বর্শাগুলোর দিকে তাকিয়ে ঘোলাটে চোখজোড়া জ্বলতে লাগল খাপেগার। গদগদ গলায় বলল, আয়, আয় বেঙসানু। কী খাবি বল–হোরি মধু, না শুয়োরের কাবাব? না ঝলসানো হরিণের মাংস?
না না, অত খাতিরের দরকার নেই। বউপণ এনেছি। তাই নিয়ে নে। তুই তো একটা সাচুমেচু। পরের মেয়েকে কয়েক দিন পুষে তার যৌবনের দর হেঁকেছিস দশটা খারে বর্শা। কী আর করি, মেয়েটাকে দেখে চোখ মজেছে, মেয়েটার গুণ দেখে মন নরম হয়েছে। কী আর করি! নির্লোম ভুরু দুটো কুঁচকে বেঙসানু তাকাল।
হু-হু–সমানে মাথা দুলিয়ে চলেছে বুড়ো খাপগো, সেসব আমি জানি বেঙসানু।
কেসুঙের চারপাশে উল্লসিত হল্লা হচ্ছে, ভোজ দে, রোহি মধু দে–
ও সদ্দার, শুয়োরের কাবাব দে–
থাম শয়তানের বাচ্চারা–খেঁকিয়ে উঠতে গিয়ে ভাঙা ক্ষয়া দাঁত বার করে হেসে ফেলল বুড়ো খাপেগা, আজ যদি সেঙাইটা থাকত! ওর বিয়ে, অথচ ছোঁড়াটা জানতেই পারল না।
তেরছা চোখে খাপেগাকে দেখতে দেখতে বেঙসানু বলল, তা হলে কোহিমা থেকে সেঙাইটা ফিরলেই বউপণ নিস। আজ থাক।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠল খাপেগা। খোশামুদির সুরে বলল, হু-হু, কী যে বলিস বেঙাসান, সেঙাই আসার আগেই বউপণের ল্যাঠা চুকিয়ে রাখ। এলেই বিয়ে হবে।
কুৎসিত মুখভঙ্গি করে বেঙসানু চেঁচাল, বউপণ বাগাবার জন্যে তর আর সইছেনা শয়তানের।
খাপেগা মাথা নাড়ল, হু-হু—
একটুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর বুড়ি বেঙসানুর কোঁচকানো মুখখানায় রহস্যময় হাসি ফুটল, শয়তানটা এসে একেবারে তাজ্জব বনে যাবে। মেহেলী তার বউ হবে। খুশিতে টেফঙটা আবার সাবাড় না হয়ে যায়! সে যাক, তেলেঙ্গা সু মাসেই ছোঁড়াছুঁড়ির বিয়ে দিয়ে দেব।
হিঃ হিঃ হিঃ–অমানুষিক গলায় হেসে ফেলল বুড়ো খাপেগা।
হু-হু, অনেক বেলা হয়েছে। দুপুর পেরিয়ে গেল। এবার তা হলে বউপণের বর্শাগুলো হিসেব করে গুনে নে।
হু-হু। মাথা ঝাঁকাল বুড়ো খাপেগা। তার দুটো ঘোলাটে চোখ লোভে খুশিতে জ্বলজ্বল করতে লাগল। কোনোদিনই কি সে ভেবেছিল, সালুয়ালা গ্রামের শত্রুপক্ষের মেয়েটা নগদ এতগুলো খারে বর্শার বউপণ নিয়ে তার ঘরে আসবে? ভাবল, সালুয়ালাঙের সঙ্গে তিন পুরুষের শত্রুতাটা এবার মিটিয়ে ফেলবে কিনা।
রূপকথার মতো অপরূপ। কিংবা তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর। বুড়ো খাপেগার কেসুঙের ঠিক পেছনেই বিশাল একাট টিলা। তার গায়ে ইতস্তত ছড়ানো গোটা কয়েক খাসেম গাছ, আতামারী লতা আর রিলুক কাটার ঝাড়। হঠাৎ দুর্গম কাটাবন কুঁড়ে দুটো মানুষ বেরিয়ে এল। সেঙাই আর সারুয়ামারু! সরাসরি বুড়ো খাপেগার কেসুঙের সামনে এবড়োখেবড়ো চত্বরটায় এসে দাঁড়াল।
প্রচণ্ড বিস্ময়ে প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিল গ্রামের মানুষগুলো। বিস্ময়ের ঘোরটা কেটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে একটা তুমুল শোরগোল শুরু হল।
সেঙাই এসেছে, সেঙাই এসেছে।
সারুয়ামারু এসেছে, সারুয়ামারু এসেছে।
কী মজা! কী মজা!
