বিয়ে করবি না? তোকে করতেই হবে। মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে রঙ্গ করতে লগল বেঙসানু।
আমি করব না, সিধে কথা। বেশি ফ্যাকর ফ্যাকর করবি না ঠাকুমা। বর্শা দিয়ে সাবাড় করে ফেলব। হু-হু। হুমকে উঠল সেঙাই। ফোঁস ফোঁস করে বারকয়েক শব্দ করল।
সারুয়ামারু একপাশে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে বলল, এটা কেমন কথা! মেহেলীর সঙ্গে সেঙাইর পিরিত–এই পাহাড়ের সবাই সে খবর জানে। সেঙাই কোহিমা গিয়ে ফাদারকেও বলে এসেছে। অন্য মাগীর সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া চলবে না।
চলবে তো। নির্বিকার গলায় বেঙসানু বলল।
খবদ্দার। গর্জে উঠল সেঙাই।
কিছু একটা ঘটে যেত–ভয়ঙ্কর কিছু। তাজা পাহাড়ী রক্ত বুড়ো খাপেগার কেসুঙটা রাঙিয়ে দিতে পারত। কিন্তু তার আগেই কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। এতক্ষণ তারা চুপচাপ বসে বুড়ি বেঙসানু এবং সেঙাইর রং-তামাশা উপভোগ করছিল।
কেসুঙ-কাঁপানো হল্লা। কেলরি গ্রামের কুমারী জোয়ানীরা আর জোয়ান ছেলেরা সমস্বরে বলল, মেহেলীর সঙ্গেই তোর বিয়ে হবে রে সেঙাই। তোর ঠাকুমা মশকরা করছে।
মেহেলীর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে! নিজের গলাটা নিজের কানেই কেমন বেখাপ্পা শোনাল সেঙাই-এর। কেমন যেন অবিশ্বাস্য।
হু-হু– খুশি গলায় সকলে সায় দিল, সেই জন্যেই তো বউপণ নিচ্ছে সদ্দার।
এক টুকরো কুটিল সন্দেহে সেঙাই-এর মনটা কালো হয়ে গেল। বলল, মেহেলী তো সালুয়ালাঙ বস্তির মেয়ে। তার জন্যে আমাদের বস্তির সদ্দার কেন বউপণ নেবে? বউপণ নেবে তো মেহেলীর বাপ।
তুই জানিস না, যেদিন তুই কোহিমা চলে গেলি সেদিনই, মেহেলী আমাদের বস্তিতে পালিয়ে এসেছে। কনুই দিয়ে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল ওঙলে। কেমন করে মেহেলী এ গ্রামে এল, কেমন করে বুড়ো খাপেগার সঙ্গে ধরমবাপ সম্পর্ক পাতাল, তারপর সেঙাইর প্রতীক্ষায় দিনের পর দিন কেমন করে কাটাচ্ছে, তার নিখুঁত, সরস এবং আদ্যোপান্ত বিবরণ দিল।
বিস্ময়ে আর আনন্দে চোখের মণি ঝিকমিক করে উঠল সেঙাইর। এই মুহূর্তে তার অস্ফুট চেতনায় সমস্ত পাহাড়ী পৃথিবীটা আশ্চর্য সুন্দর হয়ে গিয়েছে। বড় ভালো লাগছে দুপুরশেষের গেরুয়া রোদ। কুমারী জোয়ানীদের ফুলসাজ ভালো লাগছে। ভালো লাগছে ওঙলেকে। এমনকি এই বিশেষ মুহূর্তটির জাদুতে বুড়ো খাপেগা আর বেঙসানুর ভাঙা, বাঁকা, কদাকার মুখ দুটোও সুন্দর দেখাচ্ছে। সমস্ত দেহের পেশীগুলিকে এবং তাজা রঙদার মনটাকে আলোড়িত করে সুখের শিহরন খেলে যেতে লাগল সেঙাই-এর।
আবিষ্ট গলায় সেঙাই বলল, বলিস কী! মেহেলী কোথায়?
