ঘরের মধ্যে একটা পেন্য কাঠের মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছে গাইডিলিও। সামনের প্রবেশ পথে অন্য একজন ঝুলিয়ে দিয়েছে বাঁশে বাঁশে ফঁস পরানো একটা ছিদ্রহীন ঝাঁপ।
নাগা পাহাড় গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছে। সামনে মাও-গামী পথের আঁকাবাঁকা রেখা। চারপাশে আদিম হিংসা, অরণ্যের বিভীষিকা। তার মধ্যে টুঘুটুঘোটাঙ পাতায় ছাওয়া ছোট্ট একটি ঘরে পেন্য কাঠের মশালে একবিন্দু আলো। আলো নয়, ও যেন নাগাপাহাড়ের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। সব অন্ধকার থেকে সে আলোকে দেহ-মন-আত্মা আর প্রতিজ্ঞা দিয়ে পাহারা দিয়ে রাখছে একটি প্রাণ। সে প্রাণের নাম গাইডিলিও। এই মশালের শিখাঁটিকে নাগা পাহাড়ের উপত্যকা আর মালভূমিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিতে হবে। টঘুটুঘোটাঙ পাতায়-ছাওয়া ঘরখানায় তারই নিভৃত প্রস্তুতি।
ঝাঁপের ওপর একটা ঝড় এসে যেন আছড়ে পড়ল হঠাৎ। চমকে উঠলেন গাইডিলিও। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কে?
আমি লিকোব্যুঙবা। শিগগির ঝাঁপ খুলুন।
তাড়াতাড়ি মাচান থেকে পাটাতনে নামলেন গাইডিলিও। ঝপটা খুলতে খুলতে বললেন, আসুন, আসুন।
ঘরের মধ্যে এসে ঘন ঘন কয়েকটা নিশ্বাস ফেলল লিকোক্যুঙবা। বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। পুলিশ জানতে পেরেছে আপনি এখানে আছে।
গাইডিলিও চকিত দৃষ্টিতে তাকালেন লিকোব্যুঙবার দিকে। সমস্ত মুখখানা রক্তে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। সাদা জামাটা রক্তে ভিজে গিয়েছে। কপাল থেকে ফিনকি দিয়ে এখনও তাজা রক্ত বেরুচ্ছে। আর্তনাদ করে উঠলেন গাইডিলিও, এ কী হয়েছে! একেবারে খুন করে ফেলেছে, দেখছি!
লিকোক্যুঙবা হাসল। দু’পাটি চকচকে দাঁত পেন্য কাঠের স্নিগ্ধ আলোতে ঝকমক করতে লাগল, কোহিমা থানার সামনে আজ জাতীয় পতাকা তোলা হচ্ছিল। পুলিশ লাঠি আর বেয়নেট চালিয়েছে। এগুলো তারই চিহ্ন। যাক ওসব। এখনই এ-ঘর ছেড়ে আপনাকে চলে যেতে হবে। অঙ্গামীদের গ্রামে লুকিয়ে থাকার একটা ব্যবস্থা করেছি।
কিন্তু আপনার মাথায় এত বড় আঘাত একটু ইতস্তত করলেন গাইডিলিও।
অঙ্গামীদের গ্রামে গিয়ে সব ব্যবস্থা হবে। থানার সামনে অনেককে অ্যারেস্ট করেছে। পুলিশ এদিকে আসছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
এ আস্তানার খবর পুলিশ কী করে পেল?
