স্মিতমুখে তাকালেন রানী গাইডিলিও, আমি সব শুনেছি সারুয়ামারুর কাছে। ওরা এমনই, মানুষকে বেইমান বানায়। মানুষের বিশ্বাসকে, মনুষ্যত্বকে কয়েকটা টাকা দিয়ে কিনে নিতে চায়।
আধফোঁটা বুদ্ধি, অপরিণত বন্য মন। রানী গাইডিলিওর ভাষার জটিলতা ঠিক বুঝতে পারল না সেঙাই এবং সারুয়ামারু। তবু ওই কথাগুলো দুটো পাহাড়ী মানুষকে তুমুলভাবে নাড়া দিল।
গাইডিলিও বলে চলেছে তখনও, আমরা পাহাড়ী মানুষ, ওরা আমাদের ধর্ম নষ্ট করছে। টাকা-পয়সা কাপড়ের ঘুষ দিয়ে পাপের পথে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের কথামতো না চললে মারছে।
গাইডিলিওর কথাগুলো স্নায়ুতে স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ল সেঙাই-এর। আঁকড়া মাথাখানা প্রবলবেগে নাড়িয়ে সে বলল, হু, তুই ঠিক বলেছিস। আমাদেরও টাকা দিতে চেয়েছিল হুই ফাদারটা। তুই লড়াই বাধিয়ে দে রানী। আমাদের বস্তি থেকে বর্শা নিয়ে আসব, জোয়ান ছেলেদের ডেকে আনব। পাহাড় থেকে শয়তানের বাচ্চাদের খুঁড়ে কুঁড়ে খাদে ফেলে দেব। শয়তানেরা আমাদের পাহাড়ে এসে আমাদেরই মারে। এই দ্যাখ।
তড়িৎগতিতে কোমরের কাপড়টা সামান্য সরিয়ে দেখাল সেঙাই। সেখানে একটা বিশাল ক্ষত। দিন দুই আগে সেই মণিপুরী পুলিশটা বেয়োনেটের আধ হাত ফলা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সেই বীরকীর্তি দগদগে ঘা হয়ে গিয়েছে। সেঙাই এখনও থামেনি, হুই মণিপুরী আর আসা (সমতলের লোক), দু দলকেই খেদিয়ে দিবি। ওরাই মেরেছে আমাদের।
চকিত হয়ে উঠলেন গাইডিলিও। বললেন, সব দোষ ওই সাহেবদের। ওরা বলেছে, তাই আসান্যুরা তোমাদের মেরেছে। সাহেবরাই হল আসল শয়তান। ওদের সঙ্গেই আমাদের লড়াই হবে।
কবে? কবে? রীতিমতো উৎসাহিত হয় উঠল সেঙাই, কবে লড়াই বাধবে?
বেধে গেছে। গান্ধিজি বাধিয়ে দিয়েছেন। আমাদের পাহাড়েও বোধ হয় বেধেছে কাল থেকে।
লড়াই বেধেছে? কটা মরেছে?
একজনও নয়। এ লড়াইতে মারামারি হয় না। আমরা মারি না, মারবও না। কিন্তু সাহেবরা আমাদের ধরে নিয়ে আটক করে রাখবে, মারবে। রানী গাইডিলিওর কোমল সুকুমার দেহটা পাথরের মতো কঠিন এবং ভীষণ হয়ে উঠেছে। একটু আগে যে চোখ দুটো স্নেহে মমতায় কোমল ছিল, এখন তা জ্বলছে। গাইডিলিও বললেন, এই লড়াইতে তোমাদেরও আসতে হবে সেঙাই।
মাধোলাল বলেছিল, গান্ধিজির লোকেরা নাকি মার খাচ্ছে, কিন্তু মার দিচ্ছে না। এ কেমন লড়াই! তুইও একথা বলছিস। আমরা পাহাড়ী মানুষ। লড়াই হবে, অথচ মানুষ মরবে না, এমন কথা তো সদ্দার বলেনি কোনোদিন। তবে কি তুই গান্ধিজির লোক?
