার শাণিত ফলায় দুটো নিশ্চিত হত্যার শপথ আচমকা বিচলিত হয়ে গেল। চমকে উঠল রাঙসুঙ এবং সাঞ্চামখাবা।
পাথর কাটা রুক্ষ মেঝেতে বসে হুস হুস করে বারকয়েক নিশ্বাস ছাড়ল বুড়ো সর্দার। হাঁপাতে হাঁপাতে যোলাটে চোখে দুজনকে দেখতে দেখতে হাঁ হাঁ করে উঠল, ইজা হুবতা! এই বিকেলবেলা দুই বেয়াই খুনখারাপি করবি নাকি? এই রাঙসুঙ, এই সাঞ্চামখাবা, বর্শা আর সুচে নামা রে মরদেরা। ওসব দেখলে মেজাজ বিগড়ে যায়।
টেনে নটুঙ! সাঞ্চামখাবা গর্জে উঠল, তুই এসেছিস সদ্দার, খুব ভালো হয়েছে। এই দ্যাখ না, শয়তানের বাচ্চা রাঙসুঙটা আমার মুণ্ডু নিয়ে যেতে চায়।
রাঙসুঙও তারস্বরে চেঁচাল, কতদিন হল বউপণ পাঠিয়ে দিয়েছি। এখনও মেয়ে বিয়ে দেবার নাম নেই। খারে বর্শাগুলো গায়েব করার মতলব। মেয়ে না পেলে ওর মুণ্ডু নেবই নেব। তুই কী বলিস সদ্দার?
হুঙ্কার দিল সাঞ্চামখাবা, তুই শুধু বল সদ্দার, রাঙসুঙটার ঘাড়ে একটা সুচের কোপ ঝাড়ি। নানকোয়া বস্তি থেকে এখানে ফুটুনি ফুটোতে এসেছে!
বিশাল দুখানা হাত দু’দিকে বাড়িয়ে দিল সর্দার। বলল, থাম শয়তানের বাচ্চারা। নানকোয়া, সালুয়ালাঙদুই বস্তিতে কতকালের খাতির। কতদিনের দোস্ত আমরা। নিজেদের মধ্যে রক্তারক্তি করলে চলবে কী করে?
উল্কি-আঁকা বীভৎস মুখ। সেই মুখটায় একটা বিজ্ঞ-বিজ্ঞ ছায়া পড়েছে বুড়ো সর্দারের, বোস তোরা, কারো মুণ্ডু নিতে হবে না। আমার কথা শোন। মজাদার সব খবর আছে।
কী খবর? কিসের খবর? হল্লা করতে করতে দু’পাশে ঘন হয়ে বসল সাঞ্চামখাবা আর রাঙসুঙ। বুড়ো সর্দার দুজনের হাত থেকে বর্শা এবং সুচে ছিনিয়ে নিল।
বুড়ো সর্দারের কাছে মনোরম গল্প আছে। গল্প! গল্প! পাহাড়ী মানুষেরা এই গল্পের নামে অদ্ভুত এক মৌতাতের সন্ধান পায়।
হু-হু। হুন্টসিঙ পাখির পালকের মুকুটটা অল্প অল্প নেড়ে বুড়ো সর্দার বলল, সেসব অনেক খবর, অনেক গল্প। একটু রোহি ধু নিয়ে আয় সাঞ্চামখাবা। গলাটা ভিজিয়ে নিই। সেই সঙ্গে গোটাকয়েক আউ পাখি ঝলসে আনিস। বড় খিদে পেয়েছে। মেজাজটাকে একটু চাঙ্গা করে নিতে হবে। কী বলিস রাঙসুঙ?
হু-হু। সমস্ত দেহ নাড়িয়ে রাঙসুঙ বলে, আমারও বড় খিদে পেয়েছে। সেই নানকোয়া বস্তি থেকে কখন বেরিয়েছি। অনেক চড়াই উতরাই ডিঙিয়ে আসতে হয়েছে। পেটটা খিদেতে কামড়াচ্ছে।