জবাবটা এবার আর ওঙলে দিল না। সামনে এগিয়ে এল বুড়ো খাপেগা। ফোকলা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, কি রে শয়তানের বাচ্চা, ইজা হুকুতা! খুশিতে যে ডগমগ! পছন্দের মাগীকে পাবি। বিয়ের কথা শুনে তো ফোঁস করে উঠেছিলি।
অন্য দিকে বিন্দুমাত্র ক্রুক্ষেপ নেই সেঙাই-এর। নির্দিষ্ট একটা লক্ষ্যে তার মনোযোগ স্থির হয়ে রয়েছে। সে বলল, মেহেলী কোথায়? তাকে দেখব।
মেহেলী ভেতরের ঘরে মাচানে শুয়ে রয়েছে। তার সঙ্গে এখন দেখা হবে না তোর।
কেন আমার বউর সঙ্গে দেখা হবে না?
বিয়ে না হতেই বউ!কুৎসিত মুখভঙ্গি করল বুড়ো খাপেগা, মেহেলী এখনও তোর বউ হয়নি। ও এখন আমার ধরম-মেয়ে। এখন ওর সঙ্গে দেখা হবে না, সিধে কথা।
হু-হু। অসহ্য হৃদয়াবেগকে দু’টি শব্দের মধ্যে মুক্তি দিল সেঙাই, আচ্ছা।
কেসুঙের বাইরে কর্কশ পাথুরে চত্বর থেকে একটা বড় চেনা চেনা গলার স্বর ভেসে। আসছে। সে স্বরে দুনিয়ার সব সুস্বাদ, সব আনন্দ যেন মেশানো।
ভেতরের ঘরে বাঁশের মাচানে রোগের তাড়সে শুয়ে রয়েছে মেহেলী। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দু’টি কানের মধ্যে জড়ো হয়ে সেঙাই-এর গলার স্বরটাকে যেন শুষে নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেঙাই কোহিমা থেকে ফিরে এসেছে। শত্রুপরে এই জোয়ানটার জন্য গ্রাম ছেড়েছে সে। বাপ-মা প্রিয়জন-পরিজন সবাইকে ছেড়ে এই গ্রামে পালিয়ে এসেছে। কত প্রতীক্ষা করেছে। সে, সেঙাই-এর ভাবনায় কত দিনরাত্রি পার করে দিয়েছে।
সেঙাই। নামটা যেন তার বুকে ধুকধুক করে বাজতে শুরু করল। এই কর্কশ এবং নিঃসঙ্গ বাঁশের মাচান থেকে ছুটে সেঙাই-এর বুকে নিজের তাজা যুবতী দেহটাকে ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু তার উপায় নেই। তামুন্যুর নিষেধ, মাচান থেকে কিছুতেই ওঠা চলবে না। কী এক উদ্ভট রোগ হয়েছে। গায়ের চামড়ায় অসহ্য তাপ, হাত রাখলে যেন পুড়ে যায়। তামুন্যুর নির্দেশে ভাত-মাংস খাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়েছে।
সেঙাই-এর কাছে যাবার প্রবল তাড়নায় ছটফট করছে মেহেলী। শিরায় শিরায় যেন রক্ত ফুটছে। হতাশায় এবং অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় ফোঁস ফোঁস করতে লাগল সে। ভাবল, এই ভেতরের ঘর, বাঁশের দেওয়াল আর বাইরের ঘর পেরিয়ে যে রুক্ষ পাথুরে চত্বর, সেখানে বসে রয়েছে সেঙাই। তার গলা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। কত সামনে, অথচ কত দূরে সেঙাই। তাকে ধরাছোঁয়ার কোনো উপায়ই নেই।
একসময় বউপণ দেওয়া-নেওয়ার পালা শেষ হল। বাঁশের পানপাত্রে রোহিমধু, কাঠের বাসনে শুয়োরের মাংসের কাবাব সাজিয়ে সকলকে খেতে দিল খাপেগা।
একমাত্র ভাইপো ওঙলে ছাড়া সংসারে আর কেউ নেই বুড়ো খাপেগার। তাই এই দুর্ভোগ। সকালবেলা বসে বসে নিজের হাতে কাবাব বানাতে হয়েছে। অবশ্য সারুয়ামারুর বউ জামাতসু এবং গ্রামের কটি মেয়ে সাহায্য করতে এসেছিল।
