শিউরে উঠলেন গাইডিলিও। বললেন, খবরদার, কেউ সাহেবদের মারবে না। ওরা মারুক। মারতে মারতে ওরাই একদিন কাহিল হয়ে পড়বে। কত মারবে? আমরা এখন চলে যাচ্ছি। তোমরা বস্তিতে ফিরে যেতে পারবে তো? তোমাদের শরীর খারাপ। কিন্তু এ-ঘর না ছাড়লে সাহেবরা তোমাদের ধরে ফেলবে।
পারব, খুব পারব। খাদে একবার পড়ে গিয়েছিলাম। হাড়গোড় চুরচুর হয়ে ভেঙে গিয়েছিল। তার পরদিন সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে আমি ভেগে এলাম না? সগৌরবে নিজের কৃতিত্বের কথা বলল সেঙাই।
কেন খাদে পড়ে গিয়েছিল? সালুয়ালাঙ বক্তি কোনটা? এসব কৌতূহল প্রকাশের সময় নেই গাইডিলিওর। বেয়নেট বাগিয়ে বুনো মোষের আঁকের মতো ছুটে আসছে পুলিশ। কিছুতেই ধরা দেওয়া চলবে না। এখনই পালিয়ে যেতে হবে। নাগা পাহাড়ের একটি নিভৃত প্রাণকোষে স্বাধীনতার প্রথম আকাঙ্ক্ষার যে অঙ্কুরটি জন্ম নিয়েছে তাকে কোনোমতেই দলিত পিষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। সযত্নে লালন করে নাগা পাহাড়ের দিকে দিকে তার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিতে হবে। সে আকাঙ্ক্ষাকে অগ্নিবীজের মতো নাগাদের প্রাণে প্রাণে ছিটিয়ে দিতে হবে।
গাইডিলিও বললেন, তবে চল। আর দেরি করার সময় নেই।বলতে বলতে পেন্যু কাঠের মশালটা পাটাতন থেকে তুলে নিলেন।
একসময় চারজনে বাইরে এসে দাঁড়াল। গাইডিলিও আবার বললেন, তোমাদের বস্তির নাম তো কেলুরি। দরকার হলে সেখানে যাব। এবার তোমরা সামনের পথে যাও। আমরা পেছনের খাদে নামব।
হু-হু, আমাদের বস্তিতে যাবি। সদ্দার খুব খুশি হবে। আমরা গানবাজনা শোনাব, নাচ দেখাব। তুই আমাদের জান বাঁচিয়েছিস। তোকে সম্বরের মাংস খাওয়াব।
আচ্ছা, আচ্ছা। মধুর হাসিতে মুখখানা ভরে গেল গাইডিলিওর। একটু পরেই সেঙাই আর সারুয়ামারু মাও-গামী পথের দিকে পা বাড়িয়ে দিল। আর একটি পেন্যু কাঠের মশাল আকাবাঁকা পাহাড়ী পথে উতরাই বেয়ে নিচের খাদে নামতে লাগল। কবে নাগা পাহাড়ের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা হয়ে গাইডিলিওর হাতের ওই ক্ষুদ্র অগ্নিবিন্দুটি দিকে দিকে বনবহ্নির মতো ছড়িয়ে পড়বে? প্রাণে প্রাণে একটি আগ্নেয় প্রতিজ্ঞার দাবানল ছড়াবে? কবে, কত কাল, কত দিন-মাস-বছর পেরিয়ে সেই পরম শুভময় মুহূর্ত?
.
৩৪.