আমরা সবাই গান্ধিজির লোক। বলে একটু থামলেন গাইডিলিও। দেখতে লাগলেন তার কথাগুলো দুটো সহজ পাহাড়ী মানুষের ওপর কী প্রতিক্রিয়া করছে। তারপর বললেন, গান্ধিজিই বলেছেন, এ লড়াইতে সাহেবদের আমরা মারব না। আর যদি খাই, মার খেয়ে খেয়েই আমরা জিতে যাব।
এই কথা মাথোলালও বলেছিল। অদ্ভুত এই সংগ্রাম। বর্শা নেই, তীরধনুক নেই। নিরীহ দেহটিকে সাহেবদের হাতিয়ারের সামনে অসহায়ভাবে তুলে ধরতে হবে। বন্য মন ঠিক সায় দেয় না। পাহাড়ী হৃদয় ঠিক প্রেরণা পাচ্ছে না। অথচ গাইডিলিও বলছেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিবাদ জানাবার মতো দুঃসাহস নেই সেঙাই-এর। মাথোলালের কাছে গান্ধিজির আজব লড়াইর গল্প শুনে মনটা অবিশ্বাসে ভরে গিয়েছিল। এই মুহূর্তে রানী গাইডিলিওর কথা শুনতে শুনতে একটা কিনারাহীন অথই সমস্যার মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগল সেঙাই। গাইডিলিওর এই যুদ্ধকে অবিশ্বাস করার মতো সাহস পর্যন্ত নেই তার।
গাইডিলিও বললেন, আমাদের এই লড়াইতে তোমরাও আসবে তো সেঙাই? আমাদের সঙ্গে মিলে মিশে সাহেবদের বি(দ্ধে (খে দাঁড়াবে?
সারুয়ামারু কুণ্ঠিত গলায় বলল, একবার সদ্দারকে জিগ্যেস করে নিই।
সদ্দারকে জিগ্যেস করে নিই? টেমে নটুঙ! হঠাৎ ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠল সেঙাই, সদ্দার তোকে কোহিমার পথ থেকে তুলে নিয়ে বাঁচিয়েছিল?
না না।
রানী আমাদের বাঁচিয়েছে। রানী আমাদের যা বলবে, তাই করব। বেহুশ হয়ে যখন ছিলাম, তখন আমাকে আনিজাতে ধরেছিল। বস্তিতে থাকলে খোনকের মতো নির্ঘাত আমাকে খাদে ফেলে দিত তামুন্যু। দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে গাইডিলিওর মুখের ওপর এনে ফেলল সেঙাই। একটু আগের উত্তেজনা কেটে গিয়েছে। সে বলল, তুই আমাদের বাঁচিয়েছিস। তুই যা বলবি তাই করব। মরতে বললে মরব।
মমতায় মুখখানা স্নিগ্ধ দেখাল গাইডিলিওর। বললেন, এই দেখ এত কথা বললাম, আসল কথাই জানা হয়নি। তোমরা কোন বস্তির লোক?
কেলুরি বস্তির।
দরকার হলে তোমাদের বস্তিতে যাব। থাকতে দেবে তো?সরল মানুষ সেঙাই-এর মধ্যে একটা নিশ্চিত বিশ্বাসের ভিত্তি খুঁজে পেয়েছে গাইডিলিও। তাকে বিশ্বাস করা যায়। তার ওপর আস্থা রাখা চলে।
হু-হু–প্রচণ্ড উৎসাহে মাচান থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল সেঙাই, তোর জন্যে নতুন ঘর বানিয়ে দেব।
একথা বেশি চাউর কোরো না।
হু-হু। তুই যখন বলছিস
বাইরের আকাশে ঝাপসা ভাবটা আর নেই। টুঘুটুঘোটাঙ পাতায় ছাওয়া এই ঘরখানার চার পাশ থেকে রাশি রাশি রোমশ থাবার মতো নেমে আসছে অন্ধকার। ভয়াল সন্ধ্যা, ভয়ালতর পাহাড়ী রাত্রি। চারিদিকে গহন বন। অগুনতি খাসেম আর ভেরাপাঙ গাছ। আতামারী লতার। বাঁধনে বাঁধনে জটিল হয়ে বন কখনও উঠেছে সুউচ্চ টিলায়। কখনও ঢেউ-এর মতো দোল খেয়ে নেমেছে উপত্যকার দিকে। ভয়ানক গলায় চেঁচিয়ে উঠছে আউ পাখির ঝাঁক। কঁ কঁ শব্দে ককিয়ে উঠছে খারিমা পতঙ্গের দল। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে সর সর করে চলেছে পাহাড়ী অজগর। খাটসঙ গাছের শাখায় শাখায় লাফিয়ে চলেছে বানরেরা। চিতাবাঘ আর ডোরাদার বাঘেরা দল পাকিয়ে গর্জাচ্ছে। পাখি-পতঙ্গ-সরীসৃপ সবাই এখন নীড়মুখি। বিশৃঙ্খল পাহাড়ী অরণ্যের সংসারেও সবাই নিয়মের শাসনে বাঁধা। সে নিয়ম গুহায় কি নীড়ে, গাছের ফোকরে কি শাখায়, একটি নিভৃত আশ্রয়ে ফিরে যাবার চিরন্তন নিয়ম।