যে সব সদ্দাররা এখানে আসে তাদের মধ্যে কেউ পুলিশের চর রয়েছে। সেই আমাদের এই উপকারটুকু করেছে। সে যাই হোক, এক্ষুনি আমাদের এ আস্তানা ছাড়তে হবে। আপনার অ্যারেস্ট হওয়া কিছুতেই চলবে না। তা হলে নাগা পাহাড়ের স্বাধীনতা আন্দোলন একেবারে নিভে যাবে। সমস্ত ভারতবর্ষ স্বরাজের জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। আমাদের এই নাগা পাহাড় পিছিয়ে থাকলে কিছুতেই চলবে না। আশ্চর্য এক কাঠিন্য নেমে এসেছে লিকোব্যুঙবার কণ্ঠে। চোখমুখ ধারাল বর্শার ফলার মতো ঝকঝক করছে। সে বলতে লাগল, সমতলের জন্যে। রয়েছে গান্ধিজির নেতৃত্ব। আমাদের পাহাড়ী মানুষেরা আপনাকে দেবীর মতো মানে। আপনি জীবিত থাকতে দেশের লোক শয়তানের শিকার হয়ে থাকবে? একটু একটু করে আমাদের ধর্ম নষ্ট হবে? সরল মানুষগুলো শঠ হবে? টাকা খেয়ে বিশ্বাসঘাতক হবে? বেইমান হবে? না না, এত বড় অন্যায় সহ্য করা অসম্ভব।
ঠিক। বারুদের ওপর মশালের শিখা এসে লাগল। দপ করে জ্বলে উঠলেন গাইডিলিও, ঠিক কথা। রক্ত দেখে আমার যেন কেমন লাগছিল। রক্তের পথ তো আমাদের পথ নয়। সে যাক, আমি যাব।
লিকোক্যুঙবা হাসল। বিচিত্র হাসি। সে হাসির মধ্যে একটি দাউদাউ জ্বলা প্রাণের প্রতিচ্ছায়া পড়ল, আঘাতের বদলে আমরা আঘাত হানি না। পিকেটিং-এ একটি পাহাড়ী মানুষও সাহেবদের গায়ে হাত তোলেনি। আমরা হাত তুলব না বলে তো ওরা ছাড়বে না। ওরা এ আন্দোলনকে মেরে ধরে যেমন করে হোক, থামাবার চেষ্টা করবে। একটু থামল লিকোক্যুঙবা। কী যেন ভাবল একবার। তার রক্তাক্ত মুখখানার ওপর কয়েকটা রেখা আড়াআড়ি ফুটে বেরুল। ফের সে বলল, আজ শুনলাম, গান্ধিজিকে নাকি অ্যারেস্ট করবে।
কী বললেন? গান্ধিজিকে আটক করবে! প্রায় চিৎকার করে উঠলেন গাইডিলিও।
হ্যাঁ, তাই শুনেছিলাম। এবার চলুন। পেছনের খাদে অঙ্গামী সর্দার তার লোকজন নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লিকোক্যুঙবা অধীর হয়ে উঠল, এবার আমাদের কাজ শুরু হল। অনেক দায়িত্ব, অনেক সমস্যা, অনেক অনেক কাজ।
বিস্মিত চোখে সেঙাইরা তাকিয়ে ছিল গাইডিলিও আর লিকোক্যুঙবার দিকে। পাহাড়ী ভাষায় তারা কথা বলছে। সব কটা কথা পরিষ্কার বুঝতে পারছে সেঙাই। কিন্তু সেই কথাগুলো নিঙড়ে একটি উত্তেজনা ছাড়া বিশেষ কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি। যত দুর্বোধ্যই হোক, তার একটি অর্থ সে খুঁজে পেয়েছে। সে অর্থ রক্তের অক্ষরে আঁকা রয়েছে লিকোক্যুঙবার কপালে। লড়াই বেধেছে, মারামারি হচ্ছে।
সেঙাই বলল, কাদের সঙ্গে লড়াই বেধেছে রে? অমন করে ওকে কে মারল?
সাহেবদের সঙ্গে। গাইডিলিও তাকালেন সেঙাই-এর দিকে। বললেন, সেঙাই, আমাদের চলে যেতে হবে এক্ষুনি। ওই দেখ, সাহেবরা ওঁকে মেরেছে। আমাদের ধরতে আসছে।
পালাতে হবে! কেন? আমরা পাহাড়ি মরদ না? চেঁচিয়ে উঠল সেঙাই, আসুক সায়েবরা। আমাকে মেরেছে, তোর লোককে মেরেছে। তিনটে মাথা রেখে দেব।
না না। পাগলামি করো না। ওদের বন্দুক আছে, গুলি করে মারবে।
পাশের মাচান থেকে সারুয়ামারু আলোকদান করল। বন্দুকের মহিমা সম্বন্ধে সে অতিমাত্রায় সচেতন, অনেক দূর থেকে তাক করে বন্দুক দিয়ে আমাদের সাবাড় করবে ওরা। অত দূরে বর্শা ছুড়লেও লাগবে না। তার চেয়ে পালাই চল। আমাদের বস্তিতে কি পাহাড়ে জুতমতো একবার পেলে কুঁড়ে খাসেম গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখব সায়েবদের।