বুড়ি বেঙসানুর চোখ দুটো খুশিতে চিকচিক করছে। তড়িৎবেগে কালো পাথরখানা থেকে লাফিয়ে উঠে ছুটে এল সে। দুটো শীর্ণ হাত দিয়ে সেঙাইর গলাটা জড়িয়ে ধরে বলল, এতদিন কোহিমাতে কী করলি রে সেঙাই? এই দ্যাখ, তোর বউপণ দিতে এসেছি খাপেগাকে। তোর বাপ সেই সিজিটো শয়তানটা কই? তোর মা মাগী মরেছে নাকি?
প্রথম যখন জীবনের কিছু কিছু স্থূল রহস্য একটু আধটু বুঝতে শিখল সিজিটো, নিজের শরীরটার একটা উৎকট দাবি সম্বন্ধে স্পষ্ট এবং প্রবল আলোড়ন জাগল মনে, ঠিক তখনই মোরাঙের নারীহীন বিছানায় তাকে শুতে পাঠিয়েছিল বুড়ি বেঙসানু। আর সেদিন থেকেই তার সঙ্গে সম্পর্কটা শিথিল হয়ে গিয়েছে তার।
সিজিটো কেমন এক ধরনের বিচিত্র মানুষ। এই পাহাড়, এই উপত্যকা, এই বুনো মালভূমি থেকে পালিয়ে নিরালায় বসে বসে কী যেন ভাবত। তার চোখ কেলুরি বস্তি ডিঙিয়ে, ছয় আকাশ আর ছয় পাহাড় পেরিয়ে অহরহ কী খুঁজে বেড়াত, তার হদিস পেত না বুড়ি বেঙসানু।
কিন্তু যেদিন কোহিমা গিয়ে পাদ্রী সাহেবদের মন্ত্র কানে নিয়ে সিজিটো বস্তিতে ফিরে এল, সেদিন থেকেই ব্যবধান আরো বাড়ল। কী বুদ্ধিই যে দিল পাদ্রীরা! ঘন ঘন শহরে যেত সিজিটো। এত বদলে গেল যে, সমস্ত বোধবুদ্ধি এবং অসংখ্য বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে তার নাগাল পেত না বেঙসানু। বেঙসানুর কাছে সিজিটো দুর্বোধ্য, অস্পষ্ট, ধরাছোঁয়া যায় না এমন এক রহস্য হয়েই রইল। সহজ মানুষ বেঙসানু তার বুনো মন দিয়ে শহুরে সিজিটোর পরিবর্তনের মাপ নিতে হিমসিম খেয়ে সে চেষ্টাই ছেড়ে দিয়েছে।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও একটা বিস্ময় ছিল। যেদিন সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর বিছানায় উঠে নিজের পাহাড়ী রক্তের আদিমতার প্রমাণ দিল সিজিটো, সেদিন জামাতসুর ইজ্জতের দাম দিতে দিতে বেঙসানুর মনে হয়েছিল সিজিটো দুর্বোধ্য নয়, অস্পষ্ট নয়। সে তারই ছেলে, বড়ই আপনার, অত্যন্ত কাছের মানুষ একটুও বদলায়নি। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত সিজিটো দূরেই রয়ে গেল। পরের বউয়ের ইজ্জত নিয়ে এই পাহাড়ের চিরাচরিত রীতিকে অপমান করে একটা ভীরু কুত্তার মতো কোথায় পালিয়ে গেল শয়তানটা!
প্রবল বিতৃষ্ণায় সামান্য খোঁজখবর নিয়েই সিজিটোর প্রসঙ্গ হেঁটে দিল বুড়ি বেঙসানু। বলল, তোর বউপণ দিতে এসেছি সেঙাই।
বউপণ দিতে এসেছিস! দপ করে জ্বলে উঠল সেঙাই, মেহেলী ছাড়া অন্য কোনো মাগীকে আমি বিয়ে করব না। সে হল আমার পিরীতের জোয়ানী। খবরদার।