বুড়ো খাপেগার কেসুঙে কেলুরি গ্রামের সব মেয়েপুরুষ জমায়েত হয়েছে। নানা বংশের প্রাচীন মানুষেরা এসেছে। বাহারি সাজে সেজে এসেছে কুমারী মেয়েরা। কোমরের খাঁজ থেকে নিটোল জানু পর্যন্ত কামেরু সু কাপড়। বাঁশের চাচারি দিয়ে আঁটো করে বাঁধা চুল। মাথার দু’পাশে আউ পাখির পালক এবং আতামারি ফুল গোঁজা। গলায় হাতির দাঁতের আরুখা হার। গোল নরম হাতে বাদামি হাড়ের বালা। জীবন্ত পাহাড়ী কাব্য সব। তাদের বাহার কত! অফুরন্ত যৌবনের ফুর্তিতে সবাই যেন টগবগিয়ে ফুটছে। এসেছে জোয়ান ছেলেরা। মাথায় মোষের শিঙের মুকুট। পরনে জঙগুপি কাপড়। আর এসেছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। চুল উঁচু করে বেঁধে টুকটুকে খাসেম ফুল গেঁথে দেওয়া হয়েছে। তারা খাপেগার কেসুঙের চারপাশে লালকুঁটি মুরগির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কেসুঙের ঠিক পেছনেই ঘন বনের ফাঁকে একটা জলপ্রপাত। পাহাড়ের উঁচু চুড়া থেকে প্রবল উচ্ছ্বাসে জলধারা নিচের খাদে আছড়ে পড়ছে। নিঝুম বনভূমি সেই গর্জনে আর প্রতিধ্বনিতে ভরে গিয়েছে। দুপুরের রোদ মাছের আঁশের মতো ঝকঝকে। সেই রোদ প্রপাতের জলে মাখামাখি হয়ে রুপোলি মায়া সৃষ্টি করেছে।
প্রপাতের গমগমে আওয়াজ ছাপিয়ে বুড়ো খাপেগার কেসুঙে উল্লসিত হল্লা হচ্ছে।
ও সদ্দার, মোষের মাংস খাব।
না না, সাদা শুয়োরের কাবাব খাব।
ও সদ্দার, রোহি মধু দে।
একখণ্ড পাথরে বসে ক্ষয়ে-আসা ভাঙা দাঁতের ফাঁকে কঁচা তামাকপাতা রেখে ঝিমুচ্ছিল। বুড়ো খাপেগা। নেশার মৌতাতে চোখজোড়া বুজে আসছিল। চেঁচামেচিতে তার মেজাজ বিগড়ে গেল। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ধমকে উঠল, রোহি মধু গিলবে, সাদা শুয়োরের কাবাব খাবে শয়তানের বাচ্চারা! এখন পর্যন্ত বুড়ি বেঙসানুটা এল না বউপণের বর্শা নিয়ে। ইদিকে ভোজ গিলবার জন্যে চেঁচিয়ে টেফঙেরা পাহাড় ফাটাচ্ছে। এখন আমি কী করি? বেঙসানুটার গলা টিপে এখানে নিয়ে আসব না কি?
কয়েকটা গলা ফিসফিস করে ফুটে উঠেই বাতাসে মিলিয়ে গেল।
সদ্দারটা একটা আস্ত সাচুমেচু (অত্যন্ত লোভী মানুষ)।
জনকয়েক অস্ফুট শব্দ করে সায় দিল, হু-হু—
শত্তুরদের মেয়েটাকে নিজের ধরম-মেয়ে বানিয়ে শয়তানটা বউপণ বাগাচ্ছে।
এখন যদি সেঙাই থাকত্ত মজাটা জমত ভাল। ছোঁড়াটা আজও ফিরল না কোহিমা থেকে।
আচমকা জোয়ান-জোয়ানীরা খুশির গলায় হল্লা করে উঠল, হুই তো, হুই তো সেঙাইর ঠাকুমা আসছে।
কই? কই? সকলকে ধাক্কা মেরে, গুতিয়ে, মেয়েপুরুষের জটলা লণ্ডভণ্ড করে সামনের দিকে এগিয়ে এল বুড়ো খাপেগা। তার লোলুপ চোখজোড়া জ্বলছে।
সামনের বড় টিলাটা পেছনে রেখে খাপেগার কেসুঙে চলে এল বুড়ি বেঙসানু। তার কাখে। এক রাশ খারে বর্শা। বেঙসানুর সঙ্গে নাতি-নাতনি দুটোও রয়েছে। ফাসাও এবং নজলি। তাদের পেছন পেছন এসেছে ওঙলে। তার কাঁধে খানকয়েক আধুনিক গড়নের বর্শা। বুড়ি বেঙসানু একা একা এত বর্শার বোঝা নিয়ে আসতে পারবে না। তাই সকাল বেলা ওঙলেকে বেঙসানুর কাছে পাঠিয়েছিল খাপেগা।
